সাতকাহন পর্ব-(৪)-সমরেশ মজুমদার

সাতকাহন

‘তুই ধান ভানতে শিবের গীত গাইছিস কেন ? ‘মানে ? ‘তারপর কি হয়েছিল? 

‘মা পাঠাল না। আমার বিয়েও হল না। এক বছর পরে যখন বাবা-মা সবাই কাজে গিয়েছে, ওই যে তেঁতুলতলার রাস্তাটা তৈরি হচ্ছিল, তখন অর্জুনবাবু লােক পাঠান আমাদের ঘরে। সেই লােক জিজ্ঞাসা করল আমি ওর ওখানে কাজ করতে যেতে চাই কি না। আমি মা বললাম। ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে নেখালির মানুষদের কাজে নেওয়া বন্ধ করে দিল অৰ্জনবাবু। সবাই আমার ওপর খেপে গেল।

গ্রামসুদ্ধ নােক বাবাকে গিয়ে বলল, তােমার মেয়েকে কাজে পাঠাও নাহলে আমরা না খেয়ে মরব। এইসময় বংশীদাদা এসে বাবাকে বলল এই কাজটার কথা। মা বলল, চলে যা নইলে তােক বাঁচাতে পারব না। আমি চলে এলাম। তাই গ্রামের লােক খেপে গেল। বেশ কিছুদিন আমি এখানে চাকরি করতাম আর বংশীদার বাড়িতে থাকতাম। তারপর আগের সাহেব আসার পর মুখ নামাল তিরি। | ‘অঞ্জন জানে যে তুই এখানে কাজ করিস।

‘সব জানে। কোন খবর ওর কাছে যায় না বল! “ঠিক আছে, তুই যা। আমাকে খাবার দে। 

চোখের ওপর হাত রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে রইল দীপাবলী । এরকম চরিত্রের কথা কিছু গল্প-উপন্যাসে পড়েছে সে। লােকটার স্বভাবে একটা ডােন্ট-কেয়ার ভাব আছে, কিন্তু প্রথম দিনের আলাপে কখনও অসম্মান করেনি তাকে। এই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার উন্নয়ন, শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশকে কাজে লাগানাে ইত্যাদি কিছু দায়িত্ব চাকরির সূত্রে তার ওপর অর্পিত। এ গ্রামে থানা নেই।

সাতকাহন পর্ব-(৪)

থানাব দারােগার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের মানুষ। বছর দুয়েকের মধ্যে অবসর নেবেন। কিন্তু লােকটিকে মনে হয়েছে মেরুদণ্ডহীন এবং পাশ কাটানাে । এস ডি ও কিংবা ডি এমের সঙ্গে যার সখ্যতা তাঁকে তাে দারােগা দেবতাজ্ঞানে পুজো করবেন।

অর্জুন নায়েক যদি মেয়েদের নিয়ে সুখী হতে চান তাহলে সে কিছুই করতে পারে না যতক্ষণ না ওইসব মেয়ে বা তাদের পরিবার তার কাছে নালিশ করছে। কিন্তু এস ডি ও শেষপর্যন্ত এলেন না। সতীশবাবুর ধারণাই সত্যি হল । ভদ্রলােক খবর পাঠালেন অর্জুন নায়েকের মাধ্যমে যেটা দীপাবলী মােটেই পছন্দ করছে না। এখন মনে হচ্ছে উনি বাহানা দিয়েছেন, আসার অভিপ্রায় তার মােটেই ছিল না। এক্ষেত্রে নেখালির মানুষজনের জন্যে আপাতত কিছুই করা যাচ্ছে না। 

এমন সময় বাইরে সাইকেলের ঘণ্টা বাজল। বন্ধ অফিসঘরে দরজায় শব্দ হল। দীপাবলী গলা তুলল, “তিরি, দ্যাখ তাে কে এসেছে ? 

‘যাচ্ছি।’ তিরি রান্নাঘর থেকে সাড়া দিল । গরম বাড়ছে। যেই আসুক দায়ে না পড়লে এই রােদে বেব হবে না। ঈশ্বর নামক শক্তিমানের খামখেয়লিপনার শেষ নেই। আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত ক্রমাগত বৃষ্টি আর তিস্তা-করলার বুক ছাপানাে জলের ঢালে জলপাইগুড়ির মানুষ বিব্রত হয় যেখানে-সেখানে এই মাইলের পর মাইল জমি জলের অভাবে বন্ধ্যা হয়ে থাকে।

যে কলকাতা শহরে বৃষ্টির দরকার নেই সেখানে একদিন জল পড়লেই লােকে হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে হাঁটতে বাধ্য হয়। সমস্ত শরীর চিড়বিড় করছে গরমে। শাড়ি খুলে শুতে পারলে ভাল হত। খাওয়াদাওয়ার পর ঘণ্টা তিনেক সেই সুযােগ মেলে। তখন শাওয়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয় সে। সংস্কার এমন জিনিস যা কাজের লােকের সামনেও নিজেকে সহজ হতে দিতে পারে না। 

সাতকাহন পর্ব-(৪)

তিরি ঘরে এল একটা পিওন বুক হতে, তার মধ্যে সরকারি বিধি । উঠে বসে চিঠিটা নিল সে। তিরি কলম এনে দিতে সই করতেই ওটা ফেরত নিয়ে গেল। খামের মুখ ছিড়ল দীপাবলী। ডি এমের সরকারি নির্দেশ। আগামীকাল সকাল দশটায় সমস্ত সাব ডিভিশন এবং ব্লকের অফিসারদের সার্কিট হাউসে উপস্থিত থাকতে হবে। মাননীয় কৃষিমন্ত্রী আলােচনা করতে চান। 

দীপাবলীর মনে হল এটা একটা বড় সুযােগ। তার পক্ষে মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা বা কাজের ব্যাপারে অভিযোেগ জানানাে ঘােড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার শামিল। উপরওয়ালা, তস্য উপরওয়ালার অনুমতি চাই। এরকম একটা আলােচনাসভায় মন্ত্রী যদি কিছু জানতে চান তাহলে সরাসরি বলে ফেললে কেউ কিছু মনে করতে পারবেন না। সতীশবাবুকে বলতে হবে সমস্ত পয়েন্ট সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে রিপাের্ট তৈরি করতে। | সতীশবাবুর ওপর দায়িত্ব দিয়ে সকাল সাতটার বাস ধরল দীপাবলী। একটাই বাস দিনে দুবার যায় এবং ফেরে। সকালের বাসে ভিড় ছাদেও ধিক থিক করে।

তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কণ্ডাক্টর ব্যস্ত হয়ে ভিড় হঠিয়ে জায়গা করে দিল বসার। দীপবলী জানত না এখানে আসার এত অল্প দিনের মধ্যেই তাকে এত লােক চিনে গিয়েছে। বাসে বসে আর একটা অভিজ্ঞতা হল ! চেঁচামেচি বকরবকর যা হবার তা হচ্ছে পেছন দিকে। তার সামনে যেসব দেহাতি এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি বসে তারা রয়েছে বেশ গম্ভীর মুখে।

সাতকাহন পর্ব-(৪)

যেন কথা বলে তারা তাকে সম্মান দেখাচ্ছে। এর মধ্যেই বাসের জানলা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গরম হাওয়ার জন্যে। চুপচাপ বসে এল দীপাবলী । নামার আগে কণ্ডাক্টরকে ডাকল সে, 

এই যে ভাই, টিকিটের দাম নাও।’ 

লােকটার বয়স বেশী নয়, এক হাত জিভ বের করে মাথা নাড়ল । ‘কেন?’ দীপাবলী বেশ বিরক্ত হল। 

না মেমসাহেব, পারব না, আমার চাকরি চলে যাবে। ‘তাহলে তাে তােমাদের বাসে আমি উঠতেই পারব না। ‘একি কথা বলছেন ! আপনি হলেন গিয়ে আমাদের, না, না। প্রায় পালিয়েই গেল সে ।

দীপাবলী বুঝল কোন লাভ হবে না। সে মুখে যতই বলুক ভাড়া না নিলে বাসে উঠবে 

কিন্তু ভাল করেই জানে বাসে না উঠে কোন উপায় নেই। স্ট্যান্ড থেকে রিকশা নিল সে। দশটা বাজতে পনের মিনিট বাকি। এতবার লােক ওঠা নামা করছে যে দেড় ঘন্টার পথ প্রায় পৌনে তিন ঘণ্টা লাগিয়ে দিল বাস। সে অবশ্য এস ডি ও-র অফিসে যেতে পারত। মিনিট চল্লিশেকের মধ্যেই পৌছানাে যেত সেখানে। এস ডি ওর জিপে চড়ে সােজা শহরে। কিন্তু গতকালের ঘটনার পর ব্যাপারটা ভাবতেই ভাল লাগেনি। 

সাতকাহন পর্ব-(৪)

সার্কিট হাউসের সামনে পৌছে মােটামুটি ভিড় দেখতে পেল। আদেশ মান্য করে সবাই জমায়েত হয়ে মন্ত্রীর অপেক্ষা করছেন। ডি এম নেই। জানা গেল তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে আসবেন। অরবিন্দ সেন এগিয়ে এলেন, নমস্কার মিসেস ব্যানার্জী, কেমন আছেন ? দীপাবলী একটু আড়ষ্ট হল। সরকারি চাকরিতে যােগ দিতে হলে নিজের ঠিকুজি জানিয়ে দিতে হয় ! ইচ্ছা না থাকলেও দীপাকে নিয়ম মানতে হয়েছে। পরলােকগত অতুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রীর পরিচয় তাকে বহন করতেই হয় এই কারণে বাধ্য হয়ে। সে মাথা নাড়ল, ‘ভাল। আপনি ? 

‘আর বলবেন না। খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমােত পারছি না। যা গরম ? ‘আপনাদের ওদিকে প্রব্লেম কেমন ? ‘নাথিং। কিছু নেই। আপনার হাতে ওটা কি ? ‘এই কিছু কাগজপত্র। মন্ত্রীমশাই যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে বলতে হবে তাে ? ‘তাহলে আপনি খুব সিরিয়াসলি কাজকর্ম করছেন বলুন! 

দীপাবলী হাসল। যেন কাজকর্ম করা একটা অন্যায় ব্যাপার এমনই মনে হল ওর এঁর কথা শুনে। সে দেখল তার এস ডি ও আর এক ভদ্রলােকের সঙ্গে কথা বলছেন দূরে দাঁড়িয়ে। যাঁর সঙ্গে উনি কথা বলছেন তাঁর নজর এদিকেই। দীপাবলীকে দুচোখে গিলছেন তিনি। হঠাৎ এস ডি ও এদিকে তাকালেন। তারপর ওরা এগিয়ে এলেন। 

‘সরি মিসেস ব্যানার্জি, কাল শরীর এমন খারাপ হয়ে পড়ল যে যেতে পারিনি কিন্তু আমি আপনাকে খবর পাঠিয়েছিলাম। এস ডি ও বললেন। 

হ্যাঁ।আপনি এখন কেমন আছেন ? ‘ভাল না। মন্ত্রী না এলে আজ বের হতাম না।’ বলেই যেন মনে পড়ল, ‘তা আপনি আমার ওখানেই তাে আসতে পারতেন, আমি আসছিলামই! 

 

Read more

সাতকাহন পর্ব-(৫)-সমরেশ মজুমদার

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *