বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মৃন্ময়ী, একে এক তলার বারান্দাওয়ালা ঘরটায় থাকতে দে। যা, ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যা । ও সাথে কী কী এনেছে একটু দেখ। টুথপেস্ট, ব্রাশ না থাকলে জামানকে বল কিনে এনে দিতে। টগর এর ডাক নাম। তুই ভাইয়া ডাকবি। তাের চে’ বয়সে বড়।
মা’র মতাে আমিও খুবই অবাক হয়েছিলাম। তবে অবাক হবার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটার জন্যে মায়া লাগছিল। কারণ ছেলেটা আসার পর থেকে নিঃশব্দে কাঁদছিল। ফুটফুটে একটা ছেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কারাে দিকে তাকাচ্ছে না। তার শরীর সামান্য কাপছে। বাবা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, তুমি কাঁদছ কেন? কাঁদবে না। ছেলেটা কান্না বন্ধ করল না। সে এমনভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল যে, চোখের জল নাক বেয়ে শিশিরের ফোটার মতাে টপটপ করে পড়ছিল।
তারপর কতদিন কেটে গেছে, ভাইয়া এখন কত বড় হয়েছে, এখনাে তার দিকে তাকালে শৈশবের দৃশ্যটা মনে পড়ে। আমি স্পষ্ট দেখি তার নাক বেয়ে টপটপ করে চোখের পানি পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে মনটা খারাপ হয়ে যায়। চোখের সামনে এই দৃশ্যটা ভাসে বলেই ভাইয়া যে বড় হয়েছে এটা আমার মনে থাকে না। মনে হয় তার বয়স যেন কৈশােরেই থেমে আছে। স্টিল ছবির মতাে। ছবির মানুষের বয়স বাড়ে না। রাত বারােটার মতাে বাজে।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৫)
আমি আমার ঘরের বারান্দায় বসে আছি। পুরাে বাড়িতে শুধু এই জায়গাটা আমার নিজের। এখানে কারাের ঢােকার অনুমতি নেই। আমার শােবার ঘরে যে কেউ আসতে পারে। কিন্তু বারান্দায় না। রেলিং–এর পাশে দু’টা ফুলের টবে অপরাজিতা গাছের চারা লাগিয়েছিলাম। শুরুতে চারা দুটির অবস্থা জন্ডিসের
রােগীর মতাে ছিল, এখন অবস্থা ভিন্ন। বারান্দার রেলিং গাছে ছেয়ে গেছে। অপরাজিতা ফুল যে এত সুন্দর তাও আমার জানা ছিল না। বারান্দায় যখন বসি তখন মনে হয় নির্জন কোনাে পার্কের অপরাজিতার বনে বসে আছি। আমাকে ঘিরে ফুলের উৎসব হচ্ছে। ঘুমুতে যাবার আগে আমি কিছুক্ষণ এই বারান্দায় বসি। অপরাজিতা ফুলের কোনাে গন্ধ নেই। আশ্চর্যের ব্যাপার হলাে বারান্দায় যখন বসি তখন অপরাজিতা ফুলের গন্ধ পাই। গন্ধটা অদ্ভুত বেলী ফুলের সঙ্গে লেবু পাতা কচলালে হয়তাে এ রকম গন্ধ হয়। ঘুমুতে যাবার আগে এই বিশেষ গন্ধটা আমার নাকে না এলে ঘুম হয় না।
টানা বারান্দায় কে যেন অস্থির ভঙ্গিতে হাঁটছে! অস্থির ভঙ্গিতে হাঁটার মতাে মানুষ আমাদের বাড়িতে কেউ নেই। আমরা সবাই খুবই সুস্থির। দ্র বিনয়ী এবং নিচু গলায় কথা বলা টাইপ ফ্যামিলি। বাবা যখন মা‘র সঙ্গে ঝগড়া করেন তখনও তার গলা ভদ্রতার সীমা মেনে চলে। পাশের বাড়ির কেউ তার রাগারাগি শুনে ফেলবে কিংবা রান্নাঘরের কাজের বুয়া শুনে ফেলবে এমন কখনাে হবে না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৫)
বাবা যখন বাড়াবাড়ি ধরনের রাগ করেন তখন নিজে কথা বলা বন্ধ করে দেন। তার রাগের কঠিন কথাগুলাে আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যেতে হয়। আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার দিনে বাবা–মা’র মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই হলাে। এক পর্যায়ে বাবা খুবই রেগে গেলেন এবং আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, তাের মাকে বলতাে এ বাড়ি ছেড়ে কিছুদিন তার মায়ের বা বােনের বাড়িতে যেন থেকে আসে। তাকে অসহ্য লাগছে। মুখের দিকে তাকালেই গায়ে আগুন ধরে যাচ্ছে। প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে। ঘাড় ব্যথা করছে। শেষে স্ট্রোক ফোক হয়ে বেকায়দা অবস্থা হবে।
আমি মা‘র কাছে গিয়ে বললাম, মা, বাবা বােধহয় তােমার সঙ্গে রাগারাগি করছিল। এখন যে–কোনাে কারণেই হােক রাগটা ঝপ করে পড়ে গেছে। বাবা এখন চাচ্ছে পহেলা বৈশাখে তােমাকে যে শাড়িটা কিনে দিয়েছিল তুমি যেন সেই। শাড়িটা পরে বাবার সামনে যাও।
মা থমথমে গলায় বললেন, শাড়ি পরে তার সামনে যেতে বলল ? একটু আগে একগাদা কুৎসিত কথা বলেছে, আর এখন বলছে শাড়ি পরে তার সঙ্গে ঢং করতে? আমি কি কাছুয়া না–কি ? ………কাছুয়া আবার কোন বস্তু ।
কোন বস্তু সেটা তােকে বলতে পারব না। আসল কথা তাের বাপের সঙ্গে অনেক ঢং করেছি। আর ঢং করব না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৫)
ঢং করতে হবে না। তুমি সেজে গুজে সামনে যাও। শুধু একটা রিকোয়েস্ট মা– কালচে টাইপ লিপস্টিক ঠোটে দেবে না। তােমাকে মানায় না। ……….ঐ শাড়ি পরব কী করে? ব্লাউজ বানানাে হয় নি। কাছাকাছি কোনাে ব্লাউজ নেই ? খুঁজলে হয়তাে পাওয়া যাবে।
তুমি খুঁজতে থাক মা। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। আজ প্রথম পরীক্ষা, আধা ঘন্টা আগে যেতে হবে। সীট কোথায় পড়েছে খুঁজে বের করতে হবে। …………………….ঐ শাড়িটাই বা হঠাৎ করে পরতে বলছে কেন?
ঐ শাড়ি নিয়ে তােমাদের মধ্যে নিশ্চয়ই রােমান্টিক কিছু ব্যাপার ট্যাপার আছে। তােমাদের ঝগড়ার ব্যাপারগুলি আমি জানি। রােমান্টিক ব্যাপারগুলিতে জানি না।
আমি মার সামনে থেকে চলে গেলাম। মা গেলেন শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ খুঁজতে। তিনি ঠিকই শাড়ি পরে সেজে গুজে বাবার সামনে যাবেন এবং শুকনাে গলায় বলবেন, পরলাম তােমার শাড়ি। এখন কী করতে হবে ? নাচব ?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৫)
আমার অতি বুদ্ধিমান বাবা তৎক্ষণাৎ ধরে ফেলবেন ঘটনা কী। তিনি নিজেকে সামলে নেবেন এবং হাসি মুখে বলবেন, বাহ্, তােমাকে খুব মানিয়েছে তাে।……………………………………………………………. একটু নাচ, খারাপ কী ?
আমার মা যে খুবই বােকা টাইপ একজন মহিলা তা বােঝা প্রায় অসম্ভব। যে–কোনাে বিষয় নিয়ে তিনি বেশ গুছিয়ে কথা বলেন। তাঁর কথা শুনলে মনে হয় ঐ বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান আছে।
Read more
