আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে তােমার সমস্যার কথা বলআমার বদঅভ্যাসহচ্ছে, আমি চশমার ফাক দিয়ে তাকাইআশা করি এতে কোন সমস্যা হবে নাকারণ আমার চোখ খুব সুন্দরঠিক বলি নি ?” 

জি ঠিক বলেছেন। 

আয়নাঘর

লিলিয়ান খুব গুছিয়ে তার সমস্যার কথা বললডঃ ভারমান কোন প্রশ্ন করলেন নাচুপচাপ শুনে গেলেনএক ফঁাকে উঠে গিয়ে আবার কফির পেয়ালা ভর্তি করে আনলেনলিলিয়ান কথা শেষ করবার পর ডঃ ভারমান মুখ খুললেনতিনি নরম গলায় বললেন, তােমার পরিবারে লােক সংখ্যাকত

অনেকআমাদের যৌথ পরিবারআমার দুচাচা এবং বাবা ... এরা তিন ভাই একসঙ্গে থাকেন। 

একত্রে রান্না হয়

হ্যা, এক সঙ্গে রান্না হয়তবে আমাদের পজার চাচা কিছুদিন পরপর রাগ করে বলেন এখন থেকে তিনি আলাদা রান্নাবান্না করবেনকারাে সঙ্গে তার কোন যােগাযােগ নেইদু একদিন আলাদা রান্না হয় তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে আসেন

আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

তােমাদের চাচাদের মধ্যে কি খুব মিল ?মােটেও মিল নেইসারাক্ষণ তারা ঝগড়া করছেন, কিন্তু তারপরেও একজন অন্যজনদের ছাড়া থাকতে পারেন না। আমার মনে হয় ঝগড়া করার জন্যেই তাঁদের একসঙ্গে থাকা প্রয়ােজনব্যাপারটা বেশ মজার। 

‘তুমিই প্রথম বাইরে পড়তে এসেছ ?” 

তুমি যখন বিদেশে রওনা হলে তখন তােমার পরিবারের সদস্যরা কি করল। 

সবাই খুব কাদলআমার পজার চাচা পুরাে একদিন এক রাত না খেয়ে দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে বসে ছিলেনঅনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে তাকে খাওয়ান হয়। 

ডাঃ ভারমান পাইপ ধরাতে ধরাতে বললেন, তােমার সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে তােমার পরিবারতুমি এমন এক ক্লোজ পরিবার থেকে এসেছ যে পরিবারের সদস্যরা ভালবাসার কঠিন জালে তােমাকে আটকে রেখেছেতুমি জাল ছিড়তে চাচ্ছ পারছ না” 

আপনি ভুল বললেন আমি জাল ছিড়তে চাচ্ছি না| তুমি চাচ্ছি কিন্তু তােমার মন তাতে সায় দিচ্ছে নাতােমার মনে একই সঙ্গে দুটি বিপরীত ধারা কাজ করছেএকটি ধারা তােমাকে জাল কেটে বেরিয়ে আসতে বলছে, অন্যটি তা করতে দিচ্ছে নাএতে মনে প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। 

আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

এর সঙ্গে আমার দুঃস্বপ্নের সম্পর্ক কি? আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি অন্য একজনকে নিয়ে। 

সম্পর্ক আছে ছেলেটিকে দেখেই তােমার জাল কেটে বেরিয়ে আসবার কথা মনে হলতােমার মনের একটি অংশ তাতে সায় দিল নাসৃষ্টি হল প্রচণ্ড চাপেরদুঃস্বপ্নগুলি চাপের ফল, আর কিছুই নাছেলেটিকে তােমার খুব ভাল লেগে গেছে তুমি তা স্বীকার করতে চাচ্ছি না‘ 

ছেলেটিকে ভাল লাগার কিছু নেই। 

আমার ধারণা আছেতুমি তােমার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কাকে সবচে ভালবাস

পজার চাচাকে। 

চিন্তা করে দেখ তাে পজার চাচার স্বভাবচরিত্রের সঙ্গে তােমার ছেলেটির স্বভাব চরিত্রের কোন কোন মিল আছে

কোন মিল নেইভাল করে চিন্তা করআমার ধারণা মিল আছে। 

আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

পজার চাচা অকারণে হো হাে করে হাসেনছেলেটিও হাসেআর?এইসব নিয়ে ভাবতে আমার ভাল লাগছে নাআমি যে তােমার সমস্যাটা ধরিয়ে দিয়েছি তাকি বুঝতে পেরেছ?| লিলিয়ান জবাব দিল নাডাঃ ভারমন হাসলেনলিলিয়ান বলল, আমাকে আপনি কি করতে বলেন

উপদেশ চাচ্ছ?” 

আমি তােমাকে কোন উপদেশ দেব নাতুমি কি করবে না করবে তা তোমার ব্যাপারআমি সমস্যা ধরিয়ে দিয়েছিসমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তােমারকারণ সমস্যাটা তােমার, আমার নয়। 

লিলিয়ান উঠে দাড়ালফিরে গেল অ্যাপার্টমেন্টেপ্রায় এক ঘন্টার মত চুপচাপ বিছানায় শুয়ে রইলতারপর উঠে হাতে মুখে পানি ছিটালসে তার সবচে সুন্দর পােশাকটা পড়লঅনেক সময় নিয়ে চুল আঁচড়ালতার সম্বল অল্প কিছু ডলারের সব টা সঙ্গে নিয়ে বেরুলসে তাহেরকে খুঁজে বের করবেএই শহরের মেডিকেল স্কুলের একজন বিদেশী ছাত্রের ঠিকানা বের করা কঠিন হবার কথা নাতবে লিলিয়ান প্রথমে গেল ডাউন টাউনের এক ফুলের দোকানেদশ ডলার দিয়ে সে পঁচিশটা চমৎকার গােলাপ কিনলআধ ফোটা গোলাপআগুনের মত টকটকে রঙচিরকাল ছেলেরাই মেয়েদের জন্যে ফুল কিনেছেমাঝেমধ্যে নিয়মের হের ফের হলে কিছু যায় আসে না। 

আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

কলিং বেল টেপার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা খুলে গেলতাহের খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, এসাে লিলিয়ানতার কথা বলার ভঙ্গি থেকে মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে সে লিলিয়ানের জন্যেই অপেক্ষা করছিল। 

লিলিয়ান বলল, আমি যে এখানে আসব তা কি আপনি জানতেন? তাহের বলল, জানব কি করে আগে তো বলনিআমাকে দেখে অবাক হন নি

আমি এত সহজে অবাক হই নাছােটবেলায় বাবার সঙ্গে রিকশা করে যাচ্ছিলামহঠাৎ করে রিকশা থেকে পড়ে গেলেননেমে গিয়ে দেখি মরে পড়ে আছেনসেই থেকে অবাক হওয়া ছেড়ে দিয়েছি‘ 

লিলিয়ানের চোখেমুখে হকচকিত ভাবতার ফর্সা কপাল ঘামছেহাতের গােলাপগুলি নিয়েও সে বিব্রততাহের বলল, ফুলগুলি কি আমার জন্যে

দাও আমার হাতেতুমি বোস। 

দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে এসেছ

লিলিয়ান কি বলবে বুঝতে পারছে নাসত্যি তাে সে কি জন্যে এসেছে ? কেনই বা এসেছে? সে তাকাল চারদিকেঅবিবাহিত পুরুষের ঘরএকপলকেই বোঝা যায়টেবিলে বা দেয়ালে কোন তরুণীর ছবি নেইএটা একটা বড় ব্যাপারবিছানার কাছে পিন আপ পত্রিকা নেইলিলিয়ান ক্ষীণ গলায় বলল, আমি এখন চলে যাব। 

আয়নাঘর-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

চলে যাবে ভাল কথা চলে যাওহঠাৎ করে একগাদা ফুল নিয়ে এসে পাথরের মূর্তিমত দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে চলে যাওয়া ভাল। 

আপনাকে বিব্রত করার জন্যে আমি দুঃখিত। 

‘আমি মােটেও বিব্রত হই নিবিস্মিত হচ্ছিঅন্যদের বিস্ময় যেমন চোখে মুখে ফুটে উঠে আমার বেলায় তা হয় না বলেই তােমার কাছে মনে হচ্ছে আমি পুরাে ব্যাপারটা খুব সহজভাবে নিচ্ছিআসলে তা নাআমার ঠিকানা কোথায় পেলে

জোগাড় করেছিকেন?” 

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *