আমাদের এই নেতা আরাে নতুন নতুন খেলা বার করার আগেই হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেল। আমরা বিরাট ধাঁধায় পড়ে গেলাম । যে বাড়ি থেকে সে আসত (পুকুরপাড়ের এক টিনের বাড়ি) সেই বাড়ি তালাবন্ধ। এই বাড়ি দীর্ঘদিন তালাবন্ধ থাকল।
একসময় তালায় জং ধরল । টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকালে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে ঘাস গজিয়েছে। আমি কী কারণে জানি না প্রায়ই ঐ বাড়ির ভেতর দেখার জন্যে টিনের ফুটা দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম। আমার রােমাঞ্চ বােধ হতাে। মনে হতাে কিছু একটা দেখব। কিছু একটা দেখব। কী দেখার প্রত্যাশা ছিল সেটা এখন আর মনে নেই।
আমার আরেক বন্ধুর কথা বলি। তার নাম খুব সম্ভবত মতি বা মতিন। তার বাবা লন্ডনি । অর্থাৎ লন্ডনে থাকেন। স্ত্রীকে প্রতিমাসে খরচ পাঠান। মতিনের অবস্থা সেই কারণে ভালাে। তাকে দেখলেই মনে হয় সে নতুন কাপড় পরে বিয়ে বাড়িতে যাবার জন্য প্রস্তুত । আমাদের মধ্যে একমাত্র সে সবসময় জুতা পরে বের হতাে। রােগা দুর্বল ধরনের মেয়েলি চেহারার ছেলে। তার মুখে সারাক্ষণই হাসি । তার প্যান্টের পকেট ঝকঝকে নতুন মার্বেলে ভরতি থাকত। তবে সে নিজে মার্বেল খেলত না। একদিন সে বলল, ম্যাজিক দেখাবে। আমরা অতি আগ্রহে তাকে ঘিরে ধরলাম । সে একটা মার্বেল মুখে পুরলাে । পরক্ষণেই হাঁ করে দেখাল মুখে মার্বেল নেই।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
আমরা অবাক হলাম না। বােঝাই যাচ্ছে সে মার্কেল গিলে ফেলেছে। তাকে চেপে ধরতেই সে স্বীকার করল। আমরা বললাম, এই ম্যাজিকটা আবার দেখব। সে নির্বিকার ভঙ্গিতে আরেকটা মার্বেল গিলল। আমরা মহাআনন্দিত। বিপুল করতালি। এর পর থেকে তার প্রধান কাজ হলাে, মার্বেল গিলে আমাদের আনন্দ দেয়া। মতির সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয় নি। এক ভােরবেলায় লন্ডন থেকে তার বাবা চলে এলেন। মতি পেটভর্তি মার্বেল নিয়ে বাবার সঙ্গে লন্ডন চলে গেল। মতির বাবা কোনাে এক কারণে (শিশুদের কাছে দুর্বোধ্য) মতির মাকে সঙ্গে নিলেন না। সেই মহিলা চিৎকার করে এমন কান্না শুরু করলেন যে, বাড়িতে কাক নেমে গেল। গভীর বেদনায় চিৎকার করে কেউ কাঁদলে ঝাঁক বেঁধে কাক নেমে আসে এমন লােকজ প্রবাদ আছে। প্রবাদের সত্যতা থাকতে পারে।
এই মহিলা অনেক দিন কাঁদলেন । আমরা তার কান্নায় অভ্যস্থ হয়ে গেলাম। ধরেই নিলাম, ঐ বাড়ির আশেপাশে গেলেই কান্নার শব্দ পাওয়া যাবে। মানুষ অসাধারণ অনেক ক্ষমতার অধিকারী। মানুষের অসাধারণ ক্ষমতার একটি হচ্ছে, দ্রুত অভ্যস্থ হওয়ার ক্ষমতা।
ছেলেবন্ধুদের কথা অনেক লিখলাম, আরাে লেখা যেত, তবে বিশেষ করে আর কারাে কথা মনে পড়ছে না। জ্ঞানী টগরকে দিয়ে ছেলেবন্ধুদের প্রসঙ্গ শেষ করি। টগর একদিন আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, মেয়েদের পেট থেকে বাচ্চা কীভাবে বের হয় জানিস ?
কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি বললাম, জানি। জানলে বল কীভাবে বের হয়। আমি বললাম, পেট কেটে বের করা হয়।
তুই কিছুই জানিস না, বাচ্চা বের হয় পাছা দিয়ে। পাছা দিয়ে গু যেমন বের হয়ে তেমন।
জ্ঞানী টগরের কাছ থেকে বাচ্চা বের হবার প্রক্রিয়া শুনে দীর্ঘদিন মনকষ্টে ছিলাম। ছয়–সাত বছরের বালকের কষ্ট সহজ কষ্ট না ।।
আমার মেয়েবন্ধুর সংখ্যা খারাপ ছিল না। তারা বাস করত উত্তেজনাহীন এক জগতে। তাদের খেলা রান্নাবাটি খেলা। ভবিষ্যতে রান্নাবাটি করতে হবে তারই প্রস্তুতিমূলক খেলা কিনা কে জানে। রান্নাবাটি খেলায় ছেলেদের প্রয়ােজন ইয়। যেমন বাজার করার জন্যে কাজের লােক লাগে। বাড়ির সাহেব লাগে। আমার ভূমিকা বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির চাকরের। বাড়ির কী কী কী আনতে হবে বলে আমাকে বাজারে পাঠান। আমি কিছু লতাপাতা, মাটি, ইটের গুঁড়া
নিয়ে ফিরে আসি। তখন বাড়ির কত্রী আমাকে বকাঝকা করেন, মাছ পচা, চাল ভালাে না, চালে কংকর এইসব। আমাকে মাথা নিচু করে বকা শুনতে হয়। কিছুক্ষণ পর মেয়েরা রান্না শুরু করে মুখে হঁাক হঁাক জাতীয় নানান শব্দ করে । আমি বসে থাকি, কখন রান্না শেষ হবে, নকল খাওয়া খাব।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
হৈচৈ মারামারির তুমুল উত্তেজনায় খেলার পর রান্নাবাটির মতাে পানসে খেলায় আমার আনন্দ পাওয়ার কোনাে কারণ ছিল না। কিন্তু আমি আনন্দ পেতাম। কেন পেতাম বলতে পারব না। সব মেয়ের ভেতর যেমন একজন পুরুষ বাস করে, সব ছেলের মধ্যেও একটি নারী বাস করে। নারী–পুরুষের বিভাজন রেখা দুর্বল।
মেয়েদের মধ্যে সবচে‘ বেশি যার কথা মনে আছে তিনি পারুল আপা (আমার ছেলেবেলা‘তে উনার কথা লিখেছি)। তার চেহারা মনে নেই। ফর্সা লম্বাটে মুখ— এইটুকু শুধু মনে আছে। পারুল আপা ক্লাস সিক্সে কিংবা সেভেনে পড়তেন। তিনি প্রায়ই আমাকে তার স্কুলে নিয়ে যেতেন। তখনকার সময়ে মেয়েরা অভিভাবক হিসেবে তাদের ছােটভাই জাতীয় বালকদের নিয়ে যেতে পারত।
মেয়েদের স্কুলে অকারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার মতাে বিরক্তিকর কাজে আমি রাজি হতাম দুটা কারণে। পারুল আপাকে স্কুলে যাবার জন্যে প্রতিদিন আট আনা পয়সা দেয়া হতাে। তিনি যেতেন রিকশায় করে, প্রায়ই ফিরতেন হেঁটে। রিকশায় চড়ার আনন্দ এবং বেঁচে যাওয়া পয়সায় নানাবিদ সুখাদ্য কেনার আনন্দেই আমি সঙ্গী হতাম।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ
শিশুদের জন্যে সুখাদ্যের অভাব সে–সময় ছিল না। তালিকা দেই— ১. হজমি (বেশি পাওয়ারের কিছু হজমি তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করে দেয়া
হতাে। তৈরি প্রক্রিয়ায় আগুন জ্বলত। সেই হজমি খাওয়ার পর দাঁত
মুখ সব হতো কালাে।) ২. আইসক্রিম (আইসক্রিমওয়ালা দুই হাতে দুটা সিলিন্ডার টাইপ
আইসক্রিম ফ্লাস্ক নিয়ে বের হতাে। একটায় থাকতাে দুধমালাই আইসক্রিম, দাম দুই আনা। অন্যটায় এক আনা দামের সাধারণ।
দুটার স্বাদই অপূর্ব। দুধমালাইয়ের স্বাদ অপূর্ব টু দ্য পাওয়ার ফাইভ।) ৩, বুট ভাজা (ঝাল লবণসহ) ৪. বাদাম ভাজা (ঝাল লবণসহ) ৫, গােল্লা লজেন্স (বড় বড় গােল লজেন্স। লাল ডােরাকাটা। খাওয়ার পর
পর মুখ টকটকে লাল।)
৬. আচার (আচারওয়ালা মাথায় আচারের খলুই নিয়ে ঘুরতাে। অতি
সুরেলা গলায় মিষ্টি আচার‘ বলে ডাক দিত।) পারুল আপার মা অতি ভালাে মহিলা ছিলেন। নিজের ছেলেমেয়েদের যেমন আদর করতেন অন্যদেরও করতেন। তাঁর মাথায় সামান্য দোষ ছিল । মাঝে মাঝে কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড রেগে যেতেন। তখন হাতের কাছে যাকে পেতেন তাকেই মারতেন। আমিও একবার তার হাতে মার খেয়েছি।
Read more