পাখির খেলা শুরু হয়েছে। খাঁচায় ছ’টা টিয়া পাখি নিয়ে পাখিওয়ালা ঢুকেছে। পাখিওয়ালার নাম খসরু। তার চেয়ে রােগা মানুষ বাংলাদেশে দ্বিতীয় কেউ আছে কি–না সন্দেহ। যখন স্টেজে দাঁড়ায় তখন মনে হয় আরবি অক্ষর আলীফ দাঁড়িয়ে আছে। খসরু পাতিলের তলার মতাে কালাে। মাথার সমস্ত চুল পেকে যাওয়ায় মেন্দি লাগিয়ে সে চুল রঙ করেছে। এখন তার মাথা ভর্তি লাল চুল। লাল এবং কালাের কিস্তুত চেহারা। এটা একদিক দিয়ে ভালাে, সার্কাসের লােকজনের চেহারা যত কিম্ভুত হবে তত ভালাে।
হারুন ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তার প্রথমেই মনে হলো খসরুর পােশাকটা ঠিক হয় নাই। সাধারণ শার্ট প্যান্ট পরে ঢুকেছে। প্যান্টটা ময়লা। পায়ে স্পঞ্জের স্যান্ডেল। পাখিওয়ালাকে পােশাক কিনে দিতে হবে। সে টিয়াপাখির খেলা দেখায়, তার পােশাক হবে টিয়া পাখির মতাে। সবুজ প্যান্ট, সবুজ শার্ট। মাথায় হলুদ টুপি। দূর থেকে দেখে তাকে যেন মনে হয় লম্বা একটা টিয়া পাখি ।
দর্শকমণ্ডলী! নারী–পুরুষ, শিশু–বৃদ্ধ, কিশাের–কিশােরী, যুবক–যুবতী। আমি পাখিওয়ালা। আমার নাম খসরু। টিয়া খসরু। আমি ছয়টা টিয়া পাখি নিয়ে এসেছি। খাঁচার ভিতরে আছে বলে দূর থেকে আপনাদের বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। দিলাম খাচা খুলে।
খাঁচা খােলা হলাে। ছয়টা পাখি নিমিষের মধ্যে খাঁচা থেকে বের হয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল। টিয়া খসরু শূন্য খাচা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যান্ড বাদকের দল কিছুক্ষণ তুমুল বাজনা বাজাল। বাজনা থামার পর খসরু বলল— খাচা খুলে দিলে খাঁচার পাখি উড়ে যায়। আর ফিরে আসে না। দেখি এদের কী অবস্থা! আয় আয়— সবুজ পক্ষী ঘরে আয়।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
খসরুর কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে পাখি উড়ে উড়ে এসে খাঁচায় ঢুকতে লাগল । খসরু পাখি গুনছে— এক–দুই–তিন–চার...
দর্শকদের তালি পড়তে শুরু করেছে। তালিরও একটা ব্যাপার আছে। দর্শকদের মধ্যে সার্কাসের নিজস্ব কিছু লােক আছে। বাবুর্চি আছে, বাবুর্চির হেল্পাররা আছে। তাদের কাজ হলাে প্রতিটা আইটেমের শেষে তালি শুরু করা । একজন শুরু করলে দশজন শুরু করে। সার্কাস জমে যায়। দৈ জমার জন্যে দৈ এর বীজ দিতে হয়। সার্কাস জমার জন্যে দিতে হয় হাততালির বীজ।
টিয়া খসরু আবার কথা বলা শুরু করেছে। তার গলার আওয়াজ ভালাে। এত দূর থেকেও পরিষ্কার শােনা যাচ্ছে। দর্শকমণ্ডলী! নারী-পুরুষ, শিশু–বৃদ্ধ, কিশাের–কিশােরী, যুবক–যুবতী, স্বামী স্ত্রী, লাইলী–মজনু অর্থাৎ প্রেমিক–প্রেমিকা... আপনারা খাওয়া–খাদ্য নিয়া মারামারি দেখেছেন। খাওয়া–খাদ্য নিয়া মানুষ মারামারি করে, জন্তু–জানােয়ার মারামারি করে। এক হাড়ি নিয়া দুই কুত্তার টানাটানি দেখেন নাই ? অবশ্যই দেখেছেন। অখন দেখবেন দুই পাখির খাদ্য নিয়া টানাটানির খেলা।
দু’টা টিয়া পাখি পাতলা একটা টোস্ট বিসকিটের দু’প্রান্ত ধরে উড়ছে। স্থির হয়ে উড়ছে, আবার চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে উড়ছে। দেখার মতাে দৃশ্য। হাততালি শুরু হয়েছে। হাততালির সঙ্গে শিস দেয়ার শব্দ আসছে। একজন মহিলা মাথার ঘােমটা ফেলে দিয়ে পাশের আরেক মহিলার গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, বুবু দেখছ, কী আচানক!
পাশের মহিলা বলল, এইগুলা কিছু না— ট্রেনিং। ট্রেনিং দিয়া বানাইছে। ট্রেনিং দিলে পশু–পক্ষী পারে না এমন কাম নাই। হারুন আগ্রহ নিয়ে মহিলাদের কথা শুনছে। কত ধরনের মানুষ কত ধরনের কথা বলে। কেউ কেউ জ্ঞানী, তাদের কাছে কোনাে খেলাই ভালাে লাগে না। আবার কিছু কিছু লােক আছে যা দেখে তাতেই মুগ্ধ হয়। এরা মুগ্ধ হবার জন্যেই আসে। এরাই প্রকৃত দর্শক। এদের খেলা দেখিয়ে আরাম আছে। এদের জন্যেই সার্কাস।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
ও বুবু দেখ দেখ— কারবার দেখ! পক্ষী খাওয়া–খাদ্য নিয়া ঝাপ্টা ঝাল্টি করে, এইগুলান কত দেখছি। হারুন মনে মনে বলল, দূর হারামজাদী, এই জিনিস তুই তাের জন্মে দেখস নাই। তাের ভাগ্য ভালাে তুই স্বাধীন বাংলা সার্কাসে ঢুকছস। টিয়া খসরু এখন শেষ খেলা দেখাচ্ছে।
সে হাত সােজা করে রেখেছে। ছ’টা পাখি তার হাতে বসা। এমনভাবে বসে আছে যেন এরা জীবন্ত পাখি না, এরা পুতুল। খসরু পাখিদের দিকে তাকিয়ে বলল, তােমাদের খেলা দেখে দর্শকরা খুবই মজা পেয়েছেন। ইনাদের সালাম দাও। ডানা তুলে সালাম দাও।
পাখিগুলির প্রত্যেকটি তাদের বাম দিকের ডানা খানিকটা তুলল। একটা ডান দিকেরটা তুলে ফেলেছিল, অন্যদের দেখে ভুল সংশােধন করল। দর্শকরা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল। খসরু বলল, এখন তােমরা ইস্কুলের ছাত্র। পড়া পার নাই। হােমওয়ার্ক কর নাই। মাস্টার শাস্তির হুকুম দিয়েছেন। এক ঠ্যাং–এ দাঁড়ানাের শাস্তি। দেখি এক ঠ্যাং–এ দাঁড়াও। পাখি ছ‘টাই এক ঠ্যাং–এ দাঁড়াল। তুমুল তালি পড়ছে। শিস বাজছে। সার্কাস জমে গেছে।
পাখির আইটেম মােটামুটি দুর্বল আইটেম। এই আইটেমেই যখন পার পেয়ে গেছে অন্যগুলাে উড়াল দিয়ে যাবে। খসরু ভালাে দেখিয়েছে। তাকে সবুজ একটা পােশাক বানিয়ে দিতেই হবে। পপলিনের সবুজ কাপড় পাওয়া গেলে কালই দরজির দোকানে বানাতে দেয়া হবে। হারুন তাঁবু থেকে বের হলাে। অজু করে দু‘রাকাত শােকরানা নামাজ পড়তে হবে।
রাতের খাওয়ার ব্যবস্থা কী তার খোঁজ নেয়া দরকার। ভালো কাজ–কর্মের পরে ভালাে খাওয়া দাওয়া দরকার। রাতে খিচুড়ি করতে বলা হয়েছিল। চাল–ডাল আর শজির খিচুড়ি। এখন মনে হচ্ছে সঙ্গে মাংস থাকা দরকার। খিচুড়ির সঙ্গে ঝাল গরুর মাংস। হাতির খোঁজও নেয়া দরকার। হাতি খাওয়া–দাওয়া কি শুরু করেছে ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
গােপনে হাত জোড় করে হাতিকে বলতে হবে, ভুল–ত্রুটি কিছু হলে ক্ষমা করে দাও। খাওয়া–দাওয়া কর। তুমি মারা পড়লে, আমি গরিব মানুষ, আমি জানে মারা পড়ব । আমার পুরা দল মারা পড়বে। হারুন মােটামুটি নিশ্চিত হাতি মানুষের কথা বােঝে। এবং সমস্ত পশু–পাখির মধ্যে হাতির অন্তরেই মায়া বেশি। হারুন নামাজে দাঁড়াবার আগে হাতির ঘরে যাওয়া ঠিক করল।
পর্দা ঘেরা জায়গায় হাতিকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। হাতি শুয়ে আছে। হাতির পাশে জামদানী বসে আছে। সে হাতির গুঁড়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। দৃশ্যটা হারুনের ভালাে লাগল। জামদানী নামের এই মেয়েটার অন্তরেও মহব্বত আছে। মহব্বত ছাড়া কিছু হয় না। সার্কাসের মতাে বড় একটা দল এক সঙ্গে রাখতে হলে সবার জন্যে সবার মহব্বত থাকতে হবে। মানুষ মায়া করবে পশুর জন্যে, পশু মায়া করবে মানুষের জন্যে। সবাই বাধা থাকবে মায়ার শিকলে ।
হারুন রাগি গলায় বলল, (নকল রাগ। আসমানী, জামদানী, পয়সা— এই তিন মেয়ের উপর সে কখনাে রাগ করে না। কিন্তু ভাব দেখায় সারাক্ষণ রেগে আছে।) তুমি এইখানে কী কর ? শাে টাইমে সবসময় তৈরি থাকতে হয়। তুমি তাে খেলার ড্রেসও এখনাে পর নাই।
জামদানী কিছু বলল না। চুপ করে রইল। শাে টাইমে নিজের ঘরে চুপচাপ বসে থাকবে। মনে মনে ইয়া মুকাদ্দিমু, ‘ইয়া মুকাদ্দিমু এইটা জপবে। ইয়া মুকাদ্দিমু’র অর্থ হলাে— ‘হে অগ্রসরকারী। তােমাদের খেলাটা রিস্কের খেলা। এই খেলায় মন স্থির রাখার জন্যে আল্লা খােদার নাম নিতে হয়। হাতির কাছে কী করতেছিলা ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
কিছু না। মেয়েছেলের হাতির ঘরে যাওয়া ঠিক না। তিনটা জায়গা আছে মেয়েছেলের জন্যে নিষিদ্ধ। পানের বরজ, হাতিশালা, আরেকটা জায়গার নাম মনে আসতেছে । মনে আসলে বলব। নিষিদ্ধ কী জন্যে ?
আরে কী যন্ত্রণা! নিষিদ্ধ কী জন্যে আমি জানি নাকি ? আমি তাে নিষিদ্ধ করি নাই। কথা বাড়াবা না। যাও, ঘরে যাও। দুই মিনিটের মধ্যে খেলার ড্রেসে তােমাকে দেখতে চাই। জামদানী ক্ষীণ গলায় বলল, হাতিটার কী হয়েছে আমি জানি। হারুন বিরক্ত গলায় বলল, ফাইজলামি কথা আমার সঙ্গে বলবা না।
আমি ফাইজলামি কথা একেবারেই পছন্দ করি না। তুমি হাতির ডাক্তার না । তুমি দড়ি খেলার খেলােয়াড়। তােমার কাজ দড়ির উপরে। হাতির শুড় হাতানী তােমার কাজ না। এই জগতে সব মানুষের আলাদা আলাদা কাজ দেয়া আছে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাজ ঠিকমতাে করবে। তাতে সংসার ঠিকমতাে চলবে । বুঝেছ ? জি। ঠিকমতাে বুঝেছ ? না এক কান দিয়ে ঢুকায়ে অন্য কান দিয়ে বার করে দিয়েছ ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
ঠিকমতাে বুঝেছি। ঠিকমতাে বুঝলে ভালাে। আবার বেশি বুঝে ফেলবা না। বেশি বুঝে ফেললে খারাপ। তােমার বড় বােন আসমানী, সে সময় সময় বেশি বুঝে । আমি খবর পেয়েছি সে বাবুর্চিকে গিয়ে বলেছে সে তার তিন বােনের জন্যে আলাদা রান্না করবে। তিনজনের জিনিসপত্র তারে যেন আলাদা করে দিয়ে দেয়া হয়। এইসব কী ফাইজলামি ? সার্কাসের দল হলাে একটা সংসার। সংসারে দুই–তিন জায়গায় পাক হয় না। এক জায়গায় পাক হয়। বুঝেছ ?
জি। ঠিকমতাে বুঝেছ ? জি। যাও, ঘরে যাও। দুই মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে থাক। দোয়াটা যে। বলেছিলাম মনে আছে ?
জি মনে আছে। বলাে দেখি। জামদানী ভীত গলায় বলল, মনে নাই। দোয়াটা হলাে ইয়া মুকাদ্দিমু। যাও, জপতে জপতে যাও। জামদানী চলে গেল । হারুন হাতির সামনে বসল। হাতি তাকিয়ে আছে তার দিকে। এত বড় একটা জানােয়ার অথচ কী পুতি পুতি চোখ । অথচ পেঁচার মতাে ছােট পাখির কী বিরাট দুই চোখ ? হারুন বলল, কীরে ব্যাটা, খাওয়া বন্ধ কী জন্যে ? রাগ করেছ ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
বলেই মনে হলাে ভুল হয়েছে। ব্যাটা হবে না। এটা মাদী হাতি। সার্কাসে কখনাে মর্দ হাতি রাখা হয় না। সব সময় মাদী হাতি রাখা হয়। মর্দ হাতি সময় সময় মাথা গরম করে, তখন তাদের সামলানাে কঠিন। মাদী হাতি কখনাে মাথা গরম করে না। হারুন বসে বসেই এক পা এগুলাে। নরম গলায় বলল, তােকে ব্যাটা বলেছি বলে মনে কষ্ট পাস নাই তাে? আদর করে ব্যাটা বলেছি। খাওয়া–দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিস কী জন্যে ?
তাের কী হয়েছে বল দেখি। কেউ কিছু বলেছে ? তাের যদি স্পেশাল কিছু খেতে ইচ্ছা করে তাহলে বল— ব্যবস্থা করি। তেঁতুল খাবি ? এক কেজি তেঁতুল এনে দেই। হারুন ভয়ে ভয়ে হাত বাড়াল। সে সার্কাস দলের মালিক। জন্তু–জানােয়ার নিয়েই তার কাজ। তারপরেও সে খুবই ভীতু ধরনের মানুষ। হাতির দিকে হাত বাড়াতে তার ভয় ভয় লাগছে। হাতির গায়ে হাত লাগার আগেই হাতি শব্দ করে নড়ে উঠল। হারুন লাফ দিয়ে সরে গেল। সাহস দেখানাের কোনাে দরকার নেই।
হারুন শােকরানা নামাজ অতি দ্রুত শেষ করল। তিন মেয়ের দড়ির খেলার সময় সে উপস্থিত থাকবে। আজ পর্যন্ত এমন কোনাে দিন যায় নি যে তিন মেয়ে দড়ির খেলা দেখাচ্ছে আর সে সেখানে উপস্থিত নেই। মেয়ে তিনটাকে সে নিজে খেলা শিখিয়েছে। প্রথম যখন তিনবােন এলাে তখন ছােটটার বয়স তিন বছর। তিনজনের একজনকে রাগ করে ধমক দিলে তিনজন মিলে একসঙ্গে কান্নাকাটি শুরু করে দিত। দেখে রাগও লাগত, আবার মায়াও লাগত।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
একজনের জ্বর হয়েছে কিছু খাবে না, বাকি দু’জনও খাবে না। একজনকে নতুন কাপড় কিনে দিলে সে পরবে না। তিনজনকেই কাপড় কিনে দিতে হবে। মেয়েগুলিকে নিয়ে হারুনকে খুব কষ্ট করতে হয়েছে। কষ্ট বৃথা যায় নাই। মানুষের কোনাে কষ্টই বৃথা যায় না। সার্কাসের দল টিকিয়ে রাখতে হবে মেয়ে তিনটার জন্যে। দল ভেঙে দিলে মেয়ে তিনটা যাবে কোথায় ?
এই তিন কন্যার যাবার জায়গা নেই। রাত এগারােটা। হারুন সরকারের ঘরের দরজা বন্ধ। ঘরের ভেতর সে আছে আর আছে বাবুর্চির এসিসট্যান্ট কালু। হারুন সরকার পা ছড়িয়ে বসেছে। কালু পা টিপে দিচ্ছে। খুব আয়ােজন করে পা টিপা হচ্ছে। একটা বাটিতে সরিষার তেল নেয়া হয়েছে। আরেকটা বাটিতে পানি। প্রথমে সরিষার তেল দিয়ে ডলা দেয়া হচ্ছে। সেখানেই পানি দিয়ে আবারাে ডলা হচ্ছে।
হারুন সরকারের পায়ে সমস্যা আছে। মাঝে মাঝে হাড়ির ভেতর যন্ত্রণা হয়। ভােতা ধরনের ব্যথা। কোনাে কোনাে দিন ভােতা ব্যথাটা শেষপর্যন্ত ভােতাই থাকে। কিন্তু মাঝে মধ্যে ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠে। আজ ব্যথা এখনাে সহনীয় পর্যায়ে আছে, তবে তা তীব্র ব্যথায় মােড় নিতে পারে। হারুন সরকার ভীত ভঙ্গিতে বসে আছে। ব্যথার গতি বােঝার চেষ্টা করছে।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
কালুর হাতের কাছে দড়ি আছে। ব্যথা তীব্র হয়ে গেলে দড়ি দিয়ে শক্ত করে পা পেঁচিয়ে বাঁধতে হবে। হারুনের হাতে কালার গ্লাস। গ্লাসে কেরু কোম্পানির জিন। কাসার গ্লাসে কেরু কোম্পানির জিন খাওয়া হারুন শিখেছে তার ওস্তাদ মনু মিয়ার কাছে। মনু মিয়া জিনের সঙ্গে এক দুই বিচি তেঁতুল দিয়ে দিত। জিনিসটা হতাে ভয়ঙ্কর। আজ তেঁতুল পাওয়া যায় নি। তেঁতুল ছাড়া জিন খেতে পানশা পানশা লাগছে। নেশা হবে বলে মনে হচ্ছে না। নেশা না হলে সমস্যা আছে। পায়ের ব্যথা সহ্য করা যাবে না।
কালু। জি। আজকের শাে কেমন হয়েছে ? ফাটাফাটি হইছে। যারা দেখছে মরনের আগের দিনও তারার মনে থাকব। আইটেম ভালাে হয়েছে কোনটা ?
সব আইটেম মারাত্মক হইছে। এ বলে আমারে দেখ, সে বলে আমারে দেখ ।তারপরেও তাে উনিশ–বিশ আছে। কালু গম্ভীর গলায় বলল, সবই বিশ। উনিশের কারবার আমরা করি না। হারুনের মন এমনিতেই ভালাে ছিল, কালুর কথায় মন আরাে ভালাে হলাে। হারুনের কেন জানি মনে হচ্ছে ব্যথাটা আজ খারাপের দিকে যাবে না। পায়ে দড়ি বাঁধার প্রয়ােজন পড়বে না।
খেলা খুব জমেছিল ?
কালু গম্ভীর গলায় বলল, মারাত্মক। বিলাতি সাহেবের চউক উঠে গেছিল মাথার চান্দিতে।
হারুন আগ্রহ নিয়ে বলল, বিলাতি সাহেব ছিল না কি ?
ছিল, দুইটা ছিল। ব্রিজ বানাইতেছে তার ইনজিনিয়ার। এর মধ্যে একজন বাংলা কথা পরিষ্কার বলতে পারে। সে আইসা হামকি ধামকি।
হামাকি ধামকি কী জন্যে ?
বলে কী, দড়ির ডেনজারাস খেলা দেখাও ? প্রটেকশন নাই। নিচে কেউ নাই। একসিডেন্ট হবে। মানুষ মারা যাবে। আমি মনে মনে বলি— যা ব্যাটা লালমুখা। মানুষ মারা গেলে আমরার যাবে । তাের বাপের কী ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৬
আমি তাে কিছু জানি না। এই ঘটনা কখন ঘটল ?
শাে শেষ হওনের পরে। ম্যানেজার সাহেবের সাথে কথা বলেছে। তােমরা শাে করতে পারবে না। স্টপ। এইসব হাবিজাবি বলতে ছিল।
কই আমাকে তাে ম্যানেজার কিছু বলল না।
সব কথা আপনের কানে তােলা হয় না। ম্যানেজার পেটের মধ্যে রেখে দেয়। পেট থেকে বাইর কইরা দু‘একটা কথা বলে, বাকিগুলা ভাত–তরকারির সাথে হজম কইরা ফেলে।
তাই না–কি ?
অবশ্যই। আমরার ম্যানেজারের পেট শক্ত। পেটে যেই জিনিস যায় সেইটাই হজম। আলীশান একটা খবর ম্যানেজারের কাছে আছে। ম্যানেজার আপনেরে দেয় নাই। দিব কি দিব না, তার নাই ঠিক।
কী খবর?
কালু চুপ করে গভীর মনােনিবেশে পা টিপছে। আলীশান খবর হুট করে বলে ফেললে খবরের মান থাকে না। হারুন বিরক্ত হয়ে বলল, খবরটা কী ?
বগা চাচার ইন্তেকাল হয়েছে!
বগা চাচাটা কে ?
জহির উদ্দিন সাবেরে সবেই ডাকে বগা চাচা। পাতলা পুতলা শইল, এই কারণে।জহির উদ্দিনটা কে ? ঠিক মতাে জবাব দে। কথা পেঁচাইস না। কথা পেঁচাইলে লাথ দিয়া বিছনা থাইক্যা ফালায়ে দিব।
Read more
