ট্রাভেল এজেন্টের রােবট গলার মেয়েটি বলল, আগামী পনের দিন বুকিং পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। সামারে ইউরােপ যাবার টিকিট কনফার্ম করা কঠিন। দলবেঁধে টুরিস্টরা যাচ্ছে। তবে তােমাকে আমি ওয়েটিং লিস্টে রেখে দিচ্ছি। কিছু পাওয়া গেলে জানাব।

অনেকদিন পর লিলিয়ান একা একা ঘুমুতে গেল। এবং আশ্চর্য অনেকদিন পর ভয়ংকর স্বপ্নটা সে আবার দেখল। এবারের স্বপ্ন আরাে স্পষ্ট। যেন স্বপ্ন না পুরাে ব্যাপারটা বাস্তবে ঘটে যাচ্ছে। সে দেখল – বিশাল প্রাচীন শ্যাওলা পরা এক
অট্টালিকা। সে সিড়ি বেয়ে উঠছে। লােহার প্যাচানাে সিড়ি। সে উঠেই যাচ্ছে উঠেই যাচ্ছে। সিড়ি শেষ হচ্ছে না। হঠাৎ সিঁড়ি শেষ – নিচে নামতে চেষ্টা করল। কি আশ্চর্য নিচে নামারও ব্যবস্থা নেই। সে এখন কি করবে? তাহেরের কথা শােনা যাচ্ছে। সে অনেক দূর থেকে ডাকছে। তার গলার স্বর ক্ষীণ। প্রায় অস্পষ্ট।
‘লিলিয়ান ! লিলিয়ান। তুমি কোথায় ? ‘আমি এখানে।
‘তুমি আমাকে বাঁচাও। আমি ভয়ংকর বিপদে পড়েছি। ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে। তুমি বাঁচাও আমাকে।
‘আমি নামতে পারছি না। আমি আটকা পড়ে গেছি।
আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
‘আমাকে বাঁচাও। লিলিয়ান – আমাকে বাঁচাও। ‘আমি আটকা পড়ে গেছি।
সিড়ি দুলছে। প্রচণ্ড শব্দে দুলছে। দুলুনিতে লােহার রেলিং খুলে আসছে। অনেক দূর থেকে তাহেরের অস্পষ্ট স্বর কানে আসছে। খুব বাতাস দিচ্ছে। বাতাসের। কারণে কিছু শােনা যাচ্ছে না। | লিলিয়ান জেগে উঠল। ঘড়িতে একটা দশ বাজে। লিলিয়ান বাকি রাতটা বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে কাটাল।
ডঃ ভারমান চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেন। লিলিয়ানের মনে হল তিনি হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছেন। যে কোন মুহূর্তে হেসে ফেলবেন। হাসবেন তাহেরের মত শব্দ করে। লিলিয়ান খুব লজ্জায় পড়বে। সে রকম কিছু হল না। ডঃ ভারগান হাসলেন না। চোখ থেকে চশমা খুলে ফেলে কাচ পরিষ্কার করতে করতে বললেন,
তুমি আবার দুঃস্বপ্ন দেখেছ?
‘মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখা তাে খুব স্বাভাবিক লিলিয়ান। আমরা সুন্দর স্বপ্ন যেমন দেখি দুঃস্বপ্নও দেখি।
‘ডঃ ভারমান, আমি তা জানি। কিন্তু আমার স্বপ্ন অন্য রকম। ‘অন্য রকম বলতে কি বােঝাচ্ছ?”
‘আপনাকে ব্যাখ্যা করতে পারব না। তবে আমার মনে হয় স্বপ্নে কেউ আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে।
‘তুমি ঠিকই ধরেছ। স্বপ্নে কেউ তােমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে – এটা ঠিক। অবশ্যই বলার চেষ্টা করছে। সেই কেউ টা হচ্ছে – তুমি নিজে। তােমার নিজের সাবকনশাস মাইন্ড তােমার কনশাস মাইন্ডকে তথ্য দিতে চাইছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
‘ডক্টর! তা কিন্তু না। তাহেরের মহা বিপদ সম্পর্কে আমাকে কেউ একজন সাবধান করছে।
ডঃ ভারমান এবার হাসলেন, তবে শব্দ করে না। নিঃশব্দে। শিশুদের প্রবােধ দেয়ার জন্যে বড়রা যেমন হাসে তেমন হাসি।
“শােন লিলিয়ান, ছেলেটা সম্পর্কে তােমার নিজের মধ্যেই এক ধরনের ভয় আছে। সেই ভয় হচ্ছে ছেলেটিকে হারানাের ভয়। এই ভয়ের উৎপত্তি হল ভালবাসায়। কাউকে গভীরভাবে ভালবাসলেই এই ভয় তৈরি হয়। মনে হয় – এক সময় ভালবাসার মানুষ আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। তখন আমার কি হবে? অবচেতন মনে ধীরে ধীরে ভয় জমা হতে থাকে ... তােমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে?
‘আপনাকে আমি বােঝাতে পারছি না – আমি স্বপ্নে তাহেরদের প্রাচীন বসতবাড়ি স্পষ্ট দেখেছি। আমি সে বাড়ির লােহার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলাম।‘
‘তুমি তােমার কল্পনার একটি বাড়ির লােহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলে।
ডঃ ভারমান আমি কিন্তু নিশ্চিত জানি একদিন ঐ বাড়িতে আমরা যাব –
তাহের ভয়ংকর বিপদে পড়বে।
‘যদি জান তাহলে ঐ বাড়িতে যেও না।। ‘আমাদের যেতেই হবে। এটা হচ্ছে নিয়তি। যা ঘটবার তা ঘটবেই।
‘লিলিয়ান তুমি তােমার নিজের যুক্তিতে আটকা পড়ে যাচ্ছ – যা ঘটবার তা যদি ঘটে তাহলে তােমাকে স্বপ্নে সাবধান করার প্রয়ােজন কি ?”
আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান চুপ করে রইল। ডঃ ভারমান শান্ত গলায় বললেন, তুচ্ছ জিনিস নিয়ে এত ভেব না। তুচ্ছ জিনিসকে তুচ্ছ করতে শেখ।।
লিলিয়ান উঠে দাঁড়াল। ক্লান্ত গলায় বলল, আমি ওদের বাড়ি স্বপ্নে সত্যি দেখেছি। দেখামাত্র চিনতে পারব। লােহার প্যাচানাে সিঁড়ি ...
‘লিলিয়ান আমি তােমাকে ঘুমের অষুধ দিচ্ছি। রাতে ঘুমুতে যাবার এক ঘন্টা আগে দু‘টা ট্যাবলেট খাবে। মনে থাকবে?
‘থাকবে।
ডক্টর ভারমান নিশ্চয় খুব কড়া ঘুমের অষুধ দিয়েছেন। অষুধ খাবার পরপর লিলিয়ানের মনে হল সে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। কোন গভীর খাদে পড়ে গেছে – নিচে নেমে যাচ্ছে। অতি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। খাদটা অন্ধকার এবং শীতল। লিলিয়ানের ভয় ভয় করতে লাগল। মনে হয় এই ঘুম তার আর ভাঙবে না। কেউ ভাঙতে পারবে না। সে বিরাট এই বাড়িতে মরে পড়ে থাকবে। কেউ জানবেও না।
আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
‘ক্রিং ক্রিং ক্রিং!
কিসের শব্দ? টেলিফোন না – কেউ এসে কলিং বেল টিপছে।
না–কি গীর্জার ঘন্টার শব্দ। তাদের বাড়ির কাছেই ক্যাথােলিক চার্চ। ওরা মাঝে মাঝে ঘন্টা বাজায় ! কেউ মারা গেলে ঘন্টা বাজায়। কে মারা গেছে ? তাহের ? তাহেরের কি কিছু হয়েছে? প্লেন দুর্ঘটনার খবর তাে কেউ দেয় নি। টিভি খােলা আছে। প্রেন দুর্ঘটনা হলে বলত। প্লেন দুর্ঘটনার খবর টিভি খুব ফলাও করে প্রচার করে। ট্রেন বা বাস দুর্ঘটনার খবর কোন পাত্তা পায় না। এর কারণ কি?
‘ক্রিং ক্রিং ক্রিং।। লিলিয়ান টেলিফোন তুলে ক্লান্ত গলায় বলল, হ্যালো! ওপাশ থেকে তাহেরের গলা পাওয়া গেল। ‘হ্যালাে লিলিয়ান – আমি।
Read more
