কিছু শৈশব-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

আসাদুজ্জামান নূর সাহেবের কী একটা প্রােগ্রামে সিলেট গিয়েছিসকাল থেকেই বৃষ্টিআমি বের হলাম মীরাবাজারের খোঁজেকোনাে কিছুই চিনতে পারলাম নাআমাদের বাসার সামনেই গরম পীরের মাজার নামে একটা মাজার ছিল সেটা পাওয়া গেলকিন্তু কী আশ্চর্য পরিবর্তন! মাজারের পাশে ছােট্ট একটা গাছভর্তি টিলা ছিলটিলা নেই

কিছু শৈশব

মাজারের একপাশে ফাকা মাঠ ছিলমাঠ নেইআমাদের বাসাটা কোথায় থাকতে পারেএই নিয়ে অনেক হিসাব অনেক অনুমান করে যাচ্ছিবৃষ্টি গেল থেমেস্মৃতির বাসা খুঁজব, না ফিরে যাব ? পঞ্চাশ বছর আগের ভাঙা একতলা বাড়িটা থাকার কথা নাচারদিকেই উঁচু উঁচু ঝকঝকে দালানসিলেটিরা অর্থবানজমি কিনতে এবং দালান বানানােয় তাদের ঝোঁক আছে। 

আমার কৌতূহল জয়ী হলােবাসা খুঁজে পাওয়া যায় কিনা দেখা যাকইদারাওয়ালা ছােট্ট বাড়িটার কী পরিবর্তন হয়েছে সেটাও দেখা যাক। 

সম্পূর্ণ অনুমানের উপর নির্ভর করে একটা পাঁচিলঘেরা বাড়ির সামনে দাঁড়ালামঅনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর সৌম্যদর্শন এক বৃদ্ধ দরজা খুললেন। 

সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তিনি তাকাচ্ছেনআমি বিনীত ভঙ্গিতে বললাম, আমি কি একমিনিটের জন্যে আপনার বাড়িতে ঢুকতে পারি

সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ তীক্ষ্ণগলায় বললেন, কেন

আমি বললাম, আমার ধারণা অনেককাল আগে এই বাড়িটায় আমরা থাকতাম। 

আপনার পরিচয়

আমি নাম বললামতাকে দেখে মনে হলাে এই নামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় নেইএই বয়সের মানুষ হাদিসকোরান পড়েনতারা গল্পের বই পড়া বা নাটক সিনেমা দেখা থেকে দূরে থাকেনআমার অনুমান ভুল প্রমাণিত হলােসৌম্যদর্শন বৃদ্ধের ঠোটে রহস্যময় হাসি দেখা গেলতিনি বললেন, আপনার বাড়ি যেমন ছিল আমি তেমন রেখে দিয়েছিএই বাড়িটা ঠিক রেখে অন্যদিকে দালানকোঠা করেছিআমি আমার ছেলেমেয়েদের বলে দিয়েছি, যতদিন আমি জীবিত থাকব ততদিন হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি ভাঙা হবে না আসুন ভিতরে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

বাড়িতে পা দিয়ে আমি হতভম্বতাে কুয়াতলাতাে আমাদের শােবার ঘর, তাে বারান্দাবড়মামা যেকামরায় থাকতেন শুধু সেই কামরার মেঝেতে বিকটদর্শন অদ্ভুত এক যন্ত্রএটা নাকি আতর বানানাের যন্ত্র বৃদ্ধ আতর বানানআমি বললাম, কুয়াতলায় একটু বসি। 

উনি চেয়ার আনার জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়লেনতার আগেই কুয়ায় হেলান দিয়ে আমি বসে পড়েছিআমি খুব ব্রিত বােধ করছিকারণ আমার 

(বাঁয়ে) মীরাবাজারের এই বাড়িতেই কেটেছে শৈশব(ডানে) মীরাবাজারের সেই বাড়ির জায়গায় এখন উঠছে বহুতল ভবন 

চোখভর্তি জলএদিকে আশেপাশের বাড়িতে খবর চলে গেছেতরুণ এবং তরুণীরা আসতে শুরু করেছেকারাে কারাে হাতে অটোগ্রাফের খাতাতারা হয়তাে তাদের লেখককে কাঁদতে দেখে মজা পাবে, আমি সেরকম মজা পাব না। 

সৌম্যদর্শন বৃদ্ধের নাম আজিজুর রহমানতিনি তার জীবক্কালে হুমায়ূন আহমেদ যে বাড়িতে থাকত সেটি ভাঙেন নিঅল্প কিছুদিন হলাে তিনি মারা গেছেনআমার স্মৃতির বাড়িটি ভেঙে নতুন দালান উঠেছেআমি চলে আসার সময় বৃদ্ধ ছুটে গিয়ে এক শিশি আতর এনে পুরােটাই আমার গায়ে ঢেলে দিলেন। 

আমি অকৃতী এবং অধম, তারপরেও পরম করুণাময় আমাকে অনেক দিয়েছেনএক বৃদ্ধ বাড়ি আগলে রেখে অপেক্ষা করেছেন হুমায়ূন আহমেদআসবে, তার প্রতীক্ষা । 

হে পরম করুণাময়, যে বৃদ্ধ হৃদয়ের মমতায় আমার গায়ে আতর ঢেলে দিয়েছেন, তুমি তার এবং তাঁর পরিবারের সবাইকে আতরের পবিত্র সৌরভে সুরভিত করে দিওআমিন। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

শুধুই খেলা একালের শিশুদের জীবন থেকে খেলা কি নির্বাসিত ? আমি যে অ্যাপার্টমেন্টে বাস করি সেখানকার শিশুদের মাঝে মাঝে দেখি পার্কিং লটে শুকনামুখে হাঁটাহাঁটি করতেতাদের সঙ্গে খবরদারির জন্যে বুয়া থাকেবুয়াদের মুখে আনন্দ থাকে, শিশুদের মুখে থাকে না। গাড়ির বিষাক্ত ধোঁয়ায় শিশুরা কী খেলে কে জানে! তাদের খেলার সময়ইবা কোথায় ? ইংরেজি স্কুলে পড়াশােনার প্রচণ্ড চাপসেই চাপ আটকাতে বাড়িতেও চাপএক্সট্রা কোচিং, প্রাইভেট স্যারআমি একটি ছেলেকে চিনি, যার জন্যে তিনজন প্রাইভেট টিচারসে পড়ে ক্লাস টুতেএই বাচ্চাটার দম ফেলার সময় পর্যন্ত নেইএরা কি কখনাে নিশ্চিন্ত মনে খােলা আকাশ দেখেছে ? অবারিত মাঠে হেটেছে প্রবল বৃষ্টিতে ঝাপাঝাপি করেছে

সেই সুযোেগ তাদের নেইতারা খাচার বন্দি জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেখাচা থেকে বের করে আনলেই তারা বরং ভয় পাবেঅথচ আমাদের সময়টা কী সময়ই না ছিল! পুরাে মীরাবাজারটাই যেন আমার বাড়িযেখানে ইচ্ছা যেতে পারিযেকোনাে অচেনা ঘরে ঢুকে যেতে পারিঅচেনা ঘরের অচেনা শিশুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলে চলে আসতে পারিগৃহকত্রী একবার শুধু উদাস গলায় জিজ্ঞেস করবে তুমি কোন বাড়ির ? নাম কী ? খেলতে খেলতে বেলা হয়ে গেছে, গৃহকত্রী অবশ্যই তার বাড়িতে ঢুকে পড়া ছেলেটিকে আদর করে খাওয়াবে। 

আমাদের সময়ের মায়েরাও ছিলেন অন্যরকম, শিশুদের বিষয়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা থেকে তারা সম্পূর্ণ মুক্তসন্ধ্যাবেলায় ঘরে ফিরলেই হলােমাঝেমাঝে শাসন না করলে সন্তান বিগড়ে যাবে, এই কারণে কিছু শাস্তি হতােঅকারণে চড়থাপ্পড়যে শাস্তি পাচ্ছে সে ধরে নিচ্ছে এই শাস্তি জীবনেরই অংশএই শাস্তিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেবার কিছু নেই। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(২)-হুমায়ূন আহমেদ

খেলা প্রসঙ্গে আসিতখনকার শিশুরা কী খেলত ? সরঞ্জামবিহীন খেলা মার্বেলের চল ছিলতবে কোনাে এক বিচিত্র কারণে মার্বেল বস্তুটিকে অভিভাবকরা সন্দেহের চোখে দেখতেনপকেটে মার্বেলের ঝনঝন শব্দ হলেই অবধারিত শাস্তিএবং মার্বেল বাজেয়াপ্তমীরাবাজারের বাসার কুয়ায় অনেক মার্বেলের সলিল সমাধি হয়েছেসব মার্বেলই কাজের ছেলে রফিকের জিতে আনাওর টিপ ছিল বিশ্বমানেরঅলিম্পিকে মার্বেল খেলার ইভেন্ট থাকলে রফিক অবশ্যই সােনা জিতত

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *