অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

অনিল ঘাসের উপর বসে সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেটে টান দিয়ে সে টের পেল আজ সারা দিনে দুকাপ চা ছাড়া খায় নি। সিগারেটের ধোঁয়া পেটে পাক দিচ্ছে, বমি ভাব হচ্ছে। ভয়ংকর সময়েও ক্ষুধা নামক বিষয়টি মানুষের সঙ্গ ছাড়ে না। ফাসির আসামী ফাসির তিন ঘণ্টা আগে খেতে চায়। ফাসির আসামীকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়— শেষ ইচ্ছা কি ? বেশির ভাগই না-কি খাবারের কথা বলে। 

স্যুট পরা ভদ্রলােক হাতে ব্রিফকেস নিয়ে দাড়িয়ে আছেন। তাকে অসম্ভব চিন্তিত মনে হচ্ছে। ভদ্রলােক তাকিয়ে আছেন রাস্তার দিকে। একটা ট্রাক হর্ন দিল। তিনি ভয়ানক চমকে উঠলেন। অনিল তার দিকে তাকাতেই তিনি সরে গেলেন। মনে হচ্ছে তিনি কারাে সঙ্গে কথা বলতে চান না। মহসিন সাহেব। এই মহসিন। 

অনিল তাকাল। আয়ুব আলি তাকেই ডাকছেন। অনিলের মনে ছিল না তার নতুন নামকরণ হয়েছে। আয়ুব আলি বাস থেকে নেমেছেন। এখন তার চোখের সান গ্লাস। এই সানগ্লাস আগে ছিল না। 

মহসিন। ‘আমাকে বলছেন?’ 

আপনাকে ছাড়া কাকে বলব ? এর মধ্যে ভুলে গেছেন ? শুনে যান এদিকে, আর্জেন্ট কথা আছে।’ 

অনিল এগিয়ে গেল । আয়ুব আলি গলার স্বর অনেকখানি নামিয়ে বললেন, অবস্থা খুব খারাপ। 

‘কেন ? 

দুই বােরকাওয়ালীর সঙ্গে এক বুড়াে আছে না? এরা বিহারী!’ ‘কে বলল আপনাকে ? 

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

আপনারা সব নেমে গেলেন। হঠাৎ শুনি এই দুই বােরকাওয়ালী বেহারী ভাষায় কথা বলছে। শুনেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। আমি তাে সহজ পাত্র না, কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আপনারা কি বিহারী ? কথা বলে না। অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। এখন কি করা যায় বলেন তাে ? 

করার কি আছে? 

‘বােকার মতাে কথা বলবেন না। স্পাই যাচ্ছে বুঝতে পারছেন না। আমি কান্না দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম– এটা বাঙালির কান্না না। একেক জাতির কান্না একেক রকম। বাঙালির কান্না বিহারী কাঁদতে পারে না। কিছু একটাতাে করা দরকার।’ 

‘আপনি চুপচাপ থাকুন। কিছুই করার নেই। 

‘আমিও তাই ভাবছিলাম। পথে মিলিটারী, কিছু করা ঠিক হবে না। টাঙ্গাইলে নেমে না হয় বুড়ােকে কানে ধরে উঠ-বােস করাবাে। ঘরের শত্রু বিভীষণ।। 

অনিল কিছু বলল না। শরীরটা খারাপ লাগছে। এতক্ষণ বমি-বমি ভাব ছিল, এখন সত্যি বমি আসছে। বমি করে ফেলতে পারলে শরীরটা বােধ হয় ভালাে লাগত। বমি হওয়ার জন্যেই অনিল আরেকটা সিগারেট ধরাল। 

মহসিন সাহেব। ‘জ্বি। ‘ট্রিকস করে বুড়াে কাছ বুড়াের কাছ থেকে জানব না-কি ব্যাপারটা কি?’ ‘কি দরকার? 

তাও ঠিক। কি দরকার ? তার উপর আবার বুড়াে মানুষ। জোয়ান হলে পাছায় লাথি দিয়ে নালায় ফেলে দিতাম। 

বাসের চাকা বদল করা হচ্ছে। জ্যাকে কি এক সমস্যা। জ্যাক উপরে উঠছে । ড্রাইভার এবং হেল্পার দুজনেই অনেক কায়দা-কানুন করছে। লাভ হচ্ছে । পাপিয়া জানালা দিয়ে হাত ইশারা করে তার বাবাকে ডাকল। অপ্রসন্ন মুখে আয়ুব আলি এগিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন তার চেয়েও অপ্রসন্ন মুখে। থু করে একদলা থুথু ফেলে বললেন, ‘মেয়েছেলে সঙ্গে নিয়ে কোথাও যাওয়াই উচিত । কথায় আছে না- পথে নারী বিবর্জিত। এসব কথাতাে আর এমি এমি লােজন বানায় না। দেখে শুনে বিচার বিবেচনা করে বানায়।

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

‘কি হয়েছে ? 

‘পাপিয়ার মা না-কি আসার সময় পানি বেশি খেয়েছিল, এখন বাথরুমে যাওয়া দরকার। তার জন্যে পাকিস্তানে গভর্নমেন্ট পথের মাঝখানে বাথরুম বানিয়ে বসে আছে। আমি পাপিয়ার মাকে বললাম চুপ করে বসে থাক। একটা কথা না। বেশি কথা আমি নিজে বলি না, বেশি কথা শুনতেও পছন্দ করি না।’ 

অনিল বলল, ‘বাস এখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে বলে মনে হয় । কাছেই একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে সেখানে নিয়ে গেলে হয়।’ 

কে নিয়ে যাবে, আমি?’ ‘আপনি যেতে না চাইলে আমি নিয়ে যাই।’ 

মহসিন সাহেব, আপনার বয়স অল্প। আপনাকে একটা কথা বলি। মেয়েছেলের সব কথার গুরুত্ব দিবেন না। গুরুত্ব দিয়েছেন তাে মরেছেন। এদের কথা এক কান দিয়ে শুনবেন, আরেক কান দিয়ে বের করে দেবেন। আচ্ছা এই শালারা একটা চাক্কা বদল বদল করতে গিয়ে ছয় মাস লাগিয়ে দিচ্ছে ব্যাপার কি ? 

অনিল, আয়ুব সাহেবের স্ত্রী, তাঁর দুই কন্যা এবং হাতাহাতি বিশারদ দুই পুত্রকে নিয়ে রাস্তার ওপারে বাড়িটার দিকে এগুচ্ছে। ভদ্রমহিলা পুরাে ব্যাপারটায় খুব লজ্জা পাচ্ছেন। কিন্তু তার মেয়ে দুটি বাস থেকে বের হতে পেরে উল্লসিত। তারা ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। সেই সব কথা বােঝার উপায় নেই। অল্প বয়স্ক বালিকাদের যেসব কোড ল্যাংগুয়েজ আছে তাই ব্যবহার করা হচ্ছে। ছেলে দুটি নীরব। 

ভদ্রমহিলা কিছুটা গ্রাম্য টানা টানা স্বরে বললেন, ‘পাপিয়ার বাবা আপনারে বিরক্ত করতেছে? 

অনিল বলল, না।’ 

দ্রমহিলা নিচু গলায় বললেন, “আপনে কিছু মনে নিয়েন না। মানুষটা পাগলা কিসিমের কিন্তু অন্তর খুব ভালাে।’ 

মনে করার কিছু নেই।’ কথা বেশি বলে কিন্তু বিশ্বাস করেন খুব ভালাে মানুষ। আমি বিশ্বাস করছি। কেন বিশ্বাস করব না।’ 

পাপিয়া বলল, ‘ছােট বেলায় বাবার টাইফয়েড হয়েছিল। তার পর থেকে বাবা কথা বেশি বলে। 

পাপিয়ার মা, কড়া গলায় বললেন, ‘চুপ কর।’

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

সম্পন্ন গৃহস্তের টিনের বাড়ি। কিন্তু বাড়িতে কোন মানুষ জনের সাড়া নেই। অনেক ডাকাডাকি পর কামলা শ্রেণীর একজন লােক বের হয়ে এল। তার কাছ থেকে জানা গেল রাস্তার দু’পাশে অনেক দূর পর্যন্ত বাড়ি ঘরে কোন মানুষ থাকে। রাস্তা দিয়ে মিলিটারী যাতায়াত করে। বেশ কয়েকবার ট্রাক থামিয়ে তারা রাস্তার আশেপাশের বাড়ি-ঘরগুলতে ঢুকেছে। 

অনিল বলল, বাড়িতে ঢােকে কি চায় ? লােকটা কিছু বলল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকল । 

অনিল বলল, ‘ওরা কি টাকা পয়সা চায় ? না। মেয়েছেলের সন্ধান করে। ‘সে কি? 

অছিমদ্দিন মেম্বার সাহেবের বউ আর ছােট শালীরে ট্রাকে উঠায়ে নিয়া গেছে। তারার আর কোন সন্ধান নাই। 

‘অছিমদ্দিন মেম্বার সাহেবের বাড়ি কোনটা ? 

বাড়ি দূর আছে। এই খান থাইক্যা ধরেন চাইর মাইল। মিলিটারী কি রােজই যাতায়াত করে ? হু। যাতায়াত বাড়ছে। 

বাসের চাকা লাগানাে হয়ে গেছে। বাস হর্ন দিচ্ছে। বৃষ্টিও পড়তে শুরু করেছে। বাসে ফিরতে ফিরতে সবাই আধভেজা হয়ে গেল। বাস যখন ছাড়ল তখন মুষল ধারে বৃষ্টি। দু’হাত দূরের জিনিস দেখা যায় না এমন অবস্থা। আয়ুব আলি আনন্দিত গলায় বললেন, ‘বৃষ্টিটা নেমেছে আল্লার রহমতের মতাে। বৃষ্টিতে মিলিটারী বের হবে না। চেকিং ফেকিং কিছু হবে না। হুস করে পার হয়ে যাব। 

বাস চলছে খুব ধীরে। উইন্ড শিল্ড দিয়ে কিছু দেখা যাচ্ছে না, ধীরে চলা ছাড়া উপায় নেই। আয়ুব আলি বললেন, আমি সামনে গিয়ে বসি, এইখানে খুব ঝাকুনি। মহসিন সাহেব আপনি পা তুলে আরাম করে বসেনতাে।

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

অনিল পা তুলে বসল। তেমন আরাম হল না। ক্ষুধা কষ্ট দিচ্ছে। শরীর ঝিম ঝিম করছে। আয়ুব আলি সাহেবের স্ত্রী, বােরকার পর্দা তুলে দিয়েছেন। স্বামী পাশে নেই এখন একটু সহজ হওয়া যায়। তিনি অনিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘পান খাইবেন? 

‘একটাখান। মিষ্টি পান। জর্দা দেওয়া নাই। 

অনিল পান হাতে নিল। ভদ্রমহিলা সুখী সুখী গলায় বললেন, ভাইয়ের বিয়ায় যাইতেছি। শ্রাবণ মাসের দশ তারিখ বিবাহ। 

‘আমি শুনেছি। ‘মেয়ে খুব সুন্দরী । ছবি আছে দেখবেন ? ‘দেখি । ‘ও পাপিয়া তাের নতুন মামীর ছবি দেখা। 

পাপিয়া ছবি দিল। পাপিয়ার মা হাসি মুখে বললেন, ‘গায়ের রঙ খুব পরিষ্কার, ছবিতে তেমন আসে নাই। পাপিয়া বলল, তুমিতাে দেখ নাই মা। সব শােনা কথা। 

‘ছােট চাচা দেখছেন। ছােট চাচা বলছেন— বক পাখির পাখনার মতাে গায়ের রঙ। ছােট চাচা মিথ্যা বলার মানুষ? 

অনিল ছবির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। কি সুন্দর ছবি। গােলগাল মুখ । মাথাটা বা পাশে হেলানাে। বেণী বাধা চুল। টানা টানা চোখে রাজ্যের বিস্ময় ও আনন্দ। সামান্য ছবি এত কিছু ধরতে পারে ? 

‘সুন্দর না ? 

হ্যা সুন্দর। খুব সুন্দর। আমার ভাইও সুন্দর। ও পাপিয়া তাের মামার ছবি দেখা। 

পাপিয়া আগ্রহ করে মামার ছবি বের করল। অনিলের এই ছবিটি দেখতে ইচ্ছে করছে না। অসম্ভব রূপবতী তরুণীর পাশে কাউকে মানাবে না। পৃথিবীর সবচে’ রূপবান তরুণকেও তারপাশে কদাকার লাগবে। কি আশ্চর্য মেয়েটাকে এখন অতসীদির মতাে দেখাচ্ছে। অবিকল অতসীদির হাসির মতাে হাসি। অতসীদির চোখের মতাে চোখ। অতসীদির মতােই গােল মুখ। কে জানে হয়ত এই মেয়েটার নামও অতসী। অনিল পাপিয়াকে বলল, “তােমার নতুন মামীর নাম কি ?

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

পাপিয়া হাসতে হাসতে বলল, ‘অহনা।’ কি নাম বললে, অহনা?’ জ্বি। আমার আব্বা বলে– গহনা। হি হি হি…’ অনিলের এই সুখী পরিবারটিকে ভালাে লাগছে। অসম্ভব ভালাে লাগছে। 

সবচে’ দুঃখের সময় আনন্দময় কল্পনা করতে হয়। সুরেশ বাগচী বলতেন, বুঝলি অতসী মানুষ কি করে জানিস ? সুখে সময় সে শুধু সুখের কল্পনা করে। একটা সুখ তাকে, দশটা সুখের কথা মনে করিয়ে দেয়। দুঃখের সময় সে শুধু দুঃখই কল্পনা করে। এটা ঠিক না। উল্টোটা করতে হবে। 

অতসীদি বলতাে, তুমি বুঝি তাই কর ? 

‘সব সময় পারি না। তবে চেষ্টা করি। খুব আনন্দের কিছু যখন ঘটে তখন তাের মার কথা ভাবি। ইস বেচারী এই আনন্দ দেখার জন্যে নেই…তখন চোখে জল এসে যায়।’ 

‘খুব আনন্দের কিছু কি তােমার জীবনে ঘটে বাবা?’ ‘অবশ্যই ঘটে। কেন ঘটবে না।’ 

‘আমিতাে আনন্দের ঘটনা কিছু দেখি না। কবে ঘটল বলতাে ? একটা ঘটনা বল।’ 

ঐততা সেদিনের কথাই ধর। তােরা দুই ভাই বোেন খুব হাসাহাসি করছিস। দেখে আমার মনটা আনন্দে ভরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তাের মার কথা ভাবলাম। একা একা খানিকক্ষণ কাঁদলাম। 

বাবা, তােমার কি কোন গােপন দুঃখ আছে ? 

সুরেশ বাগচী হাসতে হাসতে বললেন, না মা আমার সব প্রকাশ্য দুঃখ । তাের বুঝি সব গােপন দুঃখ ? 

অতসী হ্যা সূচক মাথা নাড়ল। তারপরেই খিল খিল করে হেসে ফেলল। অনিল তার দিদির অনেক গােপন দুঃখের খবর জানা না। শুধু একটি জানে। সেই দুঃখটা ভয়াবহ ধরনের। এই দুঃখের কথা পৃথিবীর কাউকেই জানানাে যাবে  কোনদিন এটা নিয়ে আলােচনাও করা যাবে না। এই দুঃখ দূর করারও কোন উপায় নেই। কিছু গােপন দুঃখ আছে যা চিরকাল গােপন থাকে। অতসীদির বিয়ের কথা উঠলে সে বলবে, আমি কিন্তু বিয়ে করব না। শুধু শুধু তােমরা চেষ্টা করছ।

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

‘কেন করবে না দিদি?’ 

‘কেন করব না সে কৈফিয়ত তাের কাছে দিতে হবে ? তুই কে? তুই কি আমার গুরু মশাই? করব না করব না, ব্যাস।’ 

বিয়ে যদি ঠিকঠাক হয়ে যায় তুই কি করবি? ‘আমি তখন ছেলেটাকে দশ লাইনের একটা চিঠি লিখব। বিয়ে ভেঙে 

যাবে।’ 

অনিল ঠিক জানে না তবে তার অনুমান অতসীদি এ রকম একটা চিঠি লিখেছে। নয়ত নেত্রকোনার উকিল সাহেবের ছেলের সঙ্গে বিয়ে ভেঙে যেত না। সব ঠিক ঠাক। ওদের মেয়ে খুব পছন্দ। পণের কোন ব্যাপার নেই। উকিল সাহেব বিনা পণে ছেলের বিয়ে দেবেন। তাদের বংশের এরকম ধারা। ছেলের মা এবং বােনরা এসে আশীর্বাদ করে গেল। ছেলের মা অতসীকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলেন এবং বললেন, এই মেয়েটাতাে মানুষ না। এতাে দেবী দুর্গা। এখন থেকে আমরা এই মা’কে আমি দুর্গা ডাকব।’ 

সেই বিয়ে ভেঙে গেল। ছেলে সুরেশ বাগচীকে লােক মারফত একটি চিঠি পাঠাল। তাতে লেখা প্রণাম নিবেন। বিশেষ কারণে আমার পক্ষে বর্তমানে বিবাহ করা সম্ভব হইতেছে না। আপনি কিছু মনে করিবেন না। আমি অত্যন্ত দুঃখিত। সুরেশ বাগচী বিস্মিত হয়ে বললেন, ব্যাপারটা কি ? আমিতাে কিছুই বুঝলাম না। ব্যাপারটা কি ? 

বাস হর্ন দিচ্ছে। যাত্রীরা সচকিত হয়ে উঠেছে। সামনেই মিলিটারী চেক পােস্ট। দু’জন মিলিটারী রেইন কোট গায়ে রাস্তায় দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টি থেমে গেছে। পরিষ্কার দিন। মুক্তি চেঁচিয়ে কাঁদছে। তাকে কিছুতেই সামলানাে যাচ্ছে না। মুক্তির বাবা মুক্তিকে কাঁধে নিয়ে দুলাচ্ছেন। কান্না কমার বদলে তাতে তার কান্না আরাে বেড়ে যাচ্ছে।

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

স্যুট পরা দ্রলােক আবার বমি করছেন। এবার বমি করছেন গাড়ির ভেতর। তিনি গাড়ি প্রায় ভাসিয়ে দিয়েছেন। বিকট শব্দ হচ্ছে। কালাে পােশাক পরা একজন মিলিশিয়া উঁকি দিল। তার চেহারায় যথেষ্ট মায়া আছে। গলার স্বরও কোমল, অথচ সে কুৎসিত একটি বাক্য বলল, ‘শােয়ার কি বাচ্চা, সব উতারাে।’ ছাব্বিশ জন যাত্রী এই বাসে। ছাব্বিশ জনের ভেতর একজনও বলতে পারল না কেন অকারণে গালি দিচ্ছেন।

সবাই এমন মুখ করে আছে যেন এই গালি তাদের প্রাপ্য। শুধু আয়ুব আলির চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। আয়ুব আলির স্ত্রী চাপা গলায় বললেন, ‘তােমার পায়ে ধরি। তুমি উল্টাপাল্টা কিছু বলবা না। আমি তােমার পায়ে ধরি।’ ভদ্র মহিলা সত্যি সত্যি স্বামীর পা চেপে ধরলেন। প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন, ‘পুলাপানের কসম লাগে, উল্টাপাল্টা কিছু বলবা না।’ 

মহিলা যাত্রী ছাড়া বাকি সবাইকে লাইন করে দাঁড় করানাে হয়েছে। স্যুট পরা দ্রলােক শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। তিনি ঝকঝকে স্যুট নিয়ে কাদার। উপর বসে আছেন। তার হেঁচকি উঠছে। ব্রিফকেস এখনাে তার হাতে ধরা । 

অনিল লক্ষ্য করল তল্লাশির পুরাে ব্যাপারটা মিলিটারীরা এক ধরনের খেলার মতাে নিয়েছে। মজার কোন খেলা, যেখানে থেকে আনন্দ পাওয়া যায়। অন্তত এরা সবাই যে আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করছে তা বােঝা যাচ্ছে। সবার ঠোটের কোণেই হাসি কিংবা হাসির আভাস। এরা নিজেরা তীব্র ভয়ের মধ্যে আছে।

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

অন্যের ভয় থেকে আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা তারা করবে, তা বলাই বাহুল্য। ভীত মানুষকে আরাে বেশি ভয় পাইয়ে দেবার প্রবণতাও মানুষের মজ্জাগত। মিলিটারী দলের প্রধান একজন অল্পবয়স্ক অফিসার। তিনি দূরে একটা টুলে বসে আছেন। এখানে কি হচ্ছে না হছে তা নিয়ে তার মাথা ব্যথা নেই, এরকম একটা ভাব।

তল্লাশি দলের সঙ্গে একজন দোভাষী থাকে। এদের সঙ্গেও আছে। এই দোভাষী বিহারী নয়, বাঙালি। চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ বছর বয়েসী একজন মানুষ। সার্ট প্যান্ট পরা। চোখে চশমা। তাকেও খুব হাসিখুশি দেখাচ্ছে। সে খানিকটা দূরে বসে কলা খাচ্ছে। তার সামনে একটা মগ। মগভর্তি চা। | তল্লাশি দল স্যুট পরা মানুষটার কাছে চলে এল। তাকেই যে প্রথম জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তা বােঝাই যাচ্ছিল। 

একজন সুবাদার শীতল গলায় বলল, ‘ডর কেউ? 

লােকটি সুন্দর উর্দুতে বলল, ভয় পাচ্ছি না। আমার শরীর খারাপ। কয়েকবার বমি হয়েছে। এই জন্যে দাড়াতে পারছি না।’ 

কথাবার্তা সব উর্দুতে হল। ‘তুমি বাঙালি ? “জি জনাব বাঙালি। 

নাম ?  

আবু হােসেন। কলেমা জান ? জি। চার কলমা জানি।’ নামায পড়? নামায পড়ি। উর্দু কোথা শিখেছ ? ‘আমরা ছােট বেলায় রাওয়ালপিন্ডি ছিলাম। বাবা রেলওয়েতে কাজ করতেন। ‘বাবার নাম কি ? 

ইসমাইল হােসেন।’ ‘তুমি পাকিস্তান ভালবাস? ‘জুি বাসি।” ‘ব্রিফকেসে কি আছে?’ ‘কিছু কাগজপত্র আছে। জমির দলিল। ‘ব্রিফকেস খােল। 

ব্রিফকেসের চাবি আনতে ভুলে গেছি জনাব।’

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

সুবাদারের মুখ শক্ত হয়ে গেল । সে পাশে দাড়িয়ে-থাকা একজনকে কি যেন বলল। উর্দু নয় অন্য কোন ভাষায়। সম্ভবত পশতু। সে ব্রিফকেস নিয়ে গেল। ব্রীফকেস ভাঙা হতে লাগল। পুরাে দলটি গভীর আগ্রহে ব্রিফকেস ভাঙা দেখছে। তাদের সবার চোখে মুখে স্পষ্ট আনন্দের ছাপ। টুলে বসে থাকা অফিসারও আগ্রহ বােধ করছেন। তিনি উঠে এসেছেন ব্রীফকেস ভাঙা দেখতে। স্যুট পরা লােকটি আবার বমি করছে। হড় হড় করে বমি। তার বমির দৃশ্যেও মিলিটারীর দল আগ্রহ বােধ করছে। এতেও যেন তারা খানিকটা মজা পাচ্ছে। 

ব্রিফকেস ভাঙা হয়েছে। একটা জমির দলিল, কিছু কাগজপত্র, দাড়ি সেভ করার যন্ত্রপাতি, একটা গায়ে মাখা সাবান। খামে ভরা কিছু টাকা। উল্লেখযােগ্য পরিমাণের নয়। ছয় সাত শ’ হবে। মিলিটারীর তল্লাশি দলটির আশা ভঙ্গ হল । অফিসারটিও বিরক্ত হয়েছেন। তিনি কঠিন গলায় বললেন, এ মুসলমান কি-না ভালােমতাে জিজ্ঞেস কর। চেহারা হিন্দুর মতাে। 

অফিসারের কথায় দলটির মধ্যে আবার খানিকটা আগ্রহ দেখা গেল। সুবাদার বলল, কলেমায়ে শাহাদৎ বল।’ 

আবু হােসেন গড় গড় করে কলেমায়ে শাহাদৎ বলল । ‘খান্না হয়েছে ? ‘জি।’ ‘প্যান্ট খােল। 

আবু হােসেন অতি দ্রুত খুলে ফেলল। যেন এর জন্যেই সে অপেক্ষা করছিল। প্যান্ট খুলে দেখাতে পেরে যেন খানিকটা আরাম পাচ্ছে। বিপদ বুঝি দশজন- ২১ 

বা কাটল। সুবাদার বলল, যাও ক্যাপ্টেন সাহেবকে দেখিয়ে আস। আবু হােসেন প্যান্ট খােলা অবস্থাতেই ক্যাপ্টেন সাহেবের সামনে গেল। ক্যাপ্টেন সাহেব উদাস দৃষ্টিতে একবার তাকালেন, তারপর হাত ইশারায় চলে যেতে বললেন। আবু হােসেন তার ভাঙা ব্রিফকেস নিয়ে বাসে উঠল এবং তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। এমন শান্তির ঘুম সে অনেকদিন ঘুমায় নি।

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

জিজ্ঞাসাবাদ এখন বেশ তাড়াতাড়ি হচ্ছে। দুএকটা কথা জিজ্ঞেস করেই ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। কারাের প্যান্ট খােলা হচ্ছে না। একজনকে শুধু বলা হল একশ বার কানে ধরে উঠ- বােস করতে। এবং যতবার উঠে দাঁড়াবে ততবার বলবে, ‘জয় বাংলা’। 

শুধুমাত্র একজন যাত্রীর জন্যে এটা কেন করা হল তা বােঝা যাচ্ছে না। সম্ভবত মজা করার জন্যেই। উঠ-বােসের পর্ব সুষ্ঠুভাবে অগ্রসর হচ্ছে। যাকে উঠ-বােস করতে বলা হয়েছে, সে এই কাজটি বেশ আগ্রহ নিয়ে করছে বলে মনে হল। 

ক্যাপ্টেন সাহেব তেমন আগ্রহ বােধ করছেন না। তার চোখ বিষন্ন । 

অনিল এবং আয়ুব আলি লাইনের শেষ মাথায়। সুবাদার সাহেব অনিলের পাশে এসে দাঁড়াল। বাঙালি দোভাষীর চা খাওয়া শেষ হয়েছে। সে এসে সুবাদারের কাছে দাঁড়াল। 

“কি নাম?’ ‘অনিল। অনিল বাগচী।’ 

হতভম্ব আয়ুব আলি বললেন, ঠিক নাম বলেন। ঠিক নামটা স্যারকে বলেন। স্যার ইনার আসল নাম মােহাম্মদ সহসিন। বাপ মা আদর করে অনিল ডাকে। 

তােমার নাম মােহাম্মদ মহসিন ?’ 

অনিল চুপ করে রইল। আয়ুব আলি বড়বড় করে বললেন, আমার খুবই পরিচিত স্যার। দূর সম্পর্কের রিলেটিভ হয়। খাটি মুসলমান। 

বাঙালি দোভাষী বলল, “অনিল হইল হিন্দু নাম। 

আয়ুব আলি হাসি মুখে বললেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারির জন্যে এটা হয়েছে ভাইসাহেব। বাপ মারা আদর করে ছেলেমেয়েদের বাংলা নাম রাখে। যেমন ধরেন— সাগর, পলাশ। ছেলেপুলের তাে কোন দোষ নাই, বাপ মায়ের দোষ। 

বাঙালি দোভাষী এবার যথেষ্ট আগ্রহ বােধ করছে বলে মনে হল। সে ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে বলল, এই দুইটাই হিন্দু। মিথ্যা কথা বলতেছে। 

অনিল বলল, ইয়েস স্যার। ‘তুমি মুক্তিবাহিনীর লােক?’ 

না স্যার। ‘আওয়ামী লীগ? 

না। 

মুজিবের পা-চাটা কুকুর। মুজিবের পা কখনাে চেটে দেখেছ? কেমন লাগে পা চাটতে?’ 

অনিল চুপ করে রইল। ক্যাপ্টেন বললেন, ‘একে ঘরে নিয়ে যাও।’

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

আয়ুব আলি ব্যাকুল গলায় বললেন, স্যার আমার একটা কথা শুনেন স্যার। যে কেউ একবার কলেমা পড়লেও মুসলমান হয়ে যায়। এটা হাদিসের কথা। মহসিন কলেমা জানে। তারে জিজ্ঞেস করেন। সে বলবে।’ 

ক্যাপ্টেন আয়ুব আলির দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বললেন, তুমি নিজে মুসলমান? 

‘জি জনাব, মুসলমান। সুন্নি মুসলমান। আমরা পীর বংশ। আমার দাদা মরহুম মেরাজ উদ্দিন সরকার পীর ছিলেন। 

বাঙালি দোভাষী বলল, এই হারামীও হিন্দু। বিরাট ধড়িবাজ।’ | আয়ব আলির চোখ শক্ত হয়ে গেল। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে বাসের দিকে তাকালেন। বাস থেকে এখানকার কথাবার্তা শােনা যাচ্ছে না। তবে বাসের প্রতিটি মানুষ ভীত চোখে এই দিকেই তাকিয়ে আছে। আয়ুব আলি সাহেবের স্ত্রী এবং বড় মেয়েটি কাঁদতে শুরু করেছে। সবচে’ ছােট মেয়েটি জানালায় হাত বাড়িয়ে ভীত গলায় বলছে– আব্ব আস, আব্ব আস। 

বাঙালি দোভাষী আয়ুব আলির দিকে তাকিয়ে বলল, প্যান্ট খােল। প্যান্ট খুলে দেখা খৎনা হয়েছে কিনা। স্যারকে দেখা।’ 

আয়ুব আলি কঠিন গলায় বললেন, ‘প্যান্ট যদি খুলতে হয় তাহলে আমি তাের মুখে পিসাব করে দেব। আল্লার কসম আমি পিসাব করব।’ 

অনেকক্ষণ পর ক্যাপ্টেন মনে হয় কিছুটা মজা পেলেন। তিনি শব্দ করে হেসে ফেললেন। ক্যাপ্টেনের সঙ্গে অন্যরাও হেসে ফেলল। শুধু বাঙালি দোভাষী হাসল না। সে অন্যদের হাসির কারণও ঠিক ধরতে পারছে না। সে বিরক্ত ও কুদ্ধ। ক্যাপ্টেন আয়ুব আলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যাও, গাড়িতে গিয়ে উঠ। 

আয়ুব আলি বললেন, স্যার মহসিন সাহেবকে নিয়ে যাই?’ ‘ও থাকুক। তােমাকে উঠতে বলেছি, তুমি উঠ।’

অনিল বাগচির একদিন শেষ:পর্ব

আয়ুব আলি ব্যথিত চোখে অনিলের দিকে তাকালেন। অনিল শান্ত গলায় বলল, আমার বড় বােন আছেন রূপেশ্বর হাই স্কুলের হেডমাস্টার সাহেবের বাড়িতে…’ 

আয়ুব আলি অনিলের কথা শেষ করতে দিলেন না। ছেলে মানুষের মতাে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আল্লাহ পাকের কসম খেয়ে বলতেছি, মাটির কসম খেয়ে বলতেছি, আপনার যদি কিছু হয় আমি আপনার বােনকে দেখব, যতদিন বাঁচব দেখব। বিশ্বাস করেন আমার কথা। বিশ্বাস করেন। ‘আমি আপনার কথা বিশ্বাস করছি। আপনি আমার বােনকে বলবেন, আমি ভয় পাই নাই। আর তাকে বলবেন আমি বলে দিয়েছি সে যেন তার পছন্দের ছেলেটাকে বিয়ে করে। কে কি বলে এটা নিয়ে সে যেন চিন্তা না করে।’ 

আয়ুব আলি গাড়িতে উঠলেন। তার স্ত্রী এবং ছেলেমেয়েদের কান্না আরাে বেড়ে গেল। বড় মেয়েটি বাবাকে জড়িয়ে ধরে আছে। সে থর থর করে কাঁপছে।  বাস ছেড়ে যাবার আগ-মুহূর্তে ক্যাপ্টেন সুবাদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, স্যুট পরা লােকটাকে রেখে দাও। ঐটাও বদমাশ। ওর কিছু একটা মতলব আছে— টের পাওয়া যাচ্ছে না।’ আবু হােসেন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে বাসের হ্যান্ডেল ধরে আছে। কিছুতেই তাকে টেনে নামানোে যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে তার গায়ে অসুরের শক্তি। জীবন থাকতে সে বাসের হ্যান্ডেল ছাড়বে না। আবু হােসেন হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে— 

ভাইসাহেব, আপনারা আমাকে বাচান। ভাইসাব, আপনারা সবে মিলে আমাকে বাঁচানাের চেষ্টা করেন।’ | আবু হােসেনকে নামানাে হয়েছে। সে হাত পা ছড়িয়ে রাস্তার পাশে পড়ে আছে। বাস ছেড়ে দিয়েছে। ক্যাপ্টেন হাই তুললেন। সুবাদারকে বলল, এই দু’জনকে নদীর পাড়ে নিয়ে যাও। 

‘এখন নিব? 

রাতে। রাতই ভালাে। ক্যাপ্টেন আবার হাই তুললেন। তার ঘুম পাচ্ছে। খুব জ্যোৎস্না হল সে রাতে। উথাল-পাথাল জ্যোৎস্নার ভেতর তারা অনিলকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আবু হােসেনকে নেয়া হচ্ছে না। কারণ তাকে নেয়ার প্রয়ােজন নেই। মুগ্ধ হয়ে জ্যোৎস্না দেখতে দেখতে অনিল যাচ্ছে।

দোভাষী বাঙালি যাচ্ছে তার পাশে পাশে। অনিল তাকে বলল, কি সুন্দর জ্যোৎস্না হয়েছে দেখেছেন? এই সৌন্দর্যের ছবি আঁকা সম্ভব নয়। সৌন্দর্ষের একটি অংশ আছে যার ছবি আঁকা যায় না। প্রচণ্ড জ্যোৎস্নার কারণেই বােধ হয় কাকদের ভেতরে এক ধরনের চাঞ্চল্য দেখা গেল। তারা ডাকতে লাগল– — কা কা । 

 

Read more

আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *