মাওলানা ইদরিস বললেন, হে আল্লাহপাক, তুমি আমাকে শয়তানের ধোকা থেকে রক্ষা কর। তিনি আয়াতুল কুরসি পাঠ শুরু করলেন। তার দৃষ্টি কাঠাল গাছের দিকে। মেয়েটা এখনাে আছে। মাওলানা ভীত গলায় বললেন, তুই কে ?
নগ্ন মেয়ে কাঠাল গাছের আড়ালে চলে গেল। মাওলানা বললেন, ইবলিশ দূর হ। তােকে আল্লাহর দোহাই লাগে তুই দূর হ। দূর হ কইলাম। মেয়েটা দূর হলাে না। কাঠাল গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে এলাে। মাওলানা জ্ঞান হারালেন।
গভীর রাতে তার জ্ঞান ফিরল। তিনি বারান্দাতেই শুয়ে আছেন। তবে তার গায়ে চাদর। মাথার নিচে বালিশ । তারচেয়ে আশ্চর্য কথা, শয়তানরূপী মেয়েটা আছে। হারিকেন হাতে তার পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে আছে । তার গায়ে বিছানার চাদর জড়ানাে। মাওলানা ভীত গলায় বললেন, তুমি কে ? মেয়েটা জবাব দিল না। স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
মাওলানা দৃষ্টি ফেরাতে পারলেন না। কী সুন্দরই না মেয়েটার মুখ! বেহেশতের হুরদের যে বর্ণনা আছে এই মেয়ে সে–রকম। মাওলানা আবারাে বললেন, তুমি কে ?
মেয়েটা বলল, আমি জুলেখা। মাওলানা বিড়বিড় করে বললেন, জুলেখা। জুলেখা। জুলেখা। কোরান মজিদে জুলেখার কথা উল্লেখ না থাকলেও তার স্বামী নবি ইউসুফের কথা অনেকবার বলা হয়েছে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
মেয়েটা বলল, আপনের কলেরা হয়েছে। মাওলানা বললেন, জুলেখা, পানি খাব। …জুলেখা বলল, কলেরা রােগীরে পানি দেওয়া যায় না। পানি খাইলে রােগ বাড়ে। ….মাওলানা বললেন, পানি খাব। জুলেখা পানি খাব।
জুলেখা ঘরে ঢুকে গেল। মাওলানার মনে হলাে, শয়তান তাকে নিয়ে যে খেলা দেখাচ্ছিল সেই খেলার অবসান হয়েছে। মেয়েটা ফিরবে না।
মেয়েটা কিন্তু ফিরল । হাতে কাঁসার গ্লাস নিয়ে ফিরল । মাওলানা আবার বমি করতে শুরু করলেন। জুলেখা তাঁকে এসে ধরল। মাওলানা বললেন, তুমি কে গাে ? ………..জুলেখা জবাব দিল না।
বাজারের দিক থেকে কাঁসার ঘণ্টা বাজার শব্দ শুরু হয়েছে। খুব হৈচৈ হচ্ছে। কেউ একজন মারা গেছে কলেরায়। ঘণ্টা বাজিয়ে ওলাউঠা দেবীকে দূরে সরানাের চেষ্টা। দেবী একবার যখন এসেছেন এত সহজে যাবেন না। তিনি এসেছেন মায়ের বাড়ির দেশে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
ওলাউঠা দেবী কোনাে সহজ দেবী না। বড়ই কঠিন দেবী। তিনি যখন দেখা দেন অঞ্চলের পর অঞ্চল শেষ করে দেন। শীতলা দেবীর মতাে তিনি তার চেহারা দেখান না। তিনি ঘােমটায় মুখ আড়াল করে হাঁটেন। হৈচৈ পছন্দ করেন না। ধূপ ধােনর গন্ধ পছন্দ করেন না। তাঁর সবচেয়ে অপছন্দ নদী । শীতলা দেবী যেমন অনায়াসে নদীর পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলে যান, তিনি তা পারেন না। তাঁকে খেয়ামাঝির সাহায্য নিয়ে নদী পারাপার করতে হয়। | ওলাদেবীর হাত থেকে বান্ধবপুরের হিন্দুদের রক্ষার জন্যে বটকালীর মন্দিরে কালীপূজা দেয়া হয়েছে।
পাঠা বলি হয়েছে। মাটির হাড়িতে পশুর রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেই রক্ত দিয়ে সবাই ভক্তিভরে কপালে ফোটা দিয়েছে। কপালে যতক্ষণ এই রক্ত থাকবে ততক্ষণ ওলাউঠা দেবী কাছে ভিড়বে না। তিনি পূজার পশুর রক্ত পছন্দ করেন না। মন্ত্রপূত একটা কালাে ছাগলের গলা সামান্য কেটে ছেড়া দেয়া হলাে। যন্ত্রণাকাতর এই পশু যেদিকে যাবে তার পেছনে পেছনে যাবেন ওলাদেবী। ছাগল যদি ভিন্ন গ্রামে গিয়ে মরে যায় দেবীকে সেখানেই থাকতে হবে। এই ছাগলটা প্রথমে ছুটে গ্রাম সীমানার বাইরে গিয়েও কী মনে করে আবার ফিরে এলাে। মারা গেল বাজারের মাঝখানে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
ওলাদেবীকে দূর করার জন্যে মুসলমানরাও কম চেষ্টা চালাল না। তারা গায়ে আতর মেখে ধূপকাঠি হাতে বের হলাে। ওলাদেবী তাড়ানাের মুসলমানী মন্ত্র একটু ভিন্ন। দলের প্রধান বলেন—
বলা দূর যাওরে আলী জুলফিকার এই গেরাম ছাড়িয়া যাও ..দোহাই আল্লাহর। …দলের প্রধানের বক্তব্য শেষ হওয়া মাত্র বাকি সবাই বুক থাপড়ে জিগির ধরে হক নাম, পাক নাম নাম আল্লাহর হু। আল্লাহর নূরে নবী পয়দা হু আল্লাহ হু।
হরিচরণ খুব চেষ্টা করলেন ভয়াবহ এই দুর্যোগে কিছু করার জন্যে। কোনাে হিন্দুবাড়িতে তিনি ঢুকতে পারলেন না। এই সময়েও জাত অজাত কাজ করতে লাগল । ওলাদেবী কিন্তু জাতভেদ করলেন না। তিনি শূদ্রের ঘরে যেমন উপস্থিত হলেন, ব্রাহ্মণের ঘরেও গেলেন। দেখা গেল তার কাছে সবই সমান। ঝাঁপ দিয়ে পড়ল শশী মাস্টার। যেখানেই রােগী সেখানেই তিনি। অতি আদরে রােগীর শুশ্রুষা করছেন। ডাবের পানি খাওয়াচ্ছেন। কোলে করে রােগীকে ঘর থেকে বের করছেন, আবার উঠান থেকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন।
রােগের প্রকোপ সবচে‘ বেশি জেলেপল্লীতে। শশী মাস্টার সেখানে উপস্থিত হতেই একজন জোড়হস্ত হয়ে বলল, বাবু আমার নমশূদ্র। আপনি ব্রাহ্মণ, আমাদের এখানে ঢুকবেন না। শশী মাস্টার বললেন, কিছুদিনের জন্যে আমিও নমশূদ্র। এখন ঠিক আছে ?
ওলাদেবীকে আটকানাের জন্যে প্রথম খেয়া পারাপার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। বান্ধবপুরের মুরুব্বিরা পরে চিন্তাভাবনা করে ঠিক করল, খেয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্তটা ভুল। তাদের উচিত ওলাদেবীকে নদী পার করে দেয়া। দেবীর বিদায় মানেই রাহুমুক্তি। খেয়া বন্ধ করে দেবীকে আটকে রাখার অর্থ বিপদ। মাথায় নেয়া।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ
দেবী দিনে চলাফেরা করেন না। উনার হাঁটাচলা সূর্য ডােবার পর। বড়গাঙে সন্ধ্যার পর খেয়া চলাচলের ব্যবস্থা নেয়া হলাে। খেয়া পারাপার করবে শেখ মর্দ। অতি সাহসী মানুষ। তাকে বলে দেয়া হলাে, ঘােমটায় মুখ ঢাকা কেউ যদি উঠে তাকে পার করতে হবে। তার সঙ্গে কোনাে কথা বলা চলবে না। পারানি চাওয়া যাবে না। দেবী যেন নৌকায় উঠেন সেই ব্যবস্থাও করা হলো। বান্ধবপুরে সন্ধ্যার পর থেকে কাঁসার ঘণ্টা বাজে, ঢােল খােল করতাল বাজে। মশাল হাতে লােকজন ছােটাছুটি করে ।
এমন অবস্থায় রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে ঘােমটায় মুখ ঢেকে কেউ একজন শেখ মর্দর নৌকার পাশে এসে দাঁড়াল। অসীম সাহসী শেখ মর্দর বুক কেঁপে উঠল। সে কোনাে কথা না বলে নৌকা ছাড়ল।
