ভাইয়ার ফিরতে ফিরতে রাত বারটা একটা বাজে। আগে খাবার টেবিলে তার ভাত ঢাকা দেওয়া থাকত। সে ঠাণ্ডা কড়কড়া ভাত খেয়ে নিঃশব্দে শুয়ে পড়ত। অন্যদের ডিসটার্ব হবে এইজন্যে খাবার ঘরের বাতি পর্যন্ত জ্বলত না। বারান্দার বাতির আলাে তার জন্যে যথেষ্ট। ভাত খেয়ে এটো থালাবাসন যে টেবিলে রেখে দিত তা না। সব কিছু ধুয়ে মুছে মিটসেফে তুলে রেখে যেত যাতে বাবা সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে না পারেন রাতে কেউ খেয়েছে।
গত বুধবার থেকে বাবার হুকুমে টেবিলে ভাত রাখা বন্ধ হয়েছে। বাবা কঠিন গলায় বলেছেন, দ্রলােকের বাড়িতে একটা সিস্টেম থাকবে। রাত দু’টার সময় বাড়ির বড় ছেলে একা একা ভাত খাবে এসব কী ? এটা কি পাইস হােটেল ? রাত এগারােটার মধ্যে বাড়ি ফিরলে খাবার আছে। এগারােটার পরে কেউ যদি আসে তাকে বাইরে থেকে খেয়ে আসতে হবে। ফ্রীজ খুলে এটা সেটা যে খেয়ে ফেলবে তাও হবে না। ………….ফ্রীজ খােলা যাবে না। এই হুকুম আমার জন্যেও প্রযােজ্য। আমি রাত এগারােটার মধ্যে না ফিরলে আমার জন্যেও খাবার থাকবে না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
ভাগ্য ভালাে ভাইয়া তার ঘরে। দরজা খােলা, বাতি নিভিয়ে সে শুয়ে আছে। আমি ঘরে ঢুকতে সে বলল, বাতি জ্বালাবি না খবরদার । ……….বাতি নিয়ে ভাইয়ার কিছু সমস্যা আছে। ইলেকট্রিকের আলাে তার নাকি চোখে লাগে। চোখ কড়কড় করে। চোখ দিয়ে পানি পড়ে। বেশির ভাগ সময়ই ভাইয়া তার ঘরে বাতি নিভিয়ে রাখে। বারান্দার আলােই না–কি তার জন্যে যথেষ্ট।
আমি বাতি জ্বালালাম। ভাইয়া বিরক্ত মুখে উঠে বসতে বসতে বলল, কী চাস ? ………আমি সহজ গলায় বললাম, সজনে চাই। ছােট মাছ দিয়ে সজনের তরকারি রান্না হবে। তুমি অতি দ্রুত সজনে কিনে আনবে। এই নাও টাকা। কুড়ি টাকায় হবে না ?
শার্ট গায়ে দিতে দিতে ভাইয়া টাকাটা নিল। অন্য যে–কোনাে ছেলের সঙ্গে এইখানেই ভাইয়ার তফাত। অন্য যে–কোনাে ছেলে বলত, এত রাতে সজনের তরকারি কেন? সজনে এমন কোনাে তরকারি না যে রাত দুপুরে খুঁজে এনে রাঁধতে হবে।
ভাইয়াকে কোনাে কিছু করতে বললে সে সেই বিষয়ে একটা প্রশ্নও করে । রাত তিনটার সময় ঘুম ভাঙিয়ে যদি তাকে বলা হয়, দু‘টা দেশী মুরগির ডিম কিনে আনতে, কোনাে প্রশ্ন না করেই সে বের হবে। এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ডিম হাতে উপস্থিত হবে। একবারও জিজ্ঞেস করবে না, রাত দুটার সময় ডিমের দরকার কেন ? তােমার আজ কম্পিউটার ক্লাশ নেই ? ছুটি না–কি ? কম্পিউটারের ইন্ট্রাক্টারদের কেউ কি মারা গেছে ?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
আমিই ছেড়ে দিয়েছি। কেন ছেড়ে দিয়েছ ? ………..কম্পিউটার স্ক্রীনের আলাে চোখে লাগে। চোখ জ্বালা করে। মাথা দপদপ করে। তা ছাড়া কিছু বুঝিও না। সব কিছু আউলা লাগে। কম্পিউটারের পড়াশােনা তাহলে বাতিল ? ছয় হাজার টাকা ভর্তি ফি জলে গেল ? হু গেল। চোখের জন্যে ভালাে একজন ডাক্তার দেখাও না কেন ? যত দিন যাচ্ছে তােমার সমস্যাটা মনে হয় বাড়ছে।
ভাইয়া জবাব না দিয়ে বের হয়ে গেল। তার চোখ লাল হয়ে আছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। চোখ উঠলে যেমন হয় ঠিক সে রকম অবস্থা। ……….ভাইয়া আমার আপন ভাই না, সৎ ভাই। আমার বাবা ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়তেন তখন যে মেয়েটিকে প্রাইভেট পড়াতেন তাকে বিয়ে করে ফেলেন। তাদের একটা ছেলে হয় তার নাম রাখা হয় হাসানুল করিম । বাবা পড়াশােনা শেষ করে কী একটা স্কলারশিপ জোগাড় করে স্ত্রী–পুত্র কেলেইংল্যান্ড চলে যান।
সেখান থেকেই দু‘ বছরের মাথায় তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রীকে ডিভাের্স লেটার পাঠিয়ে দেন। বাবা দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারের চাকরি পেয়ে যান। আবার বিয়ে করেন। তাদের একটি মেয়ে হয়। মেয়ের নাম রাখা হয় মৃন্ময়ী। আমি সেই মৃন্ময়ী।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
আমার যখন পাঁচ বছর বয়স তখন বার তের বছরের একটা ছেলে সুটকেস, ব্যাগ এবং বইপত্র নিয়ে আমাদের বাসায় থাকতে আসে। বাবা গম্ভীর মুখে সেই ছেলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। এর নাম হাসানুল করিম। ক্লাশ ফাইভে পড়ে। এ আমার ছেলে। আমার প্রথম পক্ষের সন্তান। এখন থেকে এই বাড়িতে থাকবে ।
আমার মা চোখ কপালে তুলে হেঁচকির মতাে শব্দ করে বললেন, এ–কী! প্রথম পক্ষের সন্তান মানে কী? তুমি কি আরাে বিয়ে করেছ না–কি? আমি দ্বিতীয় পক্ষ না তৃতীয় পক্ষ ? ……..বাবা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, তুমি দ্বিতীয় পক্ষ। …………কী সর্বনাশ! তুমি কি সত্যি আরেকটা বিয়ে করেছিলে ?
বাবা বললেন, হ্যা করেছিলাম। সেটা একটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিছুই না। দুর্ঘটনা নিয়ে চিৎকার করে বাড়ি মাথায় তােলার কিছু নেই। তােমার যদি কিছু বলার থাকে ঠাণ্ডা গলায়, লজিক্যালি বলাে। আমার একটাই ভুল হয়েছে, ব্যাপারটা তােমাদের জানানাে হয় নি। I am sorry for that. এখন জানলে, ফুরিয়ে গেল। …..মা বললেন, ফুরিয়ে গেল?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ
বাবা বললেন, হ্যা ফুরিয়ে গেল। তুমি যদি মনে করাে এত বড় অন্যায় যে করেছে তার সঙ্গে বাস করবে না— আমি তাতেও রাজি আছি। My door is open. মা পুরাে ঘটনায় এতই অবাক হলেন যে, চিল্কার চেঁচামেচি হৈচৈ করতে পারলেন না। হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলেন।
আসলে তিনি বােকা টাইপ বলে বুঝতেও পারছিলেন না কী করা প্রয়ােজন। আমার ধারণা এই ঘটনায় তিনি রাগ বা দুঃখ যতটা পাচ্ছিলেন, মজাও ঠিক ততটাই পাচ্ছিলেন। মা মজা পেতে পছন্দ করেন। বাংলা সিনেমা তিনি খুবই আগ্রহ করে দেখেন। এই প্রথম নিজের জীবনে বাংলা সিনেমা চলে এল। একঘেয়ে জীবনের মধ্যে বড় ধরনের বৈচিত্র্য। খারাপ কী ?
Read more
