লেখালেখিতে উৎসাহী করার জন্যে প্রতি বছরই তিনি তার সব ছেলেমেয়েকে একটা করে ডায়েরি দিতেন। আমাদের দায়িত্ব ছিল, ডায়েরি ভর্তি করে গল্প–কবিতা লিখতে হবে।

একটা ঘটনা বলি। আমার সর্বকনিষ্ঠ ভাই আহসান হাবীব তার ডায়েরিতে একটা কবিতা লিখে বাবার কাছে জমা দিল। কবিতার শিরােনাম ‘জিনিশ তুলিবে।
জিনিশ তুলিবে। জিনিশ পাইলে তুলিবে তুলিবে তুলিবে তুলিবে যদি না তুলিবে তবে পরে হইবে দরকার।
বাবা বললেন, কবিতা তাে অতি হৃদয়গ্রাহী হয়েছে, কিন্তু বাবা এর অর্থ কী?
আহসাব হাবীব বলল, সে নানান সময় দেখেছে মূল্যবান জিনিস বারান্দায়, ঘরের কোনায় পড়ে থাকে, কেউ তুলে গুছিয়ে রাখে না। পরে যখন দরকার হয় তখন খুঁজে পাওয়া যায় না। এই বিষয়ে কবিতা।
বাবা বললেন, অসাধারণ। উপদেশমূলক সাহিত্যের প্রয়ােজন আছে। আরাে লেখ।
বাবার একটি বিচিত্র অভ্যাসের কথা বলি। তিনি ছেলেমেয়েদের নাম বদলাতে পছন্দ করতেন। হঠাৎ একদিন ঘোষণা করবেন, আজ থেকে তােমার এই নাম।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
আমার শুরুর নাম ছিল শামসুর রহমান। ফয়জুর রহমানের সঙ্গে মিলিয়ে শামসুর রহমান। হঠাৎ একদিন হয়ে গেল হুমায়ূন আহমেদ। জাফর ইকবালের ডাক নাম ছিল বাবলু কিংবা বাবুল। ছােটবােনের নাম প্রথমে ছিল শেফালি, পরে হয়ে গেল সুফিয়া । আহসান হাবীবের নাম ছিল কুদরতে খুদা।
তবে আহসান হাবীবের নাম বাবা বদলান নি, আমি বদলেছি। আমি তখন ক্লাস টেনে পড়ি। থাকি বগুড়ায়। একদিন বাবাকে ভয়ে ভয়ে বললাম, কুদরতে খুদা নামটা আমার পছন্দ না।
বাবা বললেন, কেন পছন্দ না ? কুদরতে খুদা আমাদের দেশের এত বড় একজন সায়েন্টিস্ট।
আমি বললাম, তারপরেও পছন্দ না। সে যখন বড় হবে তখন তার এই নাম নিয়ে মন খারাপ করবে।
ঠিক আছে তুই তার একটা নাম দে, যে নাম বড় হয়ে সে অপছন্দ করবে না। আমি নাম দিলাম আহসান হাবীব। কবি আহসান হাবীব সাহেবের নামের সঙ্গে মিলিয়ে এই নাম না। আমাদের ক্লাসে আহসান হাবীব নামের ব্রিলিয়ান্ট এক ছাত্র ছিল । তার সঙ্গে মিলিয়ে রাখা নাম।
আমার ধারণা বাবা আরাে কিছুদিন বেঁচে থাকলে আমাদের সবার নাম আরেক দফা পাল্টাতেন।
বাবার কাছ থেকে জেনেটিক্যালি আমি যা পেয়েছি তা হলাে মুগ্ধ হবার ক্ষমতা। তিনি অতি তুচ্ছ জিনিসে মুগ্ধ হতেন। তার চোখে পানি চলে আসত। আমিও অতি তুচ্ছ জিনিসে মুগ্ধ হই। বাবার মুগ্ধতার একটা নমুনা দেই। আমরা তখন পিরােজপুরে । জাফর ইকবাল বারান্দায় বসে আছে। রাত।
কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
বারান্দায় হাত মুখ ধুয়ে সে ঘুমাতে যাবে। হঠাৎ সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে বসল, কত তারা আকাশে!
বাবা মােহিত। কী সুন্দর একটা বাক্য কত তারা আকাশে। তিনি মুগ্ধতা ধরে রাখতে পারলেন না— একটা নাটক লিখে ফেললেন। নাটকের নাম— কত তারা আকাশে।
পুলিশের জটিল চাকরিতে কোনাে ছুটিছাটা নেই। রাত দশটা–এগারােটার আগে কোনােদিনই বাসায় ফিরতেন না। এর মধ্যেও লেখালেখির সময় বের করতেন। অনেকবার গভীর রাতে ঘুম ভেঙে দেখেছি, তিনি বুকের নিচে বালিশ রেখে নিবিষ্ট মনে লিখছেন।
আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়। গল্প সংকলন। নাম ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী। সস্তা নিউজপ্রিন্টে ছাপা । কভারে একটি মেয়ের ছবি, সেই ছবি আমার আঁকা । অতি অখাদ্য এক প্রেস থেকে বাবা নিজেই বইটি ছাপিয়েছেন। বইটি কিছুটা দৃষ্টিনন্দন করা যায় কি–না সেই চেষ্টায় তিনি লাল রঙ কিনে আনলেন। পিতা–পুত্র মিলে বইয়ের চারদিক লাল রঙ করলাম। বইটির চেহারা আরাে খারাপ হয়ে গেল। বাবা তাতেও মুগ্ধ। বাহ, ভালাে হয়েছে তাে!
পাঠক মাত্রই জানতে চাইবেন গল্পগুলি কেমন ? পুরনাে ধারার লেখকদের গল্পের মতো গল্প। প্রচুর আবেগ। ফ্লাওয়ারী ভাষা। চরিত্র চিএনের চেয়ে ভাষার
কিছু শৈশব-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ
পড়াশােনা নামক কষ্টকর অধ্যায়ের শুরু কিশােরী মােহন পাঠশালায়। এটি এখন কিশােরী মােহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
খেলা প্রধান। অপ্রধান বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া। এই মুহূর্তে একটি গল্প মনে পড়ছে। একটা কাজের ছেলের বসন্ত রােগ হয়েছে। সে বলছে ‘বড় কুলচায়‘। সে বলতে চাচ্ছে ‘বড় চুলকায়, সে তার সাহেবকে এরকম বলতে শুনেছে । এখন গুবলেট করে ফেলেছে। এখন বলছে কুলচায়। বিষয়টা নিয়ে গল্প লেখা চলে না, প্রসঙ্গক্রমে আসলে আসতে পারে।
বাবার জীবনে প্রকাশিত একমাত্র বইটির কোনাে কপি আমাদের কারাের কাছেই নেই। থাকলে আরেকবার পড়তাম।
‘রিক্তশ্রী পৃথিবী‘ প্রকাশ করা নিয়ে অনেককাল পরে আমি নিজে একটি গল্প লিখি। গল্পটির নাম আনন্দ বেদনার কাব্য‘। গল্পটি দিয়ে দিচ্ছি। গল্প পড়লেই আমার বাবাকে কিছুটা চেনা যাবে।
আনন্দ বেদনার কাব্য বইটির নাম ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী।
প্রচ্ছদে একটি মেয়ের মুখের ছবি। মেয়েটি কাঁদছে। তার মুখের পাশে একটি গ্লোব। একটি বিকটদর্শন নর–কঙ্কাল গ্লোবটি বাঁ হাতে জড়িয়ে ধরে আছে। কঙ্কালটির ডান হাতে একগুচ্ছ রজনীগন্ধা। যথেষ্ট জটিলতা। পৃথিবীর রিশ্ৰী ফুটিয়ে তােলার আয়ােজনে কোনাে ত্রুটি নেই। এ ধরনের প্রচ্ছদচিত্রের বইগুলাের পাতা সাধারণত উল্টানাে হয় না।
Read more