শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ০৮ হুমায়ূন আহমেদ

শ্রাবণমেঘের দিন পর্ব – ০৮

তাকিয়ে বলল, আপনি আমার কপালের ঘাম মুছে দিন। বাঁ হাতটা সে শিশুর মাখার উপর রেখেছে। ডান হাতে সে খুঁজছে শিশুটির পা। তার নিজের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বুক ধ্বক ধ্বক করছে। শিশুর দ্বিতীয় পাটি পাওয়া যাচ্ছে না।… এই তো, এই তো পাওয়া গেছে। ও গড প্লীজ হেল্প মি। আধো তন্দ্রা আধো জাগরণের ভেতর দিয়ে দূর্গা শুনছে খোদেজার মার আনন্দিত গলা–দেখ, তোমার কন্যারে দেখ। কি সুন্দর কন্যা!

দূর্গা অনেক কষ্টে চোখ মেলল। কই, সে তার বাচ্চাটাকে তো দেখছে না–সে দেখছে পরীর মত সুন্দর একটা মেয়েকে এই সুন্দর মেয়েটা কে? কার বাড়ির মেয়ে? সে এখানে কেন? প্রবল ঘুমে দূর্গা আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। ঘুমের ঘোরেই সে শুনল–শিশু কাঁদছে। কাছে কোথাও নয়–দূরে, অনেক দূরে—এই শিশুটি তার। হারানো দুই কন্যাই কি আবার ফিরে এসেছে?

খোদেজার মা শাহানার দিকে অকিয়ে বলল, আফা, এই মেয়ে বড় হইলে আপনের মত সুন্দর হইব–দেখেন কি গায়ের রঙ! ওমা, আপনের দিকে প্যাটপ্যাট কইরা আবার দেখি চায়। আপনেরে হিংসা করতেছে আফা…। শাহানা দরজা খুলে বের হয়েছে। কোনদিকে না তাকিয়ে সে প্রায় ছুটে যাচ্ছে। সে চায় না কেউ তাকে এখন দেখুক। তার চোখ ভর্তি পানি। চোখ ছাপিয়ে এত পানি কেন আসছে তাও সে জানে না।

না, সে কোনদিন বড় ডাক্তার হতে পারবে না। বড় ডাক্তাররা হন আবেগশূন্য–তারা অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক যন্ত্র। শাহানা শাড়ির আচলে চোখ মুছে নিজেকে শান্ত করল। তার ইচ্ছা হচ্ছে সে কিশোরীদের মত ছুটতে ছুটতে যায়–কিন্তু তার শরীর অবসন্ন। পা চলছে না।তার পেছনে পেছনে মতি যাচ্ছে। অদ্ভুত এক ধরনের শব্দ হওয়ায় শাহানা পেছন ফিরে মতিকে দেখল। মতি শব্দ করে কাঁদছে।শাহানা বলল, কি হয়েছে আপনার?

মতি অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, কিছু হয় নাই। এত আনন্দ হইতেছে, মনে হইতেছে চিকুর দিয়া কান্দি।শাহানা হাসল। তার মনে হচ্ছিল তাকে হাসতে দেখে মতিও নিজেকে সামলে নিয়ে হাসার চেষ্টা করবে–তা হল না। মতি কাঁদছেই।বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। শাহানা বলল, আপনাকে আমার পেছনে পেছতে, আসতে হবে না।

আপনি আপনার বাড়িতে চলে যান।আপনার জন্যে একটা ছাতি নিয়া আসি।আমার জন্যে কিছু আনতে হবে না। আমি আজ বৃষ্টিতে ভিজব। অনেকদিন বৃষ্টিতে ভেজা হয় না। বাবা বৃষ্টির সময় আমাদের ছাদে যেতে দেয়া বাবার ধারণা ছাদে গেলেই–আমাদের মাথায় বজ্রপাত হবে।শ্রাবণমাসের বৃষ্টিতে বজ্রপাত হয় না।তাই না-কি? জানতাম না তো। হলেও আজ আমিনের সাধ মিটিয়ে ভিজব।

মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঘোর বর্ষণ। শাহনা খুশি খুশি গলায় বলল, খবর্দার আপনি আমার পেছনে পেছনে আসবেন না।শাহানা এবার কিশোরীদের মতোই ছুটছে। তীরের ফলার মত বৃষ্টি এসে তাকে বিঁধছে। হাওয়ায় উড়ছে শাড়ির আঁচল। সে ছুটে যাচ্ছে হাওড়ের দিকে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সে হাওড়ের পানি ছুঁয়ে দেখবে।হাওড়ের দিক থেকে শোঁ শোঁ শব্দ আসছে। বাতাস পেয়ে ফুলে ফেঁপে হাওড় হয়েছে সমুদ্রের মত। ভয়ংকর আক্রোশে সে গর্জন করছে…

ইরতাজুদ্দিন সাহেব তাঁর শোবার ঘরে ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে আছেন। তাঁর মুখ জানালার দিকে। দোতলার জানালা বলে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তিনি শাহানাকে ভিজতে ভিজতে হাওড়ের দিকে যেতে দেখলেন–আবার ফিরে আসতেও দেখলেন। তার মধ্যে কোন রকম বাহ্যিক চাঞ্চল্য দেখা গেল না।

তিনি যে ভাবে আধশোয়া হয়ে বসেছিলেন ঠিক সে ভাবেই রইলেন। ইজিচেয়ারের হাতলে পেতলের বাটিতে পেঁপে কেটে দেয়া হয়েছে। তিনি তা স্পর্শও করেননি। সকাল ৯টার মত বাজে। এই সময়ে তাঁর এক বাটি পাকা পেঁপে খাবার কথা। কবিরাজের পরামর্শমত দীর্ঘদিন ধরে খাচ্ছেন–আজ তার ব্যতিক্রম হল।

তিনি দুই নাতনীকে দেখে যে প্রবল আনন্দ পেয়েছিলেন সেই আশপ স্থায়ী হয়নি। তিনি মেয়ে দুটির সঙ্গে মিশতে পারছেন না। মেয়ে দুটিও তাঁর সঙ্গ তেমন পছন্দ করছে না। নীতু সারাক্ষণ ঘুরছে পুষ্পকে নিয়ে। প্রবল উৎসাহে তাকে লেখাপড়া শেখানো হচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে জ্ঞান বিতরণের মহৎ উদ্দেশ্যেই তার সুখানপুকুর আগমন। গল্প করার জন্যে তাকে যখনই ডাকা হয় তখনি সে বলে–একটু পরে আসব দাদাজান। এখন কাজ করছি। সেই একটু পর আর আসে না।

নীতুর যেমন পুষ্প জুটেছে শাহানার তেমন কেউ জুটেনি। ইরতাজুদ্দিন সাহেব, নিশ্চিত হয়েছেন–এই মেয়েটি একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। বেড়াতে এসেছে, কোথায় হৈ-চৈ করবে তা না, বেশির ভাগ সময়ই হাতে মোটা একটা বই। সেটা গল্পের বইও না, ডাক্তারি বই। অথচ মেয়েটা এমনভাবে বইটা পড়ে যে মনে হয় দারুণ মজার কোন গল্পের বই পড়ছে।

ইরতাজুদ্দিন সাহেব ভেবে রেখেছিলেন, মেয়ে দুটিকে তিনি নিজে গ্রাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাবেন–কিন্তু মেয়েদের তাতে কোন উৎসাহ দেখা গেল না। ছোটটি ঘর থেকেই বের হতে চায় না–বড় জন বেড়াতে চায়–কিন্তু একা একা। মেয়ে দুটি তাঁকে পছন্দ করছে না।এ সময়ের আধুনিক মেয়েদের মন পাবার কলা-কৌশল তার জানা নেই। তিনি চেষ্টা করেছেন নিজের মত।

ছাদে উঠতে চেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে ছাদে ওঠার সিড়ি বানিয়ে দিয়েছেন। কাঁঠাল গাছে চওড়া দোলনা লাগিয়ে দিয়েছেন। হাওড় দেখার জন্যে বড় একটা বজরা নৌকা আনিয়ে ঘাটে বেঁধে রেখেছেন। মেয়ে দুটি তার আন্তরিক চেষ্টার কোন মূল্য দিচ্ছে না। তারা আছে নিজেদের মত।ইরতাজুদ্দিন সাহেবের এখন মনে হচ্ছে, তিনি সামান্য ভুল করেছেন। এরা দুদিন থাকার জন্যে এসেছিল, দুদিন থেকে চলে গেলেই ভাল হত।

জোর করে আটকে রেখে তিনি এদেরও কষ্ট দিচ্ছেন, নিজেও খুব সূক্ষভাবে হলেও কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি মেয়েদের কষ্টটা বুঝতে পারছেন, কিন্তু মেয়ে দুটি তার কষ্ট বুঝতে পারছে না। দিনের পর দিন একটা বিশাল বাড়িতে একা থাকার কষ্ট মেয়ে দুটি জানে না।তার বয়স হয়েছে। মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করার মত বয়স। এই অপেক্ষা প্রিয় ও ঘনিষ্ঠজনদের চারপাশে নিয়ে করা যায়–কিন্তু একা একা নির্বান্ধব পুরীতে বসে অপেক্ষা করা যায় না।

ইরতাজুদ্দিন চামচে করে এক টুকরা পেঁপে মুখে দিলেন। খুব মিষ্টি পেঁপে। ফজলি আমের মত মিষ্টি–নীতু আর শাহানকে কি পেপে দেয়া হয়েছে? তিনি ভারি গলায় ডাকলেন–রমিজের মা।রমিজের মা ঘরে ঢুকল না। ঢুকল শাহানা। সে এর মধ্যে ভেজা শাড়ি পাল্টেছে। টাওয়েল জড়িয়ে মাথায় চুল শুকাচ্ছে। শাহানা বলল, আপনার কি কিছু চাই দাদাজান?

ইরতাজুদ্দিন বললেন, না।ঐ মহিলার একজন মেয়ে হয়েছে। খুব সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে। শেষ সময়ে সহজ ডেলিভারি হয়েছে।তোর ডাক্তারি বিদ্যা কাজে লেগেছে? হুঁ লেগেছে। আপনার কি শরীর খারাপ? না।শাহানা খাটের এক মাথায় বসতে বসতে বলল, আপনার নিষেধ অমান্য করে আমি গিয়েছি, সে জন্যে কি আপনি আমার উপর রাগ করেছেন? না।

আমার উপর রাগ করার আপনার নিশ্চয়ই নিজস্ব কিছু কারণ আছে যদিও আমি তা ধরতে পারছি না। আপনি দয়া করে আমার উপর রাগ করবেন না।রাগ করছি না।যাই দাদাজান? আচ্ছা যা।যাই বলার পরেও শাহানা খাটের পাশে বসে রইল। সে একটা বিশেষ কথা বলার জন্যে আসছে, কথাটা এতই মুহূর্তে বলবে, পরে বলবে বুঝতে পারছে না। বিশেষ কোন কথা বলার জন্যে বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত লাগে। কোন কোন মানুষ সেই মুহূর্তগুলি ধরতে পারে। অনেকেই পারে না। যেমন সে পারে না।দাদাজান।হুঁ।আপনার এই সুন্দর বাড়িটার কোন নাম নেই কেন?

আপনার বাড়ি বলছিস কেন? বাড়িটা তোদেরও না? এটা আমাদের সবার বাড়ি।বাড়িটার সুন্দর একটা নাম থাকলে ভাল হত।ইরতাজুদ্দিন উৎসাহের সঙ্গে বললেন, দে একটা নাম দে। সুন্দর নাম দে। ময়মনসিংহ থেকে সাইনবোর্ড বানিয়ে এনে তোরা থাকতে থাকতে লাগিয়ে দেব।শাহানা আরেকটু ঝুঁকে এসে বলল–এই বাড়িটাকে একটা হাসপাতাল বানিয়ে ফেললে কেমন হয় দাদাজান?

ইরতাজুদ্দিন তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন। শাহনা উৎসাহের সঙ্গে বলল, বাড়িতে পা দেয়ার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে–এখানে খুব সুন্দর একটা হাসপাতাল হয়।আমাদের পঁচপুরুষের ভিটাকে তুই হাসপাতাল বানাতে চাস? এইসব বুদ্ধি কে মাথায় ঢুকিয়েছে? তোর বাবা? বাবা কিছু বলেননি–যা বলার আমি নিজ থেকে বলছি।ইরতাজুদ্দিন আহত গলায় বললেন–পূর্বপুরুষের কত স্মৃতি জড়ানো ভিটা, তার কোন মূল্য নেই তোর কাছে?

তাঁর মাথার শিরা দপদপ করছে। তিনি বুকের উপর চাপ ব্যথাও অনুভব করছেন। সূক্ষ এক আতংকও অনুভব করছেন। তার দিন শেষ হয়ে এসেছে তিনি আর অল্প কিছু দিন বাঁচবেন, তারপর এরা তার এই অসম্ভব সুন্দর বাড়িটা নিয়ে ছিনিমিনি খেলবে। মৃত্যুর আগে বাড়িটা আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিলে কেমন হয়? শাহানা লক্ষ্য করল, তার দাদাজান হাসছেন। আন্তরিকভাবেই হাসছেন। সে বলল, হাসছেন কেন দাদাজান?

ইরতাজুদ্দিন বললেন, এম্নি হাসছি।তিনি পেঁপের বাটি হাতে নিতে নিতে বললেন, রমিজের মাকে বল তোদের পেঁপে কেটে দিতে। খুব মিষ্টি পেঁপে। আমি নিজে এত মিষ্টি পেঁপে কখনো খাইনি।ইরতাজুদ্দিন চামচ দিয়ে পেঁপের গায়ে লেগে থাকা কালো বিচি আলাদা করছেন। বিচিগুলি পুঁতে দিলে হয়। পেঁপে গাছ ফলবতী হতে বেশি সময় লাগে না–কে জানে তিনি হয়ত এই পেঁপে খেয়ে যেতে পারেন।

পুষ্পকে নতুন শাড়ি কিনে দেয়া হয়েছে। সবুজ রঙের শাড়ি। কালো শরীরে সবুজ শাড়ি এত সুন্দর মানিয়েছে! নীতুর একটু মন খারাপ লাগছে–কেন তার গায়ের রং এত ফর্সা হল! গায়ের রঙ পুষ্পের মত কুচকুচে কালো হলে সেও অবশ্যি একটা সবুজ শাড়ি কিনত। পুষ্প আজ তার বিছানা-বালিশ নিয়ে এসেছে। এখন থেকে রাতেও এই বাড়িতে থাকবে। বিছানা-বালিশ বলতে একটা মাদুর আর একটা বালিশ। বালিশটা খুব বাহারী–ফুল লতা পাতা আঁকা। সরু সূতায় পুষ্পের নাম লেখা।

নীতু এখন শাহানার সঙ্গে ঘুমুচ্ছে না। তার জন্য আলাদা ঘর। সে এবং পুষ্প এই ঘরে শোয়। ঘরটা নীতুর খুব পছন্দ হয়েছে। এই ঘর থেকে হাওড় দেখা যায়। তবে এই ঘরের সমস্যা একটাই ভোরবেলা জানালা দিয়ে সূর্যের আলো একেবারে মুখের উপর এসে পড়ে। ঘুম ভেঙে যায়। ছুটিছাটার দিনে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমুতে ইচ্ছা করে। এই ঘরে থাকলে সে উপায় নেই।

সন্ধ্যা সাতটা। ইরতাজুদ্দিন কিছুক্ষণ আগে নীতুকে খামবন্ধ চিঠি দিয়েছেন। নীতুর বাবার চিঠি। তিনি হাতে হাতেই নীতুর চিঠির উত্তর পাঠিয়েছেন। সেই চিঠি পড়ে নীতুর মন খারাপ হল। কারণ চিঠি পড়ে পরিষ্কার বোঝা যায়, নীতুর বাবা নীতুর। চিঠি না পড়েই জবাব দিয়েছেন। অতি বোকা মেয়েও সেটা বুঝবে। নীতু বোকা মেয়ে না। তিনি লিখেছেন

মা নীতু,

তোমার চিঠি পড়ে খুব ভাল লাগল। দাদার বাড়িতে তোমরা খুব আনন্দ করছ জেনে খুশি হয়েছি। (এই লাইন পড়েই নীতু বঝেছে বাবা চিঠি না পড়েই জবাব দিচ্ছেন। কারণ নীতু তার চিঠিতে কোথাও লেখেনি তারা খুব আনন্দ করছে।ন তারিখে তোমার মা সিঙ্গাপুর যেতে চাচ্ছে—সে শাহানার বিয়ের কিছু কেনাকাটা করবে। মনে হচ্ছে আমাকেও সঙ্গে যেতে হতে পারে। কাজেই ইচ্ছা করলে তোমরা দাদার বাড়িতে কয়েকদিন বেশি কাটিয়ে আসতে পার।

(নীতু পরিষ্কার বুঝছে চিঠির এই প্যারাটি আপার জন্যে লেখা। বাবা জানেন আপা এই চিঠি পড়বে। পড়ে জানবে যৈতার বিয়ের কেনাকাটার জন্যে তাঁরা সিংগাপুর যাচ্ছেন। এই কথাগুলি আপাকে আলাদা করে চিঠি লিখে জানালেও হত। তা তিনি জানাবেন না।) পানির দেশে গিয়েছ–সাবধানে থাকবে। হুটহাট করে পানিতে নামার দরকার নেই। তোমার মা ঠিক করেছে এবার ঢাকায় এলেই তোমাকে সাঁতার শেখানো হবে। তোমরা ভাল থেকো। তোমার জন্যে গল্পের বই পাঠালাম। ইতি তোমার বাবা…

চিঠিতে কোথাও নীতুর বান্ধবীর জন্মদিনের কথার উল্লেখ নেই। চিঠি পড়লে তবে তো উল্লেখ থাকবে। তবে নীতু জানে, তার বান্ধবী যথাসময়ে টেলিফোন পাবে। বাবা তার চিঠিটা তার সেক্রেটারীকে দেবেন। সেক্রেটারী চাচা সেই চিঠি ফাইলবন্দী করবেন–চিঠিতে জরুরি কোন ব্যাপার থাকলে সেই মত ব্যবস্থা করবেন।

নীতু বাবার চিঠি হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে বসে আছে। বইয়ের প্যাকেট খুলে দেখতে ইচ্ছা করছে না। রাগ লাগছে। সে চিঠি নিয়ে উঠে গেল–আপাকে পড়তে দিতে হবে। তার নিজের চিঠি–অন্যকে পড়তে দিতেও ভাল লাগে না। চিঠি তো আর গল্পের বই না যে সবাই মিলেমিশে পড়বে।শাহানা তার ঘরে বাতি নিভিয়ে শুয়েছিল। মাত্র সাতটা বাজে। এই সময় কেউ বিছানায় শুয়ে থাকে? নীতু দরজার বাইরে থেকেই ডাকল–আপা আসব?

শাহানা বলল, আয়।ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছি কেন? এম্নি শুয়ে আছি।মাথাব্যথা নেই তো? না।মন খারাপ? হুঁ। মন একটু খারাপ।কেন? শাহানা বিছানায় উঠে বসতে বসতে বলল, জানি না কেন। যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা তোকে জানাতেম।বাবা আমাকে চিঠি লিখেছেন–পড়বে? উহুঁ।চিঠিতে তোমার একটা খবর আছে।কি খবর?

নীতু এসে খাটে পা দুলিয়ে বসল। পা নাচাতে নাচাতে বলল, তোমার তো খুব বুদ্ধি, দেখি আন্দাজ কর তো কি খবর।ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পারলে আমাকে কি দিবি? যা চাইবে তাই দেব।শাহানা তরল গলায় বলল, আমার বিয়ে সংক্রান্ত কোন খবর আছে। হয়ত ডেট ফাইন্যাল হয়েছে কিংবা মা বিয়ের কেনাকাটার জন্যে কোলকাতা বা ব্যাংকক যাচ্ছেন। ঠিক হয়েছে?

হুঁ।নীতু ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল। আপার বুদ্ধি দেখে মাঝে মাঝে তার এত বিস্ময়বোধ হয়! সব মানুষের বুদ্ধি যদি আপর মত হত তাহলে পৃথিবীতে বাস করাই কঠিন হত। ভাগ্যিস সবার বুদ্ধি আপার মত না।আপা।উঁ।পুষ্প মেয়েটাকে তোমার কাছে কেমন লাগছে? ভাল তো। সারাক্ষণ তোর পেছনে ঘুর ঘুর করছে। মেরী হ্যাড এ লিটল ল্যাম্বের মত অবস্থা।খুব মিথ্যা কথা বলে আপা–বানিয়ে বানিয়ে সারাক্ষণ মিথ্যা গল্প।

গল্প তো বানিয়ে বানিয়েই বলতে হবে–টলস্টয়, দস্তয়েভস্কি এঁরা তো বানিয়ে বানিয়েই গল্প লেখেন।আচ্ছা আপা, তুমি কি খুব বড় ডাক্তার? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? সারা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে তুমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডাক্তার।কে ছড়াল? পুষ্প? খোদেজার মা নামের একজন ধাই আছে–সে ছড়াচ্ছে আর পুষ্প ছড়াচ্ছে–কথা ছড়ানোয় এই মেয়ে ওস্তাদ। কোথাও কিছু শুনলেই দশ জায়গায় ছড়াবে।এই গ্রামে কোথায় কি হচ্ছে তুই তাহলে সব জানিস?

হুঁ জানি। মতি মিয়া নামে যে গায়ক আছে সে নাকি যেখানে যত কঠিন রোগ আছে তাদের সবাইকে শুক্রবার তাঁর বাসায় যেতে বলেছে।রোগিদের নিয়ে মিছিল করবে? উহুঁ–শুক্রবারে তিনি তোমাকে দাওয়াত করে নিয়ে যাবেন। তুমি বিনাপয়সায় সব রোগি দেখে দেবে। পুষ্পের এক বড় বোন আছে, যার নাম–কুসুম। সেও তোমাকে দেখাবে।কুসুমের কি অসুখ?

কি অসুখ পুষ্প জানে না। পুষ্পের ধারণা, কুসুমের কোন অসুখ নেই–তোমাকে দেখতে চায় এই জন্যে অসুখের ভান করছে। সে নাকি খুব ভান করতে পারে। কুসুমের সঙ্গে জ্বীন থাকে। তোমাকে আেগেই বলেছি।বললেও ভুলে গেছি। কুসুমের সঙ্গে তাহলে দ্বীন থাকে! তার চুল খুব লম্বা, একেবারে পায়ের পাতা পর্যন্ত। লম্বা চুলের মেয়েদের খুব জ্বীনে ধরে। এই জন্যে সে ঠিক করে ফেলেছে চুল কেটে তোমার মত ছোট করে ফেলবে।আমাকে তো সে দেখেনি–বুঝল কি করে আমার চুল ছোট?

তোমাকে দেখেছে। তুমি একবার সাপের আড্ডাখানায় উপস্থিত হয়েছিলে, তখন দেখেছে।শাহানা আবার বিছানায় শুয়ে পড়ল। ক্লান্ত গলায় বলল–একটু আগে তোর সঙ্গে আমার একটা বাজি হল না? বাজির শর্ত ছিল–আমি বাজিতে জিতলে যা চাইব তাই তুই আমাকে দিবি।হুঁ। আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে দেব। কি চাও তুমি?

আমি চাচ্ছি–তুই এখন চলে যা। কথা বলতে আর ভাল লাগছে না।নীতু আহত গলায় বলল, তুমি এম্নি বললেও তো আমি চলে যেতাম–শুধু শুধু, বাজির কথা তুললে কেন? আমার কথা শুনে তুমি বিরক্ত হচ্ছ এটা প্রথমে বললেই হত।চট করে উঠে দাঁড়াল। তার কান্না পেয়ে গেছে। কেঁদে ফেলার আগেই তাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হবে। সে ছুটে ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে দরজার চৌকাঠে বাড়ি খেয়ে মাথা ফুলিয়ে ফেলল।

নীতুর খুব একা একা লাগছে। মনে হচ্ছে সারা বাড়িতে সে একা। পুষ্প থাকলে এতটা একা লাগত না। পুষ্প গেছে তার মার কাছে। নতুন শাড়ি সে তার মাকে দেখাতে গেছে। রাতে মনে হয় আর ফিরবে না। দাদাজান বাংলোঘরে। প্রতি রাতেই তিনি একা একা দীর্ঘ সময় বাংলোঘরে বাতি জ্বালিয়ে বসে থাকেন। এই সময় কেউ আশেপাশে গেলেই তিনি বিরক্ত হন। সবাইকে মনে হয় চিনতেও পারেন না। গত রাত্রে নীতুর কিছু করার ছিল না–বাংলোঘরের দিকে গেছে। জানালা দিয়ে বুকে, দেখতে পেয়ে দাদাজান ভুরু কুঁচকে বললেন, কে?

নীতু বলল, আমি।দাদাজান ভুরু কুঁচকে তাকিয়েই রইলেন। মনে হল চিনতে পারছেন না। নীতু প্রায় পালিয়ে চলে এল।আচ্ছা এখন সে কি করবে? আপার কাছে যাওয়া যাবে না। দাজানের কাছে যাওয়া যাবে না, সে করবে কি? গল্পের বই পড়বে? গল্পের বই পড়তে তার কখনই খারাপ লাগে না–কিন্তু এখন পড়তে ইচ্ছা করছে না। এই বাড়িতে রাতে গল্পের বই পড়ার অনেক অসুবিধা। আলো কম। কিছুক্ষণ বই পড়লেই তার মাথা ধরে যায়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *