মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

না হার্ট হচ্ছি নাআমি যখন আপনার ঘরে ঢুকলাম তখন কিন্তু আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি বা নাচেনার ভান করেছেন।………তুমি একটা ব্যাপার লক্ষ করাে নিআমি শর্ট সাইটেড মানুষআমার চোখে চশমা ছিলকাছের জিনিস দেখার জন্যে আমি যখন চশমা পরি তখন দূরের জিনিস দেখতে পাই নাতােমাকে আমি আসলেই চিনতে পারি নিতুমি কি কফি খাবে ? আমি খুব ভালাে কফি বানাতে পারি। 

না, কফি খাব না| আইসক্রিম খাবে ? আমি শুনেছি ঢাকা শহরে খুব ভালাে ভালাে আইসক্রিমের দোকান হয়েছে। …….আইসক্রিমও খাব নাআমাকে বাসায় যেতে হবেআমি তােমাকে নামিয়ে দেইবাসাটাও চিনে আসিকখনাে যদি যেতে বলাে চট করে চলে যেতে পারবতােমাকে কষ্ট করে ঠিকানা বলতে হবে নাআমি যদি তােমাকে বাসায় নামিয়ে দেই তাতে কি তােমার আপত্তি আছে

 আপত্তি নেইথ্যাংক য়ু। …….আমি বিরক্ত বােধ করছিবিরক্তি চাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করছিআমাদের একজন শিক্ষক যদি আমাকে বাসায় নামিয়ে দিতে চান তাতে কোনাে সমস্যা নেইমানুষটা নিজেকে আলাদা প্রমাণ করার প্রাণপণ চেষ্টা করছেচেষ্টাটা যে হাস্যকর তাও ভদ্রলােক বুঝতে পারছে নামানুষটা কি বােকা? যে এক লাফে অনেকগুলি সিঁড়ি পার হতে চায় তার প্রথমেই জানতে চাওয়া উচিতযাকে নিয়ে সে সিঁড়ি ভাঙতে চাচ্ছে সে কি তা চায়

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি বললাম, স্যার আপনার কি দেরি হবে? …..স্যার হাসিমুখে বললেন, না দেরি হবে নাপাের্ট কানেকশন আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে নাএক্সপার্ট কাউকে আনতে হবেভালাে কথামােটর সাইকেলে চড়া কি তােমার অভ্যাস আছে

মােটর সাইকেল? ……..গাড়ি আমার খুবই অপছন্দ। মােটর সাইকেল আমার অতি পছন্দের বাহনমােটর সাইকেলে You can feel the speed. মােটর সাইকেলে কখনাে চড়েছ? ……….না। ….চড়তে আপত্তি আছে

আপত্তি নেইবাঙালি মেয়েদের সম্পর্কে আমার যে কনসেপ্ট ছিল তার অনেকখানিই তুমি ভেঙে দিয়েছমােটর সাইকেলে তুমি আমার পেছনে যাচ্ছ এই দৃশ্য দেখেতােমার বন্ধুরা তােমাকে ক্ষেপাবে না তাে

ক্ষ্যাপাবে না| দ্যাটস ভেরী গুডযেহেতু এই প্রথমবার তুমি মােটর সাইকেলে চড়বে দেখবে তােমার খুবই ভালাে লাগবেবাতাসে চুল উড়বে, শাড়ির আঁচল উড়বেতােমার একটা ফিলিং হবে তুমি আকাশে উড়ছFlying Dutchman. চিন্তা করতেই ভালাে লাগছে না

আমি জবাব দিলাম নাব্যাপারটা চিন্তা করে আমার মােটেই ভালাে লাগছে  নিজের ওপর রাগ লাগছেআমি তাে এরকম ছিলাম নাযা মনে এসেছিবলেছিআজ কেন এরকম হলাে ? মােটর সাইকেলে চড়তে আমার খুবই আপত্তি আছেঅথচ বললাম, আপত্তি নেইকেন বললাম ? আমিও কি এই ভদ্রলােকের মতােই নিজেকে আলাদা ভাবছি ? না তা ভাবছি নাআমি জানি আমি কীআমি চাচ্ছি যেন এই ভদ্রলােক মনে করেন আমি আলাদাআমি বিশেষ কেউ। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

স্যার বললেন, মৃন্ময়ী তুমি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলে কেন? তােমাকে দেখে মনে হচ্ছে গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছব্যাপারটা কী বলল তাে? ……..কোনাে ব্যাপার না স্যার। ……..আমার কী ধারণা জানাে ? আমার ধারণা তুমি ঝোকের মাথায় মােটর সাইকেলে চড়তে রাজি হয়েছিলেএখন ঝোক কেটে গেছেএখন আর রাজি নওআমার ধারণা কি ঠিক

হ্যা ঠিক। …..স্যার হাসি মুখে বললেন, আমার আসলে সাইকোলজি পড়া উচিত ছিলদেখ কত সহজে তােমার মনের অবস্থাটা ধরে ফেললামতােমার অস্বস্তি বােধ করার কোনােই কারণ নেইআমি একদিন তােমাদের বাড়িতে গিয়ে চা খেয়ে আসবচা পাওনা রইলঠিক আছে

জ্বি ঠিক আছেস্যার আমি যাই ? …..আচ্ছা যাওতােমাকে আলাদা করে ডেকে এনে ব্রিত করেছিতুমি কিছু মনে করাে না। ………………………….আমি কিছু মনে করি নিআমার ওপর রাগ লাগছে না তাে ? লাগছে না। 

একটা ব্যাপার জানতে পারলে তুমি অবশ্যি রাগ করবেব্যাপারটা না জানানােই ভালােকিন্তু আমি লােভ সামলাতে পারছি নাবলেই ফেলি। ….স্যার তার সামনের টেবিলে পেপারওয়েট দিয়ে চাপা দেয়া একটা কাগজ বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, তুমি প্রথমে আমার পেছনে মােটর সাইকেলে চড়তে রাজি হবেতারপর মত বদলাবেএই ব্যাপারটা আগেই জানতামকাগজে লিখে রেখেছিপড়ে দেখ। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি কাগজ হাতে নিলামসেখানে পরিষ্কার লেখামৃন্ময়ীকে (রােল ফিফটিন) যখন বলা হবে আমার সঙ্গে মােটর সাইকেলে চড়তে সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হবেপরে বলবে না। …….আমি কাগজটা ভাজ করে টেবিলে রেখে স্যারের ঘর থেকে বের হয়েএলাম। 

আমার প্রচণ্ড রাগ লাগছেনিজেকে ক্ষুদ্র এবং তুচ্ছ মনে হচ্ছে। …কেউ যখন নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে থাকেচারা গাছ যেমন জল হাওয়ায় বিশাল মহীরুহ হয়ক্ষুদ্রতার ব্যাপারটাও সে রকমযত সময় যাচ্ছে নিজেকে ততই ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। 

বাসায় ফিরে মনে হলাে আমার কোনাে অস্তিত্ব নেইআমি খুবই সাধারণ একজনআলাদা কেউ নাসারাজীবন নিজেকে আলাদা ভেবেছিএই ভাবার পেছনে কোনাে কারণ নেইনিজেকে অন্যরকম ভাবার একটা খেলা খেলেছিআমি খুব শক্ত ধরনের মেয়েকে কী বলল বা কে আমাকে নিয়ে কী ভাবল তা নিয়ে আমি কখনাে ভাবি নাতা ঠিক নাআমি ভাবিনা ভাবলে স্যারের 

পেছনে মােটর সাইকেলে চড়তে পারতামকোনােই সমস্যা হতাে না। ……….| তরী বেগম আমাকে চা দিতে এসে বলল, আফা আপনের কী হইছে ? ………আমি বললাম, কিছু হয় নি তােকেন আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে আমার জীবনের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

তরী বেগম ফিক করে হেসে ফেলে বলল, না গাে আফাআপনেরে বড়ই সৌন্দর্য লাগতেছে। ……থ্যাংক ব্যুতস্তুরী মাথা নিচু করে হাসছেআমি অবাক হয়ে বললাম, হাসছ কেন ? ……তস্তুরী বেগম নরম গলায় বলল, আমরার গেরাম দেশে একটা কথা আছেকন্যার যে দিন বিবাহ ঠিক হয় হেই দিন আল্লাহপাক তার রূপ বাড়ায়ে দেনতিন দান বাড়ে। 

বিয়ার কন্যা সুন্দরী। ……..তিন দিয়া গুণন করিতার মানে তােমার ধারণা আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে ? রূপ তিন গুণ বেড়েছে ? …………………………আফাবিয়ে ঠিক হয় নি তস্তুরী, মন খুব খারাপ হয়ে আছে। 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *