কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

আমাদের এই নেতা আরাে নতুন নতুন খেলা বার করার আগেই হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে গেলআমরা বিরাট ধাঁধায় পড়ে গেলাম যে বাড়ি থেকে সে আসত (পুকুরপাড়ের এক টিনের বাড়ি) সেই বাড়ি তালাবন্ধএই বাড়ি দীর্ঘদিন তালাবন্ধ থাকল

কিছু শৈশবএকসময় তালায় জং ধরল টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে তাকালে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে ঘাস গজিয়েছেআমি কী কারণে জানি না প্রায়ই বাড়ির ভেতর দেখার জন্যে টিনের ফুটা দিয়ে তাকিয়ে থাকতামআমার রােমাঞ্চ বােধ হতােমনে হতাে কিছু একটা দেখবকিছু একটা দেখবকী দেখার প্রত্যাশা ছিল সেটা এখন আর মনে নেই। 

আমার আরেক বন্ধুর কথা বলিতার নাম খুব সম্ভবত মতি বা মতিনতার বাবা লন্ডনি অর্থাৎ লন্ডনে থাকেন। স্ত্রীকে প্রতিমাসে খরচ পাঠানমতিনের অবস্থা সেই কারণে ভালােতাকে দেখলেই মনে হয় সে নতুন কাপড় পরে বিয়ে বাড়িতে যাবার জন্য প্রস্তুত আমাদের মধ্যে একমাত্র সে সবসময় জুতা পরে বের হতােরােগা দুর্বল ধরনের মেয়েলি চেহারার ছেলেতার মুখে সারাক্ষণই হাসি তার প্যান্টের পকেট ঝকঝকে নতুন মার্বেলে ভরতি থাকততবে সে নিজে মার্বেল খেলত নাএকদিন সে বলল, ম্যাজিক দেখাবেআমরা অতি আগ্রহে তাকে ঘিরে ধরলাম । সে একটা মার্বেল মুখে পুরলাে পরক্ষণেই হাঁ করে দেখাল মুখে মার্বেল নেই। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

আমরা অবাক হলাম নাবােঝাই যাচ্ছে সে মার্কেল গিলে ফেলেছেতাকে চেপে ধরতেই সে স্বীকার করলআমরা বললাম, এই ম্যাজিকটা আবার দেখবসে নির্বিকার ভঙ্গিতে আরেকটা মার্বেল গিললআমরা মহাআনন্দিতবিপুল করতালিএর পর থেকে তার প্রধান কাজ হলাে, মার্বেল গিলে আমাদের আনন্দ দেয়ামতির সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয় নিএক ভােরবেলায় লন্ডন থেকে তার বাবা চলে এলেনমতি পেটভর্তি মার্বেল নিয়ে বাবার সঙ্গে লন্ডন চলে গেল। মতির বাবা কোনাে এক কারণে (শিশুদের কাছে দুর্বোধ্য) মতির মাকে সঙ্গে নিলেন নাসেই মহিলা চিৎকার করে এমন কান্না শুরু করলেন যে, বাড়িতে কাক নেমে গেলগভীর বেদনায় চিৎকার করে কেউ কাঁদলে ঝাঁক বেঁধে কাক নেমে আসে এমন লােকজ প্রবাদ আছেপ্রবাদের সত্যতা থাকতে পারে। 

এই মহিলা অনেক দিন কাঁদলেন আমরা তার কান্নায় অভ্যস্থ হয়ে গেলামধরেই নিলাম, ঐ বাড়ির আশেপাশে গেলেই কান্নার শব্দ পাওয়া যাবেমানুষ অসাধারণ অনেক ক্ষমতার অধিকারীমানুষের অসাধারণ ক্ষমতার একটি হচ্ছে, দ্রুত অভ্যস্থ হওয়ার ক্ষমতা। 

ছেলেবন্ধুদের কথা অনেক লিখলাম, আরাে লেখা যেত, তবে বিশেষ করে আর কারাে কথা মনে পড়ছে নাজ্ঞানী টগরকে দিয়ে ছেলেবন্ধুদের প্রসঙ্গ শেষ করিটগর একদিন আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, মেয়েদের পেট থেকে বাচ্চা কীভাবে বের হয় জানিস

কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি বললাম, জানিজানলে বল কীভাবে বের হয়আমি বললাম, পেট কেটে বের করা হয়। 

তুই কিছুই জানিস না, বাচ্চা বের হয় পাছা দিয়েপাছা দিয়ে গু যেমন বের হয়ে তেমন। 

জ্ঞানী টগরের কাছ থেকে বাচ্চা বের হবার প্রক্রিয়া শুনে দীর্ঘদিন মনকষ্টে ছিলামছয়সাত বছরের বালকের কষ্ট সহজ কষ্ট না । 

আমার মেয়েবন্ধুর সংখ্যা খারাপ ছিল নাতারা বাস করত উত্তেজনাহীন এক জগতেতাদের খেলা রান্নাবাটি খেলাভবিষ্যতে রান্নাবাটি করতে হবে তারই প্রস্তুতিমূলক খেলা কিনা কে জানেরান্নাবাটি খেলায় ছেলেদের প্রয়ােজন ইয়যেমন বাজার করার জন্যে কাজের লােক লাগেবাড়ির সাহেব লাগেআমার ভূমিকা বেশির ভাগ সময়ই বাড়ির চাকরেরবাড়ির কী কী কী আনতে হবে বলে আমাকে বাজারে পাঠানআমি কিছু লতাপাতা, মাটি, ইটের গুঁড়া 

নিয়ে ফিরে আসিতখন বাড়ির কত্রী আমাকে বকাঝকা করেন, মাছ পচা, চাল ভালাে না, চালে কংকর এইসবআমাকে মাথা নিচু করে বকা শুনতে হয়কিছুক্ষণ পর মেয়েরা রান্না শুরু করে মুখে হঁাক হঁাক জাতীয় নানান শব্দ করে আমি বসে থাকি, কখন রান্না শেষ হবে, নকল খাওয়া খাব। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

হৈচৈ মারামারির তুমুল উত্তেজনায় খেলার পর রান্নাবাটির মতাে পানসে খেলায় আমার আনন্দ পাওয়ার কোনাে কারণ ছিল না। কিন্তু আমি আনন্দ পেতামকেন পেতাম বলতে পারব নাসব মেয়ের ভেতর যেমন একজন পুরুষ বাস করে, সব ছেলের মধ্যেও একটি নারী বাস করেনারীপুরুষের বিভাজন রেখা দুর্বল। 

মেয়েদের মধ্যে সবচেবেশি যার কথা মনে আছে তিনি পারুল আপা (আমার ছেলেবেলাতে উনার কথা লিখেছি)তার চেহারা মনে নেইফর্সা লম্বাটে মুখএইটুকু শুধু মনে আছেপারুল আপা ক্লাস সিক্সে কিংবা সেভেনে পড়তেনতিনি প্রায়ই আমাকে তার স্কুলে নিয়ে যেতেনতখনকার সময়ে মেয়েরা অভিভাবক হিসেবে তাদের ছােটভাই জাতীয় বালকদের নিয়ে যেতে পারত। 

মেয়েদের স্কুলে অকারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকার মতাে বিরক্তিকর কাজে আমি রাজি হতাম দুটা কারণেপারুল আপাকে স্কুলে যাবার জন্যে প্রতিদিন আট আনা পয়সা দেয়া হতােতিনি যেতেন রিকশায় করে, প্রায়ই ফিরতেন হেঁটেরিকশায় চড়ার আনন্দ এবং বেঁচে যাওয়া পয়সায় নানাবিদ সুখাদ্য কেনার আনন্দেই আমি সঙ্গী হতাম। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

শিশুদের জন্যে সুখাদ্যের অভাব সেসময় ছিল নাতালিকা দেই. হজমি (বেশি পাওয়ারের কিছু হজমি তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি করে দেয়া 

হতােতৈরি প্রক্রিয়ায় আগুন জ্বলতসেই হজমি খাওয়ার পর দাঁত 

মুখ সব হতো কালাে) . আইসক্রিম (আইসক্রিমওয়ালা দুই হাতে দুটা সিলিন্ডার টাইপ 

আইসক্রিম ফ্লাস্ক নিয়ে বের হতােএকটায় থাকতাে দুধমালাই আইসক্রিম, দাম দুই আনাঅন্যটায় এক আনা দামের সাধারণ। 

দুটার স্বাদই অপূর্বদুধমালাইয়ের স্বাদ অপূর্ব টু দ্য পাওয়ার ফাইভ) , বুট ভাজা (ঝাল লবণসহ) . বাদাম ভাজা (ঝাল লবণসহ) , গােল্লা লজেন্স (বড় বড় গােল লজেন্সলাল ডােরাকাটাখাওয়ার পর 

পর মুখ টকটকে লাল

. আচার (আচারওয়ালা মাথায় আচারের খলুই নিয়ে ঘুরতােঅতি 

সুরেলা গলায় মিষ্টি আচারবলে ডাক দিত) পারুল আপার মা অতি ভালাে মহিলা ছিলেননিজের ছেলেমেয়েদের যেমন আদর করতেন অন্যদেরও করতেনতাঁর মাথায় সামান্য দোষ ছিল মাঝে মাঝে কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড রেগে যেতেনতখন হাতের কাছে যাকে পেতেন তাকেই মারতেনআমিও একবার তার হাতে মার খেয়েছি

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *