মৃন্ময়ী-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

আমার বাবার নাম মইনু মিয়া। খুবই হাস্যকর নাম। কাঠ মিস্ত্রি বা দরজিদের এরকম নাম থাকে। আমার দাদাজান দরজি ছিলেন, এবং তিনি তাঁর মতাে করেই ছেলের নাম রেখেছেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি, তার ছেলে গিরায় হিসাব না করে, নেনােমিটার, পিকো সেকেন্ডে হিসাব করবে। আমার বাবা মইনু মিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফলিত পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক হিসেবে জীবন শুরু করবেন। 

এখন অবশ্য তার নাম মাইন খান। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময়ই তিনি প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এফিডেভিট করে নাম বদলেছেন। তবে তাঁর রক্তে দরজির যে ব্যাপারটা পৈতৃক সূত্রে চলে এসেছে তা এখনাে আছে। আমার বাবা মাইন খান বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দিয়ে গার্মেন্টসের কারখানা দিয়েছেন। গার্মেন্টসের নাম মৃন্ময়ী এ্যাপারেলস‘। মৃন্ময়ী আমার নাম। ভালাে নাম মৃন্ময়ী, ডাক নাম মৃ। আমার ভাবতে খুবই খারাপ লাগে যে, বিদেশী লােকজন বাবার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির শার্ট গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের ঘাড়ের সঙ্গে যে স্টিকার লেগে আছে সেখানে লেখা মৃন্ময়ী। অচেনা মানুষের গায়ের ঘামের গন্ধে আমাকে বাস করতে হচ্ছে । 

বাবা যেমন ইউনিভার্সিটিতে সেকেন্ড ইয়ারে উঠে এফিডেভিট করে তার নাম বদল করেছেন, আমি নিজেও তাই করব। অন্য কোনাে নাম ঠিক করব, যে নাম কেউ ঘাড়ে করে ঘুরে বেড়াবে না। আমি মনে মনে নাম খুঁজে বেড়াচ্ছি। বাবাকেও একদিন বললাম, বাবা, আমাকে সুন্দর একটা নাম দেখে দাও তাে। আমি ঠিক করেছি নাম বদলাব। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১)

বাবা বিস্মিত হয়ে বললেন, মৃন্ময়ী তাে খুবই সুন্দর নাম। নামটায় ঘামের গন্ধ বাবা। …………..ঘামের গন্ধ মানে কী? বুঝিয়ে বলতাে। তাের সব কথা বােঝার মতাে বুদ্ধি আমার নেই। 

পরে একসময় বুঝিয়ে বলব। আজ না। না এখনই বল । মৃন্ময়ীর সঙ্গে ঘামের সম্পর্ক কী? …..বাবা চোখ থেকে চশমা খুলে তাকিয়ে রইলেন। খুব অবাক হলে তিনি এই কাজটা করেন। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলেন। আমার ধারণা তিনি এই কাজটা করেন যাতে অন্যরা তাঁর বিস্মিত দৃষ্টি দেখতে পায়। 

আমার বাবা খুবই বুদ্ধিমান একজন মানুষ। এক থেকে দশের মধ্যে যদি বুদ্ধির স্কেল করা হয় সেই স্কেলে বাবার বুদ্ধি হবে ১৩, দশের চেয়েও তিন বেশি। বাবাকে বিচার করতে হলে স্কেলের বাইরে যেতে হবে। এটা তিনি নিজে ভালাে করে জানেন। তার মধ্যে সূক্ষ্ম একটা চেষ্টা থাকে যেন অন্যরাও ব্যাপারটা চট করে ধরে ফেলে। 

মাঝে মাঝে অতিরিক্ত বুদ্ধিমান মানুষকে বােকা বােকা লাগে। বাবাকে আজ সে রকমই লাগছে। তিনি গা দুলিয়ে হাসার চেষ্টা করছেন। হাসিটা মনে হচ্ছে ঠোট থেকে নেমে এসে শূন্যে ঝুলছে। এই হাসির আমি নাম দিয়েছি ‘ঝুলন্ত মাকড়সা হাসি। মাকড়সা যেমন সুতা ধরে নিচে নামতে থাকে, আবার ওপরে ওঠে, আবার খানিকটা নিচে নেমে যায়— এই হাসিও সে রকম। মাঝে মাঝে হাসি উঠছে, মাঝে মাঝে নামছে। ব্যাপারটা বাবাও বুঝতে পারছেন। তারপরেও এই বােকা হাসি থেকে বের হতে পারছেন না।

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার ধারণা তিনি নিজের ওপর খানিকটা রেগেও গেছেন। মনের ভেতর চাপা রাগ, মুখে নকল ঝুলন্ত–মাকড়সা হাসি— সব মিলিয়ে খিচুড়ি অবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিদ্যার প্রাক্তন অধ্যাপক মৃন্ময়ী এ্যাপারেলসের এমডি মাইন খান সাহেবকে দেখে আমার খানিকটা মায়াই লাগছে ।বাবার ভেতর এই খিচুড়ি’ অবস্থা তৈরি করেছেন তার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু আজহার উদ্দিন। প্রায় ছয় ফুটের কাছাকাছি একজন মানুষ। অতিরিক্ত রােগ। লম্বা এবং রােগা মানুষরা সাধারণত খানিকটা কুঁজো হয়ে হাঁটেন।

ইনি হাঁটেন বুক টান করে। হাঁটা অবস্থায় তাকে দেখলে মনে হবে একটা সরল রেখা হেঁটে চলে যাচ্ছে। তার ঘাড়েও খানিকটা সমস্যা আছে। তিনি ঘাড় কাত করে পাশের জনকে দেখতে পারেন না। তাকে পুরাে শরীর ঘােরাতে হয়। তখন তাকে আর মানুষ মনে হয় না। মনে হয় রােবট সিগন্যাল পেয়ে ঘুরছে। 

আজহার চাচা নানান ধরনের ব্যবসা করেন। সেইসব ব্যবসার প্রায় সবই দু‘নম্বরী। বাড্ডায় তার একটা কারখানা আছে, সেখানে নকল শ্যাম্পু তৈরি হয়। এবং বিদেশী বােতলে ভর্তি হয়ে বাজারে বিক্রি হয়। একবার তিনি টেলিফোন করে আমাকে বললেন, মৃন্ময়ী মা শােনাে, ইংল্যান্ডের একটা শ্যাম্পু আছে পেনটিন না কী যেন নাম। ঐটা কিনবে না। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১)

আমি বললাম, কেন আপনার কারখানায় তৈরি হচ্ছে ? ……অজিহার চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, এত কথার দরকার কী? কিনতে না করেছি কিনবে না। ………আজহার চাচা গােপন পথে চালনা পাের্টে বিদেশী সিগারেট আনেন। মদ আনেন। তিনি নিজে মদ সিগারেট কিছুই খান না। অতি আল্লাহ ভক্ত মানুষ। রমজান মাস ছাড়াও প্রতি মাসে তিন চার দিন রােজা থাকেন।

বৃদ্ধ বয়সে শরীর নষ্ট হয়ে গেলে রােজা থাকতে পারবেন না। এই কারণেই আগে ভাগে রােজা রেখে ফেলা। তবে বাবার জন্যে প্যাকেট করে বােতল প্রায়ই নিয়ে আসেন। আমাদের ঘর ভর্তি হয়ে গেছে নানান সাইজের বােতলে। এর অনেকগুলােতে পানি ভরে মানিপ্লান্ট লাগানাে হয়েছে। বিদেশী মদের বােতলে মানিপ্লান্ট খুব। ভালাে হয়। 

আজহার চাচা উমরা হজ করতে গিয়েছিলেন মক্কা শরীফ। সেখান থেকে বাবার জন্যে একটা উপহার নিয়ে এসেছেন। উপহারের প্যাকেট হাতে নেবার পর থেকেই আমার বুদ্ধিমান বাবা বােকার হাসি হাসছেন। তার চোখ মুখও কেমন যেন বদলে গেছে। উপহারটা হলাে কাফনের কাপড়। 

আজহার চাচা বাবার দিকে তাকিয়ে খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে বললেন, নবীজীর কবর মােবারক ছোঁয়ায়ে এনেছি। তিন সেট আনলাম— আমার জন্যে একসেট, আমার শ্বশুর সাহেবের জন্যে একসেট আর তােমার জন্যে একসেট। ……….বাবা বললেন, ভালাে করেছ। অতি উত্তম করেছ। 

আজহার চাচা বললেন, ধর্মকর্মের দিকে তােমার টান তাে সামান্য কম, এইজন্যে ইচ্ছা করেই কাফনের কাপড়টা আনলাম। চোখের সামনে এই জিনিস থাকলে পরকালের চিন্তা মাথায় আসে। তাছাড়া চলে যাবার সময় তাে আমাদের হয়েই গেছে। তােমার কত চলছে— ফিফটি টু না থ্রি ? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১)

তাহলে তাে খবর হয়ে গেছে। সিগনাল ডাউন। আজরাইলকে নিয়ে ট্রেন রওনা দিয়েছে। মেল ট্রেন, পথে থামবে না। ………….বাবা শুকনা গলায় বললেন, ঠিক বলেছ। 

আজহার চাচা বললেন, কাপড়টা পছন্দ হয় কি–না দেখ । সাধারণ মার্কিন লং ক্লথ না। হাইকোয়ালিটি পপলিন। সৌদি রাজপরিবারের সবার এই কাপড়ের কাফন হয়। খোঁজ–খবর নিয়ে কিনেছি। …………..মনে হয় অনেক ঝামেলা করেছ। 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *