কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

কিছু শৈশব

নতুন প্রহসনে হাত দিয়েছি প্রহসন লেখা কোনাে খেলা কথা নাপ্রহসন লিখতে গিয়ে মাইকেল মধুসূদনের মতাে লােকের মাথার চুল পেকে গিয়েছিলশেষে কলপ দিয়ে রক্ষাযা তাের মামিকে বলে আয় যেন আমার ঘরে না আসে। 

আচ্ছা বলছি। 

আর শােন, খাতির জমাবার চেষ্টা করবি নাখেয়াল রাখবি হচ্ছে শত্রুপক্ষঅবশ্যি তােদের হাত করার চেষ্টা করবেরাম কী করেছিল ? রাবণকে পরাজিত করবার জন্যে রাবণের অতি প্রিয়জন বিভীষণকে হাত করেছিলমনে থাকে যেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে হয়ইতিহাস শুধু পড়লেই হয় না। 

দেখলাম মামার কথা অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে। নতুন মামি ছােটদের হাত করার জন্যে দারুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মিষ্টি মিষ্টি করে সবার সঙ্গে কথা বলছেন, আদর করছেনআমাদের মধ্যে দুর্বল চরিত্রের যারা তারা অল্প সময়েই মামির দিকে ঝুঁকে পড়ল

আমার ছােটবােন শেফু পুরােপুরি মহিলা বিভীষণ হয়ে গেলসারাক্ষণ মামির পেছনে পেছনে ঘুরছেখামচি রানী বকুল আপাও তাই করলমুখে সারাক্ষণ নতুন মামি, নতুন মামি! রাগে আমার গা জ্বলে গেলকতবার বলা হয়েছে, মামি আমাদের শত্রুপক্ষতাও বুঝতে পারছে না । 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)

ঝা। 

মামি যে আমাদের শত্রুপক্ষ তা নাটকের দিন জলের মতাে পরিষ্কার হয়ে গেলদেখা গেল নাটকের সবচেকরুণ দৃশ্যগুলিতে যেখানে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠা উচিত সেখানে মামি খিলখিল করে হেসে ফেলেছেন। 

একটা দৃশ্যে রাজকুমারী কাঁদতে কাঁদতে বলছেরাজকুমারী : কী অমানিশা মাের চারপাশে 

হুতাশন জ্বলে ধিক ধিকজীবন রেখে কী হবে বলে 

জীবন দেয়াই হবে সঠিকএবং এটা বলেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে, তখন বনের পাখি বলছে বিনের পাখির ভূমিকায় অভিনয় করছে আমার ছােট বােন শেফু । 

বনের পাখি : ঝাপ দিও না, ঝাপ দিও না কন্যা গাে 

ঝাঁপ দিও না জলেখুবই করুণ দৃশ্য। এই দৃশ্যে মামি এমন হাসি শুরু করলেন যে স্টেজে বনের পাখি নিজেও ফিক করে হেসে ফেললসেই হাসি দেখে রাজকুমারী সুবর্ণরেখামুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে লাগল এবং তার ডায়ালগ ভুলে গেলবনরক্ষক আয়ােস্কান্ত হাসতে লাগল হােহাে করে চারদিকে হাসাহাসির ধুম পড়ে গেল। 

উইংসের আড়ালে বড় মামা রাগে-দুঃখে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, এটা হচ্ছে স্যাবােটেজইচ্ছাকৃত স্যাবােটেজমেয়ে হচ্ছে শনিগ্রহশনিআমার জীবনে শনি। 

ড্রপসিন ফেলে দিয়ে দশ মিনিট পর আবার অভিনয় শুরু হলােকিন্তু অভিনয় জমল নাকরুণ দৃশ্যগুলাে এলে হাসাহাসির ধুম পড়ে যায়নতুন মামি হাসেন, আমার মা হাসেন, বাবা হাসেনবকুল আপার বাবা হাসেন ঘর কাঁপিয়ে আর বলেন, ভেরি ফানি! বড় মামা পাথরের মতাে শক্ত হয়ে যান

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)

একসময় তিনি রাগে কিড়মিড় করতে করতে বলেন এই মেয়েটাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দেয়া উচিতপ্রথমে একটা গর্ত করে কাটা বিছিয়ে দিতে হবেতার উপর মেয়েটাকে শুইয়ে আরেক প্রস্থ কাঁটাতারপর মাটিচাপা । 

নতুন মামি যেন মামার ঘরে না যান সে বিষয়ে কঠিন আদেশ জারি করা হয়েছিল, তবু এক রাতে দেখলাম মামি মামার ঘরে গেছেনলুকিয়ে বড়দের কথা শােনা খুব অন্যায়, তবু আমি এবং শেফু জানালার পাশে দাড়িয়ে তাদের 

কথাবার্তা শুনতে লাগলাম । বলা যায় নারাগের মাথায় বড় মামা যদি নতুন মামির গলা চেপে ধরেন, তাহলে দৌড়ে মাকে খবর দিতে হবেনতুন মামি আমাদের শত্রুপক্ষ হলেও মেয়ে খুব ভালাে

আমরা শত্রুপক্ষ জেনেও তিনি আমাদের এত আদর করেন যে, আমাদের মিত্রপক্ষ হতে ইচ্ছা করেইচ্ছাকরলেও তাে উপায় নেইবড়মামার দল ছেড়ে তাে আমরা মামির দলে যেতে পারি নাএকবার একটা দল করলে সেই দল ভেঙে অন্য দলে যাওয়া যায় না। 

যাই হােক, জানালার ওপাশে দাড়িয়ে আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে মামামামির কথা শুনছিমামা বসে আছেন বিছানায়মামি দাঁড়িয়ে আছেন টেবিলের পাশেমামি একটু সাজগােজ করেছেনপরনে লাল রঙের শাড়িপান খেয়ে ঠোট করেছেন টুকটুকে লাল চুল বেণি করে বাঁধাযা সুন্দর লাগছে মামিকে

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৭)

বড় মামা : তােমাকে না নিষেধ করা হয়েছে আসতেকেন এলে ? মামি : কাজে এসেছিবড় মামী : কী কাজ? মামি : তােমার বইপত্রগুলাে নিতে এসেছিতুমি তাে আর 

পড়াশােনা করবে নাআমি পড়াশােনা করছিপরীক্ষা 

দেবড় মামা : পরীক্ষা তাে আমিও দেবমামি : পড়াশােনা না করেই পরীক্ষা দেবে ? বড় মামা : হুঁমামি ; ভালােআমি পড়ব বইগুলাে আমাকে দাওবড় মামা : আমার বইয়ে হাত দেবে নাখবরদার মামি : ঠিক আছে হাত দেব নাএমন রেগে রেগে কথা বলছ কেন ?

আমি কী করলাম ? বড় মামা : বিনা অনুমতিতে ঘরে প্রবেশ করেছ, তাতেই রাগ করেছিমামি : আর প্রবেশ করব নাবড় মামা : যারা পড়াশােনা, পরীক্ষা এইসব নিয়ে মাতামাতি করে 

তাদের আমি দুচোখে দেখতে পারি না

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *