মৃন্ময়ী-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

পছন্দ হয়েছে কি–না বল। এইসব গিফট সবাই আবার সহজে নিতে পারে না। আমার শ্বশুর সাহেব তাে খুবই রাগ করলেন। আমাকে কিছু বলেন নি। আমার শাশুড়ি আম্মার সঙ্গে গজগজ করেছেন। তুমি আবার রাগ করাে নি তাে? বাবা গা দুলিয়ে নকল হাসি হাসতে হাসতে বললেন, রাগ করার কী আছে? তার মুখের হাসি আরাে ঝুলে গেল। আজহার চাচা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মা মৃন্ময়ী, তােমার জন্যেও সামান্য উপহার আছে। মক্কার মিষ্টি তেতুল আর একটা তসবি। 

আমি বললাম, থ্যাংক ইউ চাচা। তসবির শুটিগুলা প্লাস্টিকের না, আকিক পাথরের। তুমি জান কি–না জানি। , আকিক পাথর হলাে আমাদের নবীজীর খুব পছন্দের পাথর। পবিত্র কোরান মজিদেও আকিক পাথরের উল্লেখ আছে। তেতুল একটু খেয়ে দেখাে তাে মা। চিনির মতাে মিষ্টি। এক বােতল জমজমের পানিও এনেছি। ভালাে জায়গায় তুলে রাখে। অসুখ–বিসুখ হলে চায়ের চামচে এক চামচ খাবে। তবে খেতে হবে। খুবই আদবের সঙ্গে।

দাঁড়িয়ে খাবে না। বসে খাবে, এবং বিসমিল্লাহ্ বলে খাবে। ভালাে কথা নাপাক অবস্থায় খাবে না । আমি বললাম, আপনি কি চা খাবেন চাচা? আপনার তাে মনে হয় ঠাণ্ডা লেগেছে। আদা দিয়ে এক কাপ চা নিয়ে আসি? নিয়ে আয় এক কাপ চা। সন্ধ্যার পর চা খেলে আমার অবশ্য ঘুমের সমস্যা হয়। ঠিক আছে তুই যখন বলছিস তুই তাে জানিস না মা, তােকে অত্যন্ত পছন্দ করি। নবীজীর রওজা মােবারকে যে কয়জনের জন্যে দোয়া করেছি তুই আছিস তাদের মধ্যে। চা নিয়ে আয়, খেয়ে বিদায় হই।। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২)

আজহার চাচা একটু আগে আমাকে তুমি তুমি করে বলছিলেন। এখন তুই তুই করছেন। এর মানে হলাে তিনি এখন আমার প্রতি খুবই মমতা পােষণ করছেন। বাবাকেও মাঝে মাঝে তিনি তুই বলার চেষ্টা করেন। বাবা পাত্তা দেননা। …….আমি বললাম, রাতে খেয়ে যান না চাচা। আপনার প্রিয় তরকারি রান্না হয়েছে। 

আজহার চাচা অবাক হয়ে বললেন, আমার যে প্রিয় তরকারি আছে তাইতাে জানি না। আমার প্রিয় তরকারি কী? ………….ছােট মাছ দিয়ে সজনা। …………….তুই মনে করে বসে আছিস ? আশ্চর্য কাণ্ড! কবে তােকে বলেছিলাম, আমার নিজেরই তাে মনে নাই। মাইন দেখেছ তােমার এই মেয়ে তাে বড়ই আশ্চর্য! আচ্ছা ঠিক আছে, রাতের খানা খেয়েই যাই। 

বাবা বিরক্ত মুখে তাকাচ্ছেন। আজহার চাচার রাতে ভাত খাবার জন্যে থেকে যাবার ব্যাপারটা তিনি পছন্দ করছেন না। বুদ্ধিমান মানুষ অল্প বুদ্ধির মানুষদের সঙ্গ পছন্দ করে না। অল্প বুদ্ধির মানুষদেরকে দিয়ে অনেক কাজ আদায় করা যায় বলেই তাদের সহ্য করা হয়।

ব্যবসা বাণিজ্য বাড়াবার জন্যে এক সময় আজহার চাচার বুদ্ধি পরামর্শ এবং অর্থের বাবার প্রয়ােজন ছিল। এখন প্রয়ােজন নেই। আজহার চাচা ব্যাপারটা বুঝতে পারছেন না। তাঁর হয়তাে ধারণা হয়েছে বাবা তার হজের গল্প খুবই আগ্রহ নিয়ে শুনছেন। বাবার চোখে মুখে মােটা দাগের বিরক্তি কিছুই আজহার চাচার চোখে পড়ছে না। তিনি বাবার দিকে ঝুঁকে এসে হজের গল্প শুরু করলেন— 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২)

কাবা তােয়াফের সময় কী ঘটনা ঘটেছে শােনাে। আমার পাশাপাশি হাঁটছে এক আফ্রিকান মহিলা। চার পাঁচ মণ ওজন। হাতির মতাে থপথপ শব্দ করে হাঁটে। পায়ের ওপর পাড়া দেয়। কনুই দিয়ে গুতা দেয়, পিঠে ধাক্কা দেয়। আল্লাহর ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তাে আমি মেয়েছেলের সঙ্গে ঝগড়া করতে পারি না। এমন বিপদে পড়লাম! দোয়া টোয়া সব ভুলে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পরে দেখি এই মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকা করে বলল, ‘ছেরেং ছেরেং‘। একটু পর পর বলে, বলে আর মুখ বাঁকা করে হাসে। ছেরেং মানে কী জানি না নিশ্চয়ই কোনাে গালাগালি । মইন তুমি কি ছেরেং শব্দের মানে জানাে ? 

বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, ইদ্দিস ভাষায় ছেরেং মানে হলাে সরু, যেমন ধর ছেরেং গা। গা হলাে নদী। ছেরেং গা হলাে সরু নদী। তােমার রােগা পাতলা চেহারা দেখে রসিকতা করছিল। 

চিন্তা করাে অবস্থা— কাবা ঘরে এসে ঠাট্টা মশকরা শুরু করেছে। কাবা শরীফের কাছে এসে মানুষ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়— আমি এক মেয়েছেলের ভয়ে ভীত হয়ে গেলাম। ……বাবা বললেন, ভীত হওয়ার কী আছে ? 

আজহার চাচা বললেন, তুমি কিছু জানাে না বলে এমন কথা বলতে পারলে। এই মহিলা যদি একবার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিত, তাহলে আর আমাকে উঠতে হতাে না। হাজার হাজার হাজি আমার গায়ের ওপর দিয়ে হেঁটে চলে যেত— ইনটেন্ট ডেথ।

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২)

বহু মানুষ এইভাবে মারা গেছে। যাই হােক, ঐ মহিলাকে কীভাবে শায়েস্তা করেছি শােনাে। ভুল বললাম শায়েস্তা আমি করি নাই। আমাকে কিছু করতে হয় নাই। ব্যবস্থা আল্লাহপাকই নিয়েছেন। আমি উসিলা মাত্র। সেই ঘটনাও বিস্ময়কর! 

আজহার চাচা এই পর্যন্ত বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মা, তুই এখন একটু অন্য ঘরে । গল্পের এই অংশটা তাের শােনা ঠিক না। ………….আমি বললাম, অশ্লীল না–কি চাচা? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

শ্লীল–অশ্লীল কিছু না। সব গল্প সবার জন্যে না। মা তুই যাতত। আমাকে আদা চা খাওয়াবি বললি – আদা চা কই? ………..আমি বললাম, স্টোরীর আসল মজার জায়গাটা না শুনে আমি নড়ব না চাচা। আমি একটা আন্দাজ করেছি। দেখি আন্দাজটা মেলে কি–না। 

মৃন্ময়ী মা, যা রান্নাঘরে যা। আমি রান্নাঘরে চলে এলাম। রান্নাঘরে মা নিচু গলায় আমাদের বুয়া তস্তুরী বেগমকে শায়েস্তা করছেন। তন্তুরী কী অপরাধ করেছে বােঝা যাচ্ছে না । মায়ের শাসানি শুনে মনে হচ্ছে ভয়ঙ্কর কিছু করেছে, যদিও তন্তুরী বেগমের ভয়ঙ্কর কোনাে অপরাধ করার ক্ষমতাই নেই। সবচে বড় অপরাধ যা সে নিয়মিত করে তা হলাে তরকারিতে লবণ বেশি দিয়ে দেয়। তারপর সেই লবণ কমানাের জন্যে কাঠকয়লা দেয়। লবণের তাতে কোনাে উনিশ বিশ হয় না। খেতে বসে কৈ মাছের সঙ্গে এক টুকরাে কয়লা উঠে আসে। মা আমাকে দেখে বিরক্ত মুখে বললেন, মওলানা গিয়েছে ? 

আমি বললাম, যান নি। 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *