কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

বিভিন্ন পীরফকির এসে এই মহিলাকে ঝাড়তােফকিরের ঝাড়ার একটা দৃশ্য এখনাে মনে আছেমহিলাকে বসানাে হয়েছে ভেতরের উঠোনের এক চৌকিতে তিনি বিরাট ঘােমটা টেনে মাথা নিচু করে বসে আছেনতাঁর সামনে ফকির সাহেব একটা শলার ঝাড় হাতে দাঁড়ানাে

কিছু শৈশবফকির সাহেবের মুখভর্তি দাড়িকুস্তিগিরের মতাে বলশালী শরীর। ফকির সাহেব যখন মন্ত্র পড়ে ফুঁ দেন তখন পারুলের বাবা তার স্ত্রীর মাথায় এক কলসি পানি ঢালেনপানি ঢালা শেষ হতেই ফকির সাহেব শলার ঝাড় দিয়ে মহিলার পিঠে প্রচণ্ড বাড়ি দেনমহিলা আল্লাগাে বলে চাপা চিৎকার করেনএই হচ্ছে প্রক্রিয়াচিকিৎসার শেষ পর্যায়ে কী হয় সেটা আমার দেখা হয় নিকারণ ফকির সাহেব এক পর্যায়ে পুলাপান সরাও বলে হুঙ্কার দিতেই আমাদের বের করে দেয়া হয়। 

আমার প্রতি পারুল আপা তীব্র যে মমতা দেখিয়েছেন তার উৎস ফ্রয়েডীয়তখন কিছুই বুঝি নি, এখন বুঝতে পারছিআমি পশ্চিমা দেশের লেখক হলে কী কারণে ফ্রয়েডীয় বলছি ব্যাখ্যা করতামবাংলা ভাষার লেখকদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে

কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

আমাদের পাড়ায় এক বিহারি পরিবার থাকততাদের তিন মেয়ে, তিনটাই পরীর মতাে সুন্দরমেয়ে তিনটা কারাে সঙ্গে মিশত নাবাড়ির ভেতর ঘুরঘুর করতমাকে কাজে সাহায্য করতবাড়িতে আমার খুবই যাতায়াত ছিলতিন বােনের মধ্যে ছােট দুজনকেই আমি আলাদাভাবে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিযতদূর মনে পড়ে দুজনই মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়েছে। 

বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার ব্যাপারে আমার মধ্যে লজ্জা কখনাে কাজ করে নিআমি সরাসরি বলেছি, বড় হয়ে আমাকে বিয়ে করবে

বিয়ের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহের কারণ মহাজন সাহেবের বাড়িআমাদের বাসার কাছেই এক ব্যবসায়ী দ্রলােকের বিশাল বাড়ি ছিলসে বাড়িতে কিছুদিন পরপরই বিয়ের অনুষ্ঠান হতােঅতি জঁকজমকের বিয়ে পরিবারসুদ্ধ সেই বাড়িতে আমাদের দাওয়াত থাকতআমি সারাদিনই বিয়ে বাড়িতে পড়ে থাকতাম আর ভাবতাম কবে যে বড় হয়ে বিয়ে করব

পৃথিবীর সবচে বড় ঘড়ি ? ঐতিহাসিক আলী আমজাদের ঘড়ি 

একদিনের কথা মনে আছেছুটির দিন, বাবার অফিস নেই, ঘরে বসে বই পড়ছেন। মা বাবার কাছে নালিশ করলেন, তােমার ছেলেকে শক্ত করে একটা চড় দাও। 

বাবা বই থেকে মুখ না সরিয়েই বললেন, তার অপরাধটা কী

মা বললেন, সে বিয়ে করতে চায়। 

বাবা বললেন, বিয়ে করতে চায়, বিয়ে দাওতার পছন্দের কোনাে মেয়ে কি আছে ?

কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

মা কিছু বলার আগেই আমি চিকন গলায় বললাম, আছেবাবা শব্দ করে হেসে উঠলেনতিনি মাকে বললেন, আমি আমার এই ছেলেকে খুব অল্পবয়সে বিয়ে দেবআমার চোখের সামনে ছেলে তার বউ নিয়ে রান্নাবাটি খেলবেএই দৃশ্য দেখব। আমি দুইজনকে দুই কোলে নিয়ে বেড়াতে যাব। 

বাবার এটা মুখের কথা ছিল নাতিনি তাঁর কর্মজীবনে যেখানেই কোনাে রূপবতী মেয়ে দেখেছেন সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বড়ছেলের সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দেবার কথা ভেবেছেন। 

পরম করুণাময় আমার বাবার প্রতি তেমন করুণা করেন নিতিনি তাঁর কোনাে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেখে যেতে পারেন নিঅন্য বাড়ির কোনাে মেয়ে এসে তাকে মিষ্টি গলায় বাবাডাকে নিঅন্য বাড়ির কোনাে ছেলে তাঁর সামনে পুত্রসম এসে দাঁড়াবার সুযােগ পায় নি আহারে

পিতা শৌখিনদার! নেত্রকোনা এবং সিলেট অঞ্চলে শৌখিনদারশব্দটা প্রচলিতশৌখিনদার হলাে বড়লােক পিতার অলস সন্তানকাজ নাই, কর্ম নাই, দুশ্চিন্তা নাইজীবন চর্যা শখ মিটানােতে সীমাবদ্ধপায়রা উড়াও, মােরগের লড়াইয়ের ব্যবস্থা করাে, বন্দুক হাতে পাখি শিকারে যাওজীবনের উদ্দেশ্য একটাইশখ মিটানাে

কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

আমার বাবা ছিলেন দরিদ্র শৌখিনদারঅন্য শৌখিনদারের সঙ্গে তার আরেকটা পার্থক্য ছিলজীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অনেক বড় ছিল। 

তাঁর ফটোগ্রাফির শখ ছিলযেখানে যেতেন কোডাক ক্যামেরা সঙ্গে থাকতবাসার একটা ঘরে ডার্করুম বানিয়ে নিজেই ছবি ডেভেলপ করতেনআমার জীবনের আনন্দময় স্মৃতির একটি হলাে, সব ভাইবােন পানির গামলার চারপাশে গােল হয়ে বসে আছিগামলায় পােস্টকার্ড সাইজ শাদা কাগজ ছাড়া হয়েছেআস্তে আস্তে কাগজে রঙ ধরছেছবি ভেসে উঠছেকী দুর্দান্ত ম্যাজিক! বাবা ম্যাজিশিয়ান| তাঁর বই কেনার শখ ছিলবড় বড় ট্রাঙ্ক ভর্তি ছিল বইয়েপ্রতি শীতে একবার সমস্ত বই বের করে রােদে দেওয়া হতােএই কাজটা করতাম আমরা ভাইবোনরাবাসার সামনে পাটি পেতে গাদাগাদা করে বই রাখারুটি ভাজার মতাে বই উল্টে দেয়া

বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে যারা যেত তারাও দৃশ্যটা আগ্রহ নিয়ে দেখতকেউ কেউ কাছে এসে দাঁড়াত; বিস্মিত গলায় বলত, এত বই!আমার খুব আনন্দ হতােআমি গম্ভীর গলায় বলতাম, আরাে আছেঘরে রাখা আছেএটা মিথ্যা ভাষণসব বইই রােদে দেয়া হয়েছে

কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

তাঁর মহাপুরুষদের ছবি বাঁধিয়ে ঘরে টানিয়ে রাখার শখ ছিলঘরভর্তি শুধু ছবি মাইকেল মধুসূদন যেমন আছেন, জর্জ বার্নাড আছেন। কোন ছবিটা কার এটা জানা আমাদের বাধ্যতামূলক ছিলবার্নাড ছবি কোনটা তা আমি যেমন জানতাম আমাদের কাজের ছেলে রফিকও জানত। 

তাঁর গানবাজনার শখ ছিলপ্রতি সপ্তাহে বাসায় গানের আসর হতােগভীর রাত পর্যন্ত গানবাজনা চলততিনি নিজে বেহালা বাজানাে শিখবেন বলে বেহালা কিনেছেনওস্তাদ রেখে বেহালা শেখার সামর্থ্য হয় নি বলে কোনােদিন বেহালা বাজানাে হয় নিদীর্ঘদিন তিনি এই বেহালা যক্ষের ধনের মতাে আগলে রাখলেন। 

আমি লেখক জীবনের এক পর্যায়ে হিমু নিয়ে উপন্যাস শুরু করলামহিমুবাবা ছেলেকে মহাপুরুষ বানানাের চেষ্টা করেননানান পরিকল্পনা কঠিন ট্রেনিংএই চরিত্রের ধারণা কি আমি আমার বাবার কাছ থেকে পেয়েছি ? সম্ভাবনা একেবারেই যে নেই তানাবাবা একই কাজ করেছেনছেলেমেয়েদের নানান বিষয়ে আগ্রহী করার চূড়ান্ত চেষ্টা চালিয়েছেনযেমন তিনি ঘােষণা দিলেন, সঞ্চয়িতা থেকে কেউ পুরাে একটা কবিতা মুখস্থ শােনাতে পারলে একআনা পয়সা পুরস্কারআমরা মহাউৎসাহে কবিতা মুখস্থ করতে লেগে গেলাম| ছবি আঁকার দিকে আমাদের সবার প্রবল ঝোঁকবাবা ঘােষণা করলেন, ছবির অ্যাক্সিবিশন হবে, সবাই ছবি এঁকে জমা দাওফার্স্ট প্রাইজ দুই আনা, সেকেন্ড প্রাইজ এক আনাআমরা মহাউৎসাহে ছবি আঁকায় লেগে গেলাম। 

আমার গল্পের বই পড়ার তীব্র নেশাএকদিন আমাকে নিয়ে কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের সদস্য করে দিলেনসপ্তাহে দুটা করে বই আনা যাবেআমি তখন ক্লাস টুতে পড়িআমার ধারণা কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের আমিই সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। 

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *