না হার্ট হচ্ছি না। আমি যখন আপনার ঘরে ঢুকলাম তখন কিন্তু আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি বা না–চেনার ভান করেছেন।………তুমি একটা ব্যাপার লক্ষ করাে নি। আমি শর্ট সাইটেড মানুষ। আমার চোখে চশমা ছিল। কাছের জিনিস দেখার জন্যে আমি যখন চশমা পরি তখন দূরের জিনিস দেখতে পাই না। তােমাকে আমি আসলেই চিনতে পারি নি। তুমি কি কফি খাবে ? আমি খুব ভালাে কফি বানাতে পারি।
না, কফি খাব না। | আইসক্রিম খাবে ? আমি শুনেছি ঢাকা শহরে খুব ভালাে ভালাে আইসক্রিমের দোকান হয়েছে। …….আইসক্রিমও খাব না। আমাকে বাসায় যেতে হবে। আমি তােমাকে নামিয়ে দেই। বাসাটাও চিনে আসি। কখনাে যদি যেতে বলাে চট করে চলে যেতে পারব। তােমাকে কষ্ট করে ঠিকানা বলতে হবে না। আমি যদি তােমাকে বাসায় নামিয়ে দেই তাতে কি তােমার আপত্তি আছে ?
আপত্তি নেই। থ্যাংক য়ু। …….আমি বিরক্ত বােধ করছি। বিরক্তি চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের একজন শিক্ষক যদি আমাকে বাসায় নামিয়ে দিতে চান তাতে কোনাে সমস্যা নেই। মানুষটা নিজেকে আলাদা প্রমাণ করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। চেষ্টাটা যে হাস্যকর তাও ভদ্রলােক বুঝতে পারছে না। মানুষটা কি বােকা? যে এক লাফে অনেকগুলি সিঁড়ি পার হতে চায় তার প্রথমেই জানতে চাওয়া উচিত— যাকে নিয়ে সে সিঁড়ি ভাঙতে চাচ্ছে সে কি তা চায় ?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি বললাম, স্যার আপনার কি দেরি হবে? …..স্যার হাসিমুখে বললেন, না দেরি হবে না। পাের্ট কানেকশন আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এক্সপার্ট কাউকে আনতে হবে। ভালাে কথা— মােটর সাইকেলে চড়া কি তােমার অভ্যাস আছে ?
মােটর সাইকেল? ……..গাড়ি আমার খুবই অপছন্দ। মােটর সাইকেল আমার অতি পছন্দের বাহন। মােটর সাইকেলে You can feel the speed. মােটর সাইকেলে কখনাে চড়েছ? ……….না। ….চড়তে আপত্তি আছে?
আপত্তি নেই। বাঙালি মেয়েদের সম্পর্কে আমার যে কনসেপ্ট ছিল তার অনেকখানিই তুমি ভেঙে দিয়েছ। মােটর সাইকেলে তুমি আমার পেছনে যাচ্ছ এই দৃশ্য দেখে। তােমার বন্ধুরা তােমাকে ক্ষেপাবে না তাে?
ক্ষ্যাপাবে না। | দ্যাটস ভেরী গুড। যেহেতু এই প্রথমবার তুমি মােটর সাইকেলে চড়বে দেখবে তােমার খুবই ভালাে লাগবে। বাতাসে চুল উড়বে, শাড়ির আঁচল উড়বে। তােমার একটা ফিলিং হবে তুমি আকাশে উড়ছ। Flying Dutchman. চিন্তা করতেই ভালাে লাগছে না ?
আমি জবাব দিলাম না। ব্যাপারটা চিন্তা করে আমার মােটেই ভালাে লাগছে নিজের ওপর রাগ লাগছে। আমি তাে এরকম ছিলাম না। যা মনে এসেছি। বলেছি। আজ কেন এরকম হলাে ? মােটর সাইকেলে চড়তে আমার খুবই আপত্তি আছে। অথচ বললাম, আপত্তি নেই। কেন বললাম ? আমিও কি এই ভদ্রলােকের মতােই নিজেকে আলাদা ভাবছি ? না তা ভাবছি না। আমি জানি আমি কী। আমি চাচ্ছি যেন এই ভদ্রলােক মনে করেন আমি আলাদা। আমি বিশেষ কেউ।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
স্যার বললেন, মৃন্ময়ী তুমি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলে কেন? তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছ। ব্যাপারটা কী বলল তাে? ……..কোনাে ব্যাপার না স্যার। ……..আমার কী ধারণা জানাে ? আমার ধারণা তুমি ঝোকের মাথায় মােটর সাইকেলে চড়তে রাজি হয়েছিলে। এখন ঝোক কেটে গেছে। এখন আর রাজি নও। আমার ধারণা কি ঠিক?
হ্যা ঠিক। …..স্যার হাসি মুখে বললেন, আমার আসলে সাইকোলজি পড়া উচিত ছিল। দেখ কত সহজে তােমার মনের অবস্থাটা ধরে ফেললাম। তােমার অস্বস্তি বােধ করার কোনােই কারণ নেই। আমি একদিন তােমাদের বাড়িতে গিয়ে চা খেয়ে আসব। চা পাওনা রইল। ঠিক আছে?
জ্বি ঠিক আছে। স্যার আমি যাই ? …..আচ্ছা যাও। তােমাকে আলাদা করে ডেকে এনে ব্রিত করেছি— তুমি কিছু মনে করাে না। ………………………….আমি কিছু মনে করি নি। আমার ওপর রাগ লাগছে না তাে ? লাগছে না।
একটা ব্যাপার জানতে পারলে তুমি অবশ্যি রাগ করবে। ব্যাপারটা না জানানােই ভালাে। কিন্তু আমি লােভ সামলাতে পারছি না। বলেই ফেলি। ….স্যার তার সামনের টেবিলে পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দেয়া একটা কাগজ বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি প্রথমে আমার পেছনে মােটর সাইকেলে চড়তে রাজি হবে। তারপর মত বদলাবে। এই ব্যাপারটা আগেই জানতাম। কাগজে লিখে রেখেছি। পড়ে দেখ।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি কাগজ হাতে নিলাম। সেখানে পরিষ্কার লেখা— মৃন্ময়ীকে (রােল ফিফটিন) যখন বলা হবে আমার সঙ্গে মােটর সাইকেলে চড়তে সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হবে। পরে বলবে না। …….আমি কাগজটা ভাজ করে টেবিলে রেখে স্যারের ঘর থেকে বের হয়ে। এলাম।
আমার প্রচণ্ড রাগ লাগছে। নিজেকে ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ মনে হচ্ছে। …কেউ যখন নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে থাকে। চারা গাছ যেমন জল হাওয়ায় বিশাল মহীরুহ হয়। ক্ষুদ্রতার ব্যাপারটাও সে রকম। যত সময় যাচ্ছে নিজেকে ততই ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে।
বাসায় ফিরে মনে হলাে আমার কোনাে অস্তিত্ব নেই। আমি খুবই সাধারণ একজন। আলাদা কেউ না। সারাজীবন নিজেকে আলাদা ভেবেছি। এই ভাবার পেছনে কোনাে কারণ নেই। নিজেকে অন্যরকম ভাবার একটা খেলা খেলেছি। আমি খুব শক্ত ধরনের মেয়ে। কে কী বলল বা কে আমাকে নিয়ে কী ভাবল তা নিয়ে আমি কখনাে ভাবি না— তা ঠিক না। আমি ভাবি। না ভাবলে স্যারের
পেছনে মােটর সাইকেলে চড়তে পারতাম। কোনােই সমস্যা হতাে না। ……….| তরী বেগম আমাকে চা দিতে এসে বলল, আফা আপনের কী হইছে ? ………আমি বললাম, কিছু হয় নি তাে। কেন আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে আমার জীবনের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ
তরী বেগম ফিক করে হেসে ফেলে বলল, না গাে আফা। আপনেরে বড়ই সৌন্দর্য লাগতেছে। ……থ্যাংক ব্যু। তস্তুরী মাথা নিচু করে হাসছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, হাসছ কেন ? ……তস্তুরী বেগম নরম গলায় বলল, আমরার গেরাম দেশে একটা কথা আছে। কন্যার যে দিন বিবাহ ঠিক হয় হেই দিন আল্লাহপাক তার রূপ বাড়ায়ে দেন। তিন দান বাড়ে।
‘বিয়ার কন্যা সুন্দরী। ……..তিন দিয়া গুণন করি।‘ তার মানে তােমার ধারণা আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে ? রূপ তিন গুণ বেড়েছে ? …………………………হ আফা। বিয়ে ঠিক হয় নি তস্তুরী, মন খুব খারাপ হয়ে আছে।
Read more
