মার্বেলের কাছাকাছি আরেকটা খেলা ছিল, চাড়া খেলা নাম । সাতটা মাটির বাসন ভাঙা চাড়া একের উপর এক সাজিয়ে দূর থেকে নিশানা করে মেরে সপ্তসৌধ ভেঙে দেয়া। এই খেলায় আমি মজা পেতাম না, কারণ আমার নিশানা ভালাে না । সিগারেটের খালি প্যাকেট দিয়ে একটা খেলা ছিল। চাড়া খেলারই অন্য ভার্সান। এই খেলায় টাকাপয়সা লেনদেন হতাে। টাকাপয়সা মানে সিগারেটের প্যাকেট।

ক্যাপসটেন সিগারেটের প্যাকেটের মূল্যমান একশ‘ টাকা, সিজার সিগারেটের প্যাকেট পঞ্চাশ টাকা। সবচে‘ দামি ছিল থ্রি ক্যাসেল সিগারেটের প্যাকেট। খুবই কম পাওয়া যেত বলে এর দাম দিল পাঁচ হাজার টাকা। আমরা শিশুরা যখন খেলতে যেতাম আমাদের চোখ থাকত রাস্তায়, ডাস্টবিনে। যদি
কোনাে খালি প্যাকেট পাওয়া যায়! একদিনের ঘটনা বলি। গরম পীরের মাজারের সামনে দিয়ে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি রাস্তায় কী যেন চকচক করছে। দূর থেকে থ্রি ক্যাসেল সিগারেটের প্যাকেটের মতাে দেখাচ্ছে। আসলেই কি তাই? আমি ছুটে গেলাম। যা ভেবেছি তাই। আমার হাত–পা গেল ঠাণ্ডা হয়ে। বুক ধ্বক ধ্বক করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। এত সৌভাগ্য কারাে হয় ?
কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
একবার এক পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে আমি আমার জীবনের কিছু আনন্দময় অলৌকিক মুহূর্তের কথা বলেছিলাম। যেমন, নর্থ ডেকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির রসায়ন বিভাগের দীর্ঘ করিডােরে আমি হাঁটাহাঁটি করছি। টেনশনে অস্থির। কিছুক্ষণ আগেই আমি Ph.D‘র ভাইবা দিয়েছি। বিচারকরা এখন রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন। বৈঠক শেষে জানাবেন আমাকে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া যাবে কি যাবে না। একসময় দরজা খুলল। বাের্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর জেনাে উইকস গম্ভীর ভঙ্গিতে এগিয়ে এলেন। আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, হ্যালাে ডক্টর হুমায়ূন। মুহূর্তটা ছিল অলৌকিক।
ইট, চুন, সুরকিতে তৈরি এই কলতলাতেই ছিলাে একটি কুয়া (কূপ)।
আরেকটা বলি। আমার প্রথম মেয়ে নােভার জন্ম হয়েছে ধানমণ্ডির কোনাে এক ক্লিনিকে । আমি আমেরিকায়। ক্লিনিক থেকে তার জন্মসংবাদ আমাকে দেয়া হলাে। মেয়ে নাকি জন্মের পর থেকে কেঁদেই যাচ্ছে। আমি টেলিফোনটা মেয়ের কাছে নিয়ে যেতে বললাম, তার কান্না যদি শােনা যায়। তার মা তাই করল, আমি মেয়ের কান্না শুনলাম। আহা কী আনন্দময় অলৌকিক মুহূর্ত!
আমরা যখন জীবনের হিসাব মেলাই তখন শৈশবের অলৌকিক আনন্দময় অংশটা বাদ থাকে। বাদ থাকে বলেই লেখক হুমায়ূন আহমেদের অলৌকিক আনন্দময় মুহূর্তের যে তালিকা পত্রিকাওয়ালারা ছাপে তাতে থ্রি ক্যাসেল সিগারেটের প্যাকেট প্রাপ্তির অলৌকিক আনন্দের কথা থাকে না।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
শৈশবের একা হাঁটাহাঁটি, এর–তার বাড়িতে ঘরের ছেলের মতাে ঢুকে যাওয়ায় জীবনকে কত বিচিত্র মহিমাতেই না দেখার সুযােগ হলাে! একটা উল্লেখ করি।
গরম পীরের মাজারের পেছনে একটা টিনের বাড়ি ছিল। চারদিকে টিনের বেড়া। উঠোন ঝকঝকে তকতকে। এই বাড়িতে আমার খেলার বয়েসি কেউ নেই বলে কখনাে যেতাম না। একদিন কী মনে হলাে, বাড়িতে ঢুকলাম।
ঢুকেই চমকালাম । রূপবতী এক মহিলা উঠোনে বসে তার শিশুসন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। তার বুকের কাপড় সম্পূর্ণ ভােলা। একটা বাচ্চাছেলেকে দেখে তিনি নির্বিকার রইলেন। আমি মুগ্ধ হয়ে দৃশ্যটা দেখছি। মুগ্ধ হবার প্রধান কারণ, বাচ্চাটা মায়ের এক বুক থেকে দুধ খাচ্ছে আর অন্যটা থেকে ফিনকি দিয়ে দুধ বের হচ্ছে।
এরপর থেকে আমার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল, এই বাড়িটির আশেপাশে ঘুরঘুর করা। মহিলা যখন বাচ্চাকে দুধ খাওয়ান তখন সামনে উপস্থিত হওয়া।
মহিলা নিশ্চয়ই আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। কারণ একদিন তিনি বললেন, দুধ খাওয়ানাে দেখতে ভালাে লাগে ?
আমি হাঁ–সূচক মাথা নাড়লাম। তিনি বললেন, দুধ খাইতে ইচ্ছা করে ?
আমি আবারাে হা–সূচক মাথা নাড়লাম। মহিলার ঠোটে হাসির আভাস দেখা গেল। তিনি পাশে রাখা একটা কাপ ভঁর খালি বুকের সামনে ধরলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই কাপ অর্ধেকের মতাে ভরে গেল।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
তিনি কাপ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, নে খা ।
আমি আগ্রহ নিয়ে খেলাম। তিনি বললেন, রােজ আইসা দুধ খাইয়া যাবি। কাউরে এই ঘটনা বলবি ।
আমি দুর্বোধ্য এই ঘটনা কাউকে বলি নি এবং সেই বাড়িতে আর কোনােদিনও যাই নি। কেন যাই নি সেটাও এক রহস্য।
প্রাণসখা শৈশব ও কৈশােরে প্রাণসখা হয় না। খেলার সাথি হয় । শৈশবের বন্ধুদের কথা এই কারণেই কারাে মনে থাকে না। খেলা শেষ, বন্ধুত্বও শেষ। আমি অনেক চেষ্টা করেও খেলার সাথিদের নাম মনে করতে পারছি না। একজন ছিল শঙ্কর (মাথামােটা শঙ্কর নামে তাকে ডাকা হতাে), তার কথা আমার ছেলেবেলা‘। বইটিতে বিস্তারিত লিখেছি। জীবন তার প্রতি করুণা করে নি।
পত্রিকার হকার। এবং বাদামওয়ালা হয়ে সে কোনােক্রমে জীবন টেনে নিচ্ছিল। বছর দুই আগে পত্রিকায় পড়লাম শঙ্কর খুন হয়েছে। তার মৃতদেহ ভেসে উঠেছে এক পানাপুকুরে। কে বলবে এটাই হয়তাে সেই পুকুর যেখানে আমি শঙ্করকে নিয়ে দাপাদাপি করে শৈশব যাপন করেছি।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
টগর নামের এক খেলার সাথির কথা মনে পড়ছে। আমার চেয়ে সে বছর খানিকের বড়। খেলাধুলায় অপটু, মারামারিতে অতি দুর্বল। দুর্বলরা কথাবার্তায় দড় হয়, সেও তাই ছিল। সারাক্ষণ উপদেশ এবং জ্ঞান বিতরণ। আমাকে সে একদিন গম্ভীর হয়ে বলল, আমার গায়ের রঙ কালাে, কারণ আল্লাহ আমাকে মাটি দিয়ে বানিয়েছেন। আর তােমার গায়ের রঙ শাদা, কারণ তােমাকে গু দিয়ে। বানিয়েছেন। ভালাে করে হাত শুকে দেখ গুয়ের গন্ধ পাবে। (যারা আমাকে সামনা সামনি দেখেছেন তাঁরা জানেন আমার গাত্রবর্ণ কালাে।
মনে হচ্ছে শৈশবে ফর্সাভাব ছিল। যাই হােক পুরনাে প্রসঙ্গে যাই। টগরের কথামতাে আমি আমার হাত শুকলাম এবং গুয়ের গন্ধ পেলাম। কী সর্বনাশ! বন্ধুবান্ধব যাদের গাত্রবর্ণ গৌর তাদের সবার গায়েই গুয়ের বদ গন্ধ! টগরের কথা বিশ্বাস হলো। কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরে মা’কে জিজ্ঞেস করলাম, মা, আমাকে কি আল্লাহ গু দিয়ে। বানিয়েছেন ? বাসায় বিরাট হাসাহাসি পড়ে গেল। আমার মা তার বড় ছেলেকে নিয়ে কোনাে গল্প বলতে গেলেই এই গল্পটা করেন।
টগরের জ্ঞান বিতরণের আরেকটি গল্প বলি। একদিন সে সবাইকে ডেকে বলল, মাথার উপর দিয়ে প্লেন উড়ে যেতে দেখলেই সবাই যেন দৌড়ে বাড়িতে
ঢুকে পড়ে কিংবা গাছতলায় দাঁড়ায়। কারণ প্লেনের যাত্রীদের পেসাব পায়খানা সব নিচে পড়ে। ট্রেনের বাথরুম যেমন প্লেনের বাথরুমও সেরকম নিচে ফুটো।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ
এরপর থেকে আকাশে বিমান দেখা গেলে কিংবা বিমানের শব্দ পাওয়া গেলেই শিশুদের মধ্যে তীব্র চাঞ্চল্য এবং শঙ্কা দেখা দিত। কোনােক্রমে দৌড়ে গাছতলায় আশ্রয় নেয়া। একবার সবাই দৌড়াচ্ছি গাছতলার দিকে, এক পথচারী জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে ? আমাদের মধ্যে একজন জবাব দিল, আকাশ থেকে গু পড়ছে। পথচারী বললেন, কী সর্বনাশ আসমানের গু! তিনিও ছুটতে শুরু করলেন। কী সব রঙিন দিনই না গিয়েছে!
আমার এক সঙ্গী ছিল, গাট্টাগুট্টা, বেঁটে, দৌড় চ্যাম্পিয়ান । মুহূর্তের মধ্যে ভো দৌড় দিতে পারত। ছেলেটির নাম মনে করতে পারছি না, তবে তার উজ্জ্বল মুখ এখনাে চোখে ভাসছে। এই ছেলে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক খেলা বের করে শিশুমহলে বিরাট হৈচৈ ফেলে দিল। এমন উদ্ভাবনী খেলার নজির পাওয়া ভার। খেলাটা ব্যাখ্যা করি। কল্পনা করুন, কোনাে এক ভদ্রলােক বাজার নিয়ে ফিরছেন।
Read more