জি আচ্ছা। কালকের মধ্যে ঘণ্টা বানাতে হবে। ঘণ্টা আমি নিজের হাতে পরায়ে দিব। জি আচ্ছা। আমি হাতির বাচ্চাটা এখনাে দেখি নাই। এটা একটা আফসােস। কাল দেখবেন। অবশ্যই কাল দেখব। নিজের হাতে গলায় ঘন্টা পরায়ে দেব। এখন যাই। শাে টাইম হয়ে গেছে। আর দশটা মিনিট বসাে। গ্লাসটা শেষ করি। নতুন এক গ্লাস বানায়ে হাতে ধরায়ে দিয়ে যাও। তৈয়ব দাঁড়িয়ে পড়েছিল। আবার বসল। হারুন সরকার বলল— চারদিন পার করে দিলাম এখনাে কোনাে ভেজাল হয় নাই। বিরাট আশ্চর্য ঘটনা। ঠিক ?
ঠিক। তবে ছােট্ট ভেজাল বােধহয় হবে। কী ভেজাল ? বশির মােল্লা বলে এক লােক মনে হয় ঝামেলা করবে। সহজ ঝামেলা না। জটিল ঝামেলা। সে সার্কাস কিনে নিতে চায়। কোনখানের ফাজিল ? ভাটি অঞ্চলের। সে আমাকে দালাল ধরেছে। দালালি বাবদ দশ হাজার টাকাও দিয়েছে। বলাে কী ? আমি খোঁজ নিয়েছি— লােক ভয়ঙ্কর। সার্কাস কিনতে চায় কেন ?
মেয়ে তিনটার জন্যে কিনতে চায়। সার্কাসের যে মালিক সে মেয়ে তিনটারও মালিক, আর কিছু না। হারুন সরকার চিন্তিত গলায় বলল, আমার তাে নেশা কেটে যাওয়া ধরেছে। এটা তুমি কী বললা ? তৈয়ব কিছু বলল না। হারুন বলল, সমস্যার সমাধান কী ? তৈয়ব চুপ করেই রইল । হারুন সরকার বলল, ঐ লােকের নাম কী ? বশির মােল্লা।
আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব
তাকে বলাে যে সার্কাস আমি বেচে দিব। কিন্তু দাম এক কোটি টাকা। তখন বাপ বাপ করে দৌড় দিয়ে পালায়ে যাবে। তৈয়ব বলল, পালাবে না। সে এই টাকা খরচ করবে। আমি নিশ্চিত। হারুন সরকার চিন্তিত গলায় বলল, এখন করা যায় কী? ঘণ্টা পড়ে গেছে। শাে শুরু হবে। তৈয়ব আলী ওঠে দাঁড়াল। রাত দু’টা বাজে। পয়সা পা ঝুলিয়ে বিছানায় বসে আছে। স্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙেছে।
এখন আর ঘুম আসছে না। স্বপ্নটা তেমন অদ্ভুত না। তার জন্যে সাধারণ স্বপ্ন। সে প্রায়ই দেখে। তবে আজকের স্বপ্নটা একটু অন্যরকম। সে দেখেছে দড়ির খেলা হচ্ছে, হঠাৎ ব্যালেন্স হারিয়ে সে দড়ি থেকে পড়ে গেল। শাঁ শাঁ শব্দ হচ্ছে, সে নিচে নামছে নিচে নামছে। চারদিক থেকে চিৎকার— বাঁচাও বাঁচাও। এই পর্যন্ত স্বাভাবিক স্বপ্ন। পয়সা নিয়মিতই এই স্বপ্ন দেখে ।
স্বপ্নের পরের অংশটা অস্বাভাবিক। স্বপ্নের মধ্যে সে শুনল ভট ভট শব্দ হচ্ছে। নিচে তাকিয়ে দেখে বিশাল সমুদ্র। সে পড়ে যাচ্ছে সমুদ্রে। ভট ভট শব্দটা স্পিড বােটের। তাকে বাঁচানাের জন্যে নি পাের্টার স্পিড বােট নিয়ে ছুটে আসছে।পয়সার স্বপ্ন এই পর্যন্ত। সে বাঁচল না–কি সমুদ্রে তলিয়ে গেল সেটা আর দেখা হলাে না। পয়সা। কী হয়েছে ? পয়সা জবাব দিল না। আসমানী বলল, তুই কাঁদছিস কেন ?
আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব
পয়সা গালে হাত দিয়ে দেখল গাল ভেজা। তার চোখ দিয়ে যে পানি পড়ছে এটা সে নিজেও জানে না। একটা ব্যাপার শুধু জানে তার খুব একলা লাগছে। যেন সে এখন আর তিন বােনের একজন না। সে আলাদা। আপা । কী ? কাল সকালে আমি কিন্তু ঐ বিদেশী সাহেবের কাছে বেড়াতে যাব। ঠিক আছে তােকে নিয়ে যাব। তােমরা যাবে না আপা, আমি একা যাব। | আসমানী ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা, তাের যদি ভালাে লাগে তুই একাই যাবি।
তাঁবুর বাইরে পায়ের আওয়াজ। কে আসবে এত ভােরে ? ভিক্ষুকশ্রেণীর ছেলেপুলে আগে এরকম আসত। তাঁবুর‘ পাশে ঘুরঘুর করত। ফেলে দেয়া বিয়ারের ক্যান, কোকের ক্যান নিয়ে যেত। এমন কি সিগারেটের খালি প্যাকেটের প্রতিও তাদের আগ্রহ। ইদানীং সিকিউরিটি টাইট হয়েছে।
বিদেশীদের তাঁবুর পাশে কাউকে আসতে দেয়া হয় না। তাহলে এত ভােরে কে আসবে ? রহমত উল্লাহ বাবুর্চি মগ ভরতি গরম কফি নিয়ে এসে ঘুম ভাঙায় । সেই সময়ও হয় নি। ঘড়িতে বাজছে সাতটা। বাবুর্চির আসার সময় ঠিক আটটায়। নি পাের্টার বলল, Who is there ? কে ?
পয়সা ক্ষীণ স্বরে বলল, আমি। নি পাের্টার তৎক্ষণাৎ তাঁবুর বাইরে এসে চিন্তিত গলায় বলল, তুমি ? Is anything wrong? কোনাে বিপদ হয়েছে ? পয়সা বলল, না। এসাে, ভেতরে এসাে।।
আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব
পয়সা তাঁবুর ভেতর ঢুকল। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে তার খুবই অস্বস্তি লাগছিল। সবাই কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছিল। তাঁবুর ভেতর ঢুকে সেই অস্বস্তি পুরােপুরি কেটে গেল। সার্কাসের মেয়ে এমনিতেই তাঁবুর ভেতর স্বস্তি বােধ করে। তাদের জীবনই কাটে তাঁবুতে। তার উপর এই তাবুটা নি পাের্টারের। অন্য কারাের না।মিস কয়েন, ভােরবেলা তােমাকে দেখে ‘বিস্ময় পেয়েছি।
পয়সা বলল, আমি ভােরবেলা হাঁটতে বের হয়েছিলাম। তখন ভাবলাম আপনার তাঁবুর পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন দেখে যাই আপনি কী করছেন । নি পাের্টার বলল, তােমার অন্য দু’বােন কোথায় ? ওরা তােমার সঙ্গে হাঁটতে বের হয় নি ?
মিস কয়েন, তুমি যে এই ভােরবেলা হাঁটতে বের হয়েছ এটা ঠিক না। তােমাদের দেশের মেয়েরা এত ভােরে একা একা হাঁটতে বের হয় না। আমি আমাদের দেশের অন্য মেয়েদের মতাে না। আমি আলাদা। তুমি আলাদা কেন ? আমি সার্কাসের মেয়ে এই জন্যে আমি আলাদা।
নি পাের্টার বলল, আচ্ছা তাহলে আমার ত্রুটি হয়েছে। তুমি সকালে মর্নিংওয়াক করতে বের হয়েছিলে। হঠাৎ মনে হলাে— বিদেশী সাহেবের সঙ্গে কফি খাব। তখন চলে এসেছ। হ্যা তাই। ‘ কফি খাবার জন্যে আটটা বাজা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কফি আসবে আটটায়। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারবে?
আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব
পয়সা জবাব দিল না। সে তার মাথায় প্যাচানাে নীল রঙের স্কার্ফটা খুলে ফেলল। আঁকি দিয়ে মাথার চুল ঠিক করল। তার খুবই অদ্ভুত লাগছে। তার কেন জানি মনে হচ্ছে এই তাবুটাই তার ঘরবাড়ি। মিস কয়েন, আমার মনে হয় তুমি আমাকে কিছু বলতে এসেছ। যা বলতে এসেছ বলে ফেল।
পয়সা বলল, আপনার চোখের যে নীল রঙ সেটা সব সময় এক রকম থাকে । কখনাে বাড়ে কখনাে কমে। এটা কি আপনি জানেন ? তুমি কি এই কথাটাই বলতে এসেছ ? হা । চোখের নীল রঙ কি তােমার পছন্দ ? তােমার কী রঙ পছন্দ? কালাে। আচ্ছা বেশ, আমি চোখ কালাে করে ফেলব। পয়সা বিস্মিত হয়ে বলল, কীভাবে?
কালাে রঙের কনট্যাক্ট লেন্স পরলেই চোখ কালাে হয়ে যাবে। আবার ধর তুমি যদি নীল রঙের কোনাে কনট্যাক্ট লেন্স পর তাহলে তােমার চোখ... পয়সা আগ্রহের সঙ্গে বলল, দিন আমার চোখ নীল করে। দেখি নীল চোখে আমাকে কেমন লাগে । আমার সঙ্গে কনট্যাক্ট লেন্স নেই। লেন্স লাগানাের জন্যে ঢাকায় যেতে হবে। আচ্ছা আমি ব্যবস্থা করব। কবে ব্যবস্থা করবেন ?
যত দ্রুত পারি ব্যবস্থা করব । শােন মিস কয়েন, একটু আগে তুমি বলছিলে নীল রঙ তােমার পছন্দ না। এখন আবার বলছ তােমার নিজের চোখ নীল করতে চাও। ব্যাপারটা কী বলাে তাে? পয়সা বলল, একটু আগে আমি মিথ্যা কথা বলছিলাম। নীল রঙ আমার পছন্দ।নি পাের্টার বলল, মিথ্যা কথা দিয়ে দিন শুরু করলে সারা দিন মিথ্যা কথা বলতে হয়, এটা কি তুমি জানাে ? না ।
আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব
এটা হলাে আমার দাদিমার কথা। আমার ধারণা কথাটা ঠিক। আমি অনেকবার লক্ষ করেছি যেদিনই আমি সকালে মিথ্যা কথা বলেছি, সেদিন ঘুমুতে যাবার আগ পর্যন্ত আমাকে মিথ্যা কথা বলতে হয়েছে। এসাে মিস কয়েন, একটা চুক্তি করি। তুমি আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবে না। যা জিজ্ঞেস করি তার সত্যি জবাব দেবে। আমি সব সময় সত্যি কথা বলি, শুধু আপনার সঙ্গেই মিথ্যা বলি। কেন ? আমি জানি না কেন ? আমার ধারণা তুমি জানাে। , আমি জানি না। এই তাে আবার মিথ্যা কথা বলছ।
পয়সা হেসে ফেলল। কোনাে কারণ নেই অথচ তার কী যে আনন্দ লাগছে! একটা বড় সমস্যা হয়েছে তার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। সাহেবের সামনে কেঁদে ফেলা মােটেই ঠিক হবে না। ব্যাটা একগাদা প্রশ্ন করবে। সত্য কথা বলা হচ্ছে –কি মিথ্যা বলা হচ্ছে এই নিয়ে ঝামেলা করবে। পয়সার যে কাজটা করতে হবে তা হচ্ছে ব্যাটা যাতে কিছু বুঝতে না পারে সেইভাবে মাথার স্কার্ফটা হাতে নিতে হবে। সেই স্কার্ফ মাথায় জড়াবার সময় কৌশল করে এক ফাঁকে চোখ মুছে ফেলতে হবে। সেটা কি সম্ভব হবে। পয়সা, তুমি কাঁদছ কেন ? কাদছি না।
অবশ্যই কাঁদছ। তােমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। কেন কাঁদছ ? জানি না কেন কাঁদছি। অবশ্যই তুমি জানাে। জানলে জানি। আপনার কী ? আমাকে বলবে না ? , আমি বলব না। আটটা বেজে গেছে। বাবুর্চি কফি নিয়ে এসেছে। সে এমনভাবে পয়সার দিকে তাকাচ্ছে যেন চোখের সামনে ভূত দেখছে। সার্কাসের একটা মেয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের ঘরে বসে আছে। ভেউ ভেউ করে কাঁদছে। এর মানে কী ?
আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব
নি পাের্টার বলল, রহমত উল্লাহ, তুমি আরেক কাপ কফি নিয়ে এসাে। মিস কয়েন আমার সঙ্গে নাশতা করবে সেই ব্যবস্থা কর। আজ আমার সাইটে যেতে দেরি হবে এই খবরটা দিয়ে এসাে। আর শােন, তুমি এক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছ কেন ? কারাে দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সে খুব অস্বস্তি বােধ করে। এবং এটা অদ্রতা।
রহমত উল্লাহ পয়সার মুখ থেকে চোখ না নামিয়েই বলল, জি স্যার। পয়সা নিজেকে সামলে নিয়েছে। সে এখন সহজ এবং স্বাভাবিক। গুট গুট করে গল্প করছে। হাসছে। যেন এই তাবুই তার ঘরবাড়ি। গল্প শেষ করেই সে যেন তাবু গুছাতে শুরু করবে। ময়লা কাপড় ধােয়ার জন্যে আলাদা করবে।
পয়সা বলল, আচ্ছা আপনি কি লক্ষ করেছেন আমরা তিন বােন যখন দড়ির খেলা দেখাই তখন একটা সময় তিন বােন দড়ির মাঝামাঝি চলে আসি এবং কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। তখন আমাদের তিন বােনেরই চোখ বন্ধ থাকে। আমি লক্ষ করি নি। সার্কাস দেখতে আরেকদিন যখন আসবেন তখন লক্ষ করবেন।
অবশ্যই লক্ষ করব। আমরা তিন বােন চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি কেন জানতে চান ? হ্যা, জানতে চাই। আমরা তিন বােন তখন আল্লাহর কাছে একটা প্রার্থনা করি। আমরা আল্লাহকে বলি— আল্লাহপাক, তুমি আমাদের বাবা–মা’কে ফিরিয়ে এনে দাও। আবার যেন আমরা এক সঙ্গে হতে পারি। তােমার বাবা–মা কোথায় গেছেন?
Read more
