মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

ডাউনসেট হলাে আপসেটের উল্টোটাবারান্দায় বসে না থেকে চোখে মুখে পানি দিয়ে শুয়ে পড়। ……আমি বাবার ডান হাতটা ধরে নিজের কোলে রাখলামতিনি মনে হলাে একটু লজ্জা পেয়ে গেলেনআমার কাছ থেকে ধরনের ব্যবহার পেয়ে তিনি অভ্যস্ত নাআমি আবারাে বললাম, বাবা যাও ঘুমুতে যাও।বাবা ক্লান্ত গলায় বললেন, বসি আরাে কিছুক্ষণঘুমের প্রথম স্পেলটা কেটে গেলে সমস্যা আছেএখন বিছানায় গেলে কাজের কাজ কিছু হবে নাতুই শুয়ে পড়। 

আমার ঘুমুতে দেরি আছেপ্রজেক্ট শেষ করতে হবেকাল জমা দেবার শেষ দিন। ……রাত তিনটায় ঘুমুতে গিয়ে সকাল নটায় ক্লাস ধরতে অসুবিধা হয় না? . না হয় নাঅভ্যাস হয়ে গেছেকফি খাবে বাবা ? মধ্যরাতের কফির অন্য এক মজা আছে। 

এমিতেই ঘুম হচ্ছে না— এর ওপর কফি ? বিষে বিষক্ষয় হয়তাে দেখবে কফি খেয়ে তােমার ঘুম পেয়ে যাবেআমাদের নতুন একজন টিচার এসেছেন কাওসার নামউনি সারাদিনে একটা সিগারেট খানকখন খান জানাে ? ঠিক ঘুমুতে যাবার আগে

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৭)

সিগারেট হচ্ছে তার ঘুমের ট্যাবলেটসিগারেট অর্ধেক শেষ হবার আগেই ঘুমে তার চোখ জড়িয়ে যায়এমনও হয়েছে জ্বলন্ত সিগারেট তাঁর মুখে, তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেনসিগারেটের ছ্যাকা খেয়ে তার ঘুম ভেঙেছে। 

তােদের টিচাররা কি ক্লাসে এইসব গল্প করে ?……………..হ্যা করেআমাদের ক্লাসগুলাে অন্যরকমCreativity class. এখানে কোনাে নিয়ম নেইনিয়ম না থাকাটাই আমাদের নিয়ম। …………..ভালােযা কফি নিয়ে আয়। 

আমি উঠে দাঁড়ালামরান্নাঘরে যাবার আগে এক তলায় ভাইয়ার ঘরে উঁকি দিলামভাইয়া গভীর ঘুমেতার ঘরের দরজা খোেলাসে কখনাে দরজা বন্ধ করে ঘুমুবে নাদরজা জানালা বন্ধ করলেই তার কাছে নাকি মনে হয় ঘরের বন্ধ দরজা জানালা আর খােলা যাবে নাকোনাে কারণে আটকে যাবেএই মনে করে তার দম বন্ধ হয়ে আসে এবং এক সময় নিঃশ্বাসের কষ্ট শুরু হয়। 

ভাইয়া জেগে থাকলে ভালাে হতােতাকে তার বন্ধুর কথা জিজ্ঞেস করতামনতুন কোনাে এসাইনমেন্ট সে হাতে নিয়েছে কিনাকত টাকার এসাইনমেন্টছেলেটার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলে মন্দ হতাে নাআমি মনে মনে ঠিক করে ফেললাম আবার কোনােদিন রাতে সে যদি ছাদে ঘুমুতে আসে তাহলে তাকে কয়েক লাইন কবিতা নিয়ে বলবএর মানে কী বলুন। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৭)

পুলিশ আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে বলুন দেখি এই দুটা লাইনের কী অর্থ— “অলস মাছির শব্দে ভরে থাকে সকালের বিষন্ন সময় পৃথিবীরে মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়” 

মগ ভর্তি কফি নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দেখি বিছানায় এলােমেলাে হয়ে মা ঘুমুচ্ছেনতাকে দেখে মনে হচ্ছে চিন্তা ভাবনাহীন কিশােরী এক মেয়ে বড় বােনের সঙ্গে ঘুমুতে এসেছেতার আশা ছিল সে বােনের সঙ্গে স্কুলের কিছু মজার মজার কথা বলবেআশা পূর্ণ হয় নিবােন কাজ করছেছােট কিশােরী বিছানায় শুয়ে 

শুয়ে অপেক্ষা করছে কখন বড় বােনের কাজ শেষ হবেকখন বড় বােন বাতি নিভিয়ে বিছানায় আসবে। অপেক্ষা করতে করতে বেচারি ঘুমিয়ে পড়েছে। 

কোলাজের কাজ শেষ হলাে রাত সাড়ে তিনটায়। …………….চোখে মুখে পানি দিয়ে বাতি নিভিয়ে আমি মার পাশে জায়গা করে শুয়ে পড়লামমা সহজ গলায় বললেন ঝড়ের ক্যাসেটটা দিয়ে দেঝড় বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমাই। 

আমি বললাম, তুমি এতক্ষণ জেগেছিলে ? হুঁ, ছিলামএতক্ষণ কি ঘুমের অভিনয় করছিলে ? …..হু, করছিলামঅভিনয়টা ভালাে হয়েছে না? বড় খালার পাটটা করলে মনে হয় ভালােই পারব, কী বলিস

নাটকের অভিনয়ের কথা বাদ দাওনাটক ছাড়া রকম অভিনয় কি তুমি প্রায়ই করাে ? ……, করিতাের বাবা কিছু বুঝতে পারে নাআশ্চর্যতাে! ………..আশ্চর্য হবার কী আছে! মেয়ে হয়ে কেউ জন্মাবে আর অভিনয় করবে না, এটা হতেই পারে না। 

আমি কোনাে অভিনয় করি না মাতুই তাহলে মহা বিপদে পড়বি। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৭)

বিপদে পড়লে পড়বআচ্ছা মা দেখি তােমার কেমন বুদ্ধিআমি কবিতার দুটা লাইন বলবতুমি এর কী অর্থ বলবে| মা বিরক্ত গলায় বললেন, ঘুমাতাে! বুড়াে বয়সে বাংলার পরীক্ষা দিতে পারব না। ………………….আহা চেষ্টা করে দেখই না! কবিতার লাইন দুটা হলাে— 

অলস মাছির শব্দে ভরে থাকে সকালের বিষন্ন সময় পৃথিবীরে মায়াবী নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়মা হাই তুলতে তুলতে বললেন, জীবনানন্দ দাশের কবিতা না? অবসরের গানএই কবিতার সবচে সুন্দর লাইনটা কী জানিস ? সবচেসুন্দর লাইন এখানে পালঙ্কে শুয়ে কাটিবে অনেক দিন জেগে থেকে ঘুমাবার সাধ ভালােবেসে

মা চোখ বন্ধ করে পাশ ফিরলেনআমি অবাক হয়ে মার দিকে তাকিয়েথাকলাম। …………মা ঘুমুচ্ছ ? হা ঘুমুচ্ছিতুমি আমাকে খুবই অবাক করেছমাঝে মাঝে অবাক হওয়া খারাপ না। 

তুমি চোখ বন্ধ করে আছাে কেন ? এসাে গল্প করিরাত তত বেশি বাকি নাইএসাে গল্প করে রাতটা পার করে দেই। ………………কী নিয়ে গল্প করবি

তােমার যা ইচ্ছাবড় খালার যে রােলটা করতে চাচ্ছ সেটা নিয়েও কথা বলতে পারিরােলটা কেমন ? ……….একটা মাত্র ডায়ালগআমি বসে উলের মােজা বানাচ্ছি, তখন নায়িকা এসে বলবেখালা কার জন্যে মােজা বানাচ্ছ ? তার উত্তরে আমি বলবজানি নাতখন নায়িকা বলবে তুমি মােজা বানাচ্ছ অথচ বলছ কার জন্যে মােজা বানাচ্ছি জানাে না এটা কেমন কথা? তার উত্তরে আমি রহস্যময় হাসি হাসব। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৭)

রহস্যময় হাসি প্রাকটিস করেছ ? …………আমি দেখিয়ে দেব কোনাে সমস্যা নেই। ……….মা চিন্তিত গলায় বললেন, রহস্যময় হাসি আমি নিজেও পারব। আসল সমস্যা অন্য খানে উলের মােজা তাে বানাতে পারি নাজীবনে কোনােদিন উলের কাটাই হাতে নেই নি। 

মােজা বানানাে শিখে নাওবয়স্ক মহিলারা সবাই উলের মােজা বানাতে পারেওদের কাছে গেলেই পারাে। ………….অভিনয় করছি এটা শুনে তাের বাবা আবার রাগ করবে না তাে ? ………….তােমার শখ হয়েছে তুমি অভিনয় করছ। বাবার তাে এখানে রাগ করার কিছু নেইবাবা যখন তার শখ মেটানাের জন্যে কিছু করে তখন তাে তুমি রাগ করাে না। 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *