কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

একটা সাহসী কুকুর পানিতে নেমে সাঁতরে মামার দিকে খানিকটা গিয়ে ভয় পেয়ে ফিরে এলােমামার জন্যে আমাদের দুঃখের সীমা রইল না আহা বেচারা! বড়মামা আমাদের শােকসাগরে ভাসিয়ে পরদিন ভােরে ঠিক দুটায় নানাজানের সঙ্গে হাঁটাপথে ময়মনসিংহ রওনা হয়ে গেলেন

কিছু শৈশববকুল আপা খুব কাঁদতে লাগল বড় মামার জন্যে তার খুব মায়াতার ধারণা, বড় মামা হচ্ছেন একজন মহা মহা মহা পুরুষ কিছু কিছু ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড়কারণ রবীন্দ্রনাথ চোখ বন্ধ করে হাতির ছবি আঁকতে পারতেন নামামা পারেন । 

পনের দিনের দিন সিলেট মেইলে মামা চলে এলেনতাঁর মাথায় সামান্য চুল গজিয়েছেমনে হয় এই কদিন তাকে ঘরে বন্দি থাকতে হয়েছে কারণ চেহারা ফর্সা হয়ে গেছেদেখতে খুব সুন্দর লাগছেগায়ে সিল্কের পাঞ্জাবিপায়ে নতুন জুতাতবে মামার চোখ দুটি বিষন্ন

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

ঘরে ঢুকেই মাকে কদমবুচি করতে করতে বললেন, আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে বুবু! জোর করে বিয়ে করিয়ে দিয়েছেআত্মহত্যা করব বলে ভেবেছিলাম আত্মহত্যা হচ্ছে জীবনের কাছে পরাজয়এই মনে করে আত্মহত্যা করি নিতবে সম্ভাবনা পুরােপুরি উড়িয়েও দিচ্ছি না। 

মা বললেন, বিয়ে হলাে কবে ? গত পরশু বিয়ের পরদিন প্রথম সুযােগেই পালিয়ে এসেছি। 

সে কী

মামা উদাস গলায় বললেন, সংসার আমার জন্যে না বুবুএই দিনে নতুন একটা কাব্যনাট্য লিখেছিনাম জীবন দেবতা। অসাধারণ জিনিসখাওয়াদাওয়ার পর পড়ে শােনাব। 

বউ কেমন ? জানি না কেমনবউ দেখিস নি ? এই প্রসঙ্গটা রাখ তাে বুবু। অসহ্য লাগছেনাম কী বউএর

জানি না নদীর নামে নামসুরমা কিংবা কুশিয়ারা কিছু একটা হবেহুকেয়ারস ? এইসব তুচ্ছ বিষয় আমার কাছে জানতে চেয়াে না তাে। 

মামা শিস দিতে দিতে নিজের ঘরের দিকে রওনা হলেনফিরে আসতে পেরে তার আনন্দের সীমা নেইআমাদেরও আনন্দের সীমা নেই। 

অবশ্যি এই আনন্দ পরদিন বিকেলে নিরানন্দে পরিণত হলােনতুন করে রিহার্সেল শুরু হলে দেখা গেল আমরা সবাই পাট ভুলে গেছিযেভাবে যা বলার কথা সেইভাবে বলতে পারছি নাবনরক্ষক অয়ােস্কান্তের দেখা হবে রাজকুমারী সুবর্ণরেখার সঙ্গেসে দিনহীন বেশে রাজকুমারীকে দেখে একী একী হেরিলামবলে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে যাবেগোঁগোঁ শব্দ করতে থাকবে

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

রিহার্সেলের সময় অয়ােস্কান্ত (পাশের বাড়ির বাবলু) অনেকগুলি ভুকরল। একী একী হেরিলামের জায়গায় বললএকী একী দেখিলামডানকাত হয়ে পড়ার কথা, পড়ল বামকাত হয়েগোঁগোঁ শব্দ করার বদলে হিক্কা তুলতে লাগল। 

বড়মামার মেজাজ সপ্তমে উঠে গেল গম্ভীর গলায় বললেন, কানে ধরে এই গাধাটাকে তুল তােঅসহ্য লাগছেএই দিনে সব খেয়ে বসে আছিস ? যার 

শাহজালাল (:)এর দরগা প্রাঙ্গনে বহুল আলােচিত জালালী কবুতর। 

যা মনে আসছে বলে যাচ্ছিস? দেখিলাম আর হেরিলাম এক হলাে ? শব্দের অর্থ এক হলেও এই দুয়ের মধ্যে আকাশপাতাল ফারাকতােদের তাে বােঝার বুদ্ধি নেইএত কষ্ট করে একটা জিনিস দাঁড় করিয়েছি, তােরা সব জলে ভাসিয়ে দিলি! আমার হাতপা কামড়াতে ইচ্ছা করছেএখন থেকে দুবেলা রিহার্সেল করবপৌষ উৎসবে নামাতেই হবে। এটা শেষ হবার পর প্রহসন ধরব। 

প্রহসনটা কী

বললে বুঝতে পারবি নাঅন্য জিনিসহাসতে হাসতে দমবন্ধ হয়ে যাবেএই হাসির ফাঁকে ফাঁকে আছে গুরুত্বপূর্ণ সব দার্শনিক কথাঅবহেলিত শােষিত মানুষের বাণীবদ্ধ অশ্রু

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

আমরা নতুন উৎসাহে রিহার্সেল শুরু করলামবড়রা সবাই তাতে বিরক্ত হলেন। 

বাবা রাগী রাগী গলায় বললেন, এই গদৰ্ভটাকে কানে ধরে সকালবিকাল দুবেলা উঠবােস করানাে দরকার বাড়িতে তাে মনে হয় বাস করা যাবে না। 

নানাজান দেশ থেকে চিঠি লিখলেন মাকে। 

মামার আদেশে সেই চিঠি চুরি করে মামাকে পড়তে দিলামআমিও পড়লামবড়দের চিঠি পড়ে সাধারণত কিছু বােঝা যায় নাতারা সহজ কথা সহজভাবে লিখতে পারেন নাপ্যাচিয়ে লেখেনযাই হােক, নানাজান মাকে লিখেছেন 

মা গাে

দোয়া পর সমাচার এই যে, কুলাঙ্গারটি এক্ষণে নিশ্চয়ই তােমার কাছে উপস্থিত হইয়াছেআমি বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী থাকার কারণে আসিতে পারিতেছি নাযদি পারিতাম তবে কানে ধরিয়া কুলাঙ্গারকে নিয়া আসিতামতাহার যে বিবাহ দিয়াছি সেই সংবাদ নিশ্চয়ই অবগত হইয়াছবিবাহের পরদিন অতি প্রত্যুষে সে কাহাকেও কিছু না বলিয়া চলিয়া যায়নূতন বৌ খুব কান্নাকাটি করিয়াছেএই অতীব সুলক্ষণা, বুদ্ধিমতী মেয়েটির দুঃখে আমার হৃদয় ভারাক্রান্তআমি নিজেও কিঞ্চিৎ অশ্রুবর্ষণ করিয়াছি। 

যাহা হউক, এখন কী করিব বুঝিতে পারিতেছি নাআমার বর্তমান পরিকল্পনা কুলাঙ্গারটিকে কঠিন শাস্তির বিধান করা। কীভাবে তাহা করা যায় তাহাই ভাবিতেছিশরীর ভালাে না বলিয়া কোনাে পরিকল্পনাই কার্যকর করিতে পারিতেছি নাআল্লাহ পাকের দরবারে আমার জন্যে দোয়া করিবে যাতে অতি শীঘ্রই হাঁটাচলার সামর্থ্য লাভ করি এবং কুলাঙ্গারকে শাস্তি প্রদানে সক্ষম হইআর কীভালাে থাকিবেজামাই এবং পুত্রকন্যাদের আমার দোয়া দিবেআল্লাহ হাফেজ

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

দোয়া গাে তােমার পিতা, মােহাম্মদ ইসমাইল খাচিঠি পড়ে মামা খানিকটা গম্ভীর হলেও খুব কাবু হলেন না

সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, এত সহজে বিছানা থেকে উঠতে হবে না নব্বই মাইল হেঁটে শরীরের কলকজা উল্টেপাল্টে গেছেঝাড়া দুমাস বিছানায় শুয়ে থাকতে হবেআপাতত ভয়ের কিছু দেখছি না। 

যেদিন আমাদের নাটক হবার কথা সেদিন ভােরবেলায় আমাদের নতুন মামি এসে উপস্থিততাঁকে দেখে আমাদের বিস্ময়ের সীমা রইল নাকী সুন্দর! কী সুন্দর! রাজকুমারী সুবর্ণরেখাচেয়েও একশ গুণ সুন্দরআর মুখে সারাক্ষণ হাসিযাই শুনছে তাতেই হাসছেঅবশ্যি আমার মাকে জড়িয়ে ধরে খানিকক্ষণ খুব কাঁদলেন । 

মাও কাদলেন। 

আমরা জানলাম, নতুন মামি আমাদের সঙ্গেই থাকবেন মেয়েদের কলেজে তাকে ভর্তি করিয়ে দেয়া হবেতিনিও নাকি আগামী বছর আইএ পরীক্ষা দেবেনমামা আমাকে ডেকে বললেন, গভীর ষড়যন্ত্র যে চলছে তা বুঝতে পারছিস

না। 

গভীর চক্রান্তআমাকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টাওরা কি ভেবেছে আমি ঘাস খাই ? আমার সঙ্গে চালাকি ? তুই যা তাের মামিকে বলে আয় সে যেন ভুলেও আমার ঘরে না আসে। 

এলে কী হবে মামা

আমার চিন্তাভাবনার অসুবিধা হবে

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *