কিছু শৈশব-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

তবুও অভ্যাসবশেই পাতা উল্টালামএবং একসময় দেখি গ্রন্থকারের লেখা ভূমিকাটি পড়তে শুরু করেছি। শুরু না করলেই বােধহয় ভালাে ছিলভূমিকাটিতে খুব মন খারাপ করা একটি ব্যাপার আছেকিছু শৈশবআমার নিজের যথেষ্ট দুঃখকষ্ট আছে, অনাের দুঃখকষ্ট আর ছুঁতে ইচ্ছে করে নাগ্রন্থকার লিখেছেন, দীর্ঘ পাঁচ বছর পূর্বে রিক্তশ্রী পৃথিবীর পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করিসেই সময় আমার অতি আদরের জ্যেষ্ঠ কন্যা মােসাম্মৎ নুরুন্নাহার খানম (বেনু) উক্ত গ্রন্থের জন্যে প্রচ্ছদচিত্রটি অঙ্কন করেঅর্থাভাবে তখন গ্রন্থটি প্রকাশ করিতে পারি নাইআজ প্রকাশিত হইলকিন্তু হায়, আমার বেনু মা দেখিতে পাইল না।। 

বইটির দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় প্রচ্ছদশিল্পীর সামান্য একটু পরিচয়ও আছে। 

সেখানে লেখা প্রচ্ছদশিল্পী : মােসাম্মৎ নুরুন্নাহার খানমদশম শ্রেণী, বিজ্ঞান বিভাগ। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

মফস্বল থেকে প্রকাশিত বইটি হঠাৎ করেই অসামান্য হয়ে উঠল আমার কাছেএই বইটি ঘিরে দরিদ্র পরিবারের আশাআকাঙ্ক্ষার ছবিটি চোখের সামনে দেখতে পেলামলম্বা বেণির দশম শ্রেণীর কালােমতাে রােগা একটি মেয়ে যেন গভীর ভালােবাসায় বাবার বইয়ের জন্যে রাত জেগে প্রচ্ছদ আঁকছেআঁকা হবার পর বাবাকে দেখাল সেটিপৃথিবীর সব বাবাদের মতাে এই বাবাও মেয়ের শিল্পকর্ম দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন

রাতে সবাই খেতে বসেছেদরিদ্র আয়ােজনকিন্তু সবার মুখ হাসিহাসিবাবা বললেন, পাস করলে আমার বেনুমাকে আমি আর্ট কলেজে দেবােবেনু বেচারি লজ্জায় মরে যায়ভাত মাখতে মাখতে বলল, দূর ছাই, মােটেও ভালাে হয় নিবাবা রেগে গেলেন, ভালাে হয় নি মানে ? আঁকুক দেখি কেউ এরকম একটা ছবি। 

বই অবশ্যি বাবা প্রকাশ করতে পারলেন নাকে ছাপবে এরকম বই ? দুএকজন প্রকাশক বলেও ফেলল, এসব পদ্যের বই কি আজকাল চলেরে ভাই ? এসব নিজের পয়সায় ছাপতে হয়টাকা জমান, জমিয়ে নিজেই ছাপান। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

প্রয়ােজনীয় টাকা জোগাড় করতে বাবার দীর্ঘ পাঁচ বছর লাগলহয়তাে স্ত্রীর কানের দুলজোড়া বিক্রি করতে হলাে। সে বছর ঈদে বাচ্চারা কেউ কাপড় নিল 

 তিনি খুঁজে পেতে সস্তার একটি প্রেস বের করলেন, যার বেশির ভাগ টাইপই ভাঙাকিন্তু তাতে কিছু যায় আসে নাকারণ প্রেসের মালিক সালাম সাহেব, গ্রন্থকারের কবিতার একজন ভক্তগ্রন্থকার লিখেছেন, টাউন প্রেসের স্বত্বাধিকারী জনাব আবদুল সালাম সাহেব আমার এই গ্রন্থখানি প্রকাশের ব্যাপারে প্রভূত সাহায্য করিয়াছেনএই কাব্যানুরাগী বন্ধুবৎসল মানুষটির সহযােগিতা ব্যতীত এই গ্রন্থ আপনাদের হাতে তুলিয়া দেওয়া আমার সাধ্যাতীত ছিলজনাব আবদুস সালাম সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়া ছােট করার ধৃষ্টতা আমার নাই। 

ভূমিকা থেকে বােঝা যাচ্ছে কবি সন্ধ্যাবেলায় প্রুফ দেখতে যখন যেতেন তখন সালাম সাহেব হাসিমুখে বলতেন, এই যে কবি সাহেব, আসেন, আপনার সেকেন্দ্র প্রুফ রেডিকই রে কবি সাহেবের জন্যে চা আন 1 চা খেতে খেতে বললেন, প্রফে চোখ বুলাতে বুলাতে আপনার একটা কবিতা পড়েই ফেললামবেশ লিখেছেন। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

কোন কবিতাটির কথা বলছেন

যে কী যেন বলে, ইয়ের উপর যেটা লিখলেনবৃষ্টি বাদলার কথা আছে যেটায় । 

, নববর্ষার কথা বলছেন? হ্যা, ঐটাই চমৎকারখুবই ভাবের কথাআপনি তাে ভাই বিরাট লােক। 

কবি নিশ্চয়ই বই ছাপানাের সব টাকা আবদুস সালাম সাহেবকে দিতে পারেন নিসালাম সাহেব বললেন, যখন পারেন দিবেনকবি মানুষ আপনি। 

আপনার কাছে টাকা মার যাবে নাকিহা হা হাজন পারে আপনার মতাে কবিতা লিখতে

ভূমিকা পড়ইে জানতে পারলাম নেত্রকোনা শহরের একজন প্রবীণ উকিল বাবু নলিনী রঞ্জন সাহাও জনাব আবদুস সালামের মতাে কবির প্রতিভায় মুগ্ধকবি লিখেছেন, বাবু নলিনী রঞ্জন সাহার উৎসাহ প্রেরণা আমাকে গ্রন্থখানি প্রকাশ করিবার জন্য আগ্রহী করিয়াছেবাবু নলিনী রঞ্জন একজন স্বভাবকবি এবং কাব্যের একজন কঠিন সমালােচকতিনি যখন আমার কবিতা প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক পত্রিকা মঞ্জুষাতে আমার একটি কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করিয়া বলিলেন, এই কবির কাব্যগ্রন্থ অনতিবিলম্বে প্রকাশ হওয়া বাঞ্ছনীয়, তখনই আমি স্থির করি...‘ 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৮)-হুমায়ূন আহমেদ

 রিক্তশ্রী পৃথিবীতে মােট একশতেরােটি কবিতা আছেপ্রতিটি কবিতার নিচে রচনার স্থান, তারিখ এবং সময় দেয়া আছেঅনেকগুলাের সঙ্গে বিস্তৃত ফুটনােটকয়েকটি উল্লেখ করিদিবাবসান কবিতাটির ফুটনােটে লেখা, আমার বড় শ্যালক জনাব আমীর সাহেবের বাড়িতে এই কবিতাটি রচিত হয়

তাহার বাড়ির সন্নিকটে খরস্রোতা একটি নদী আছে (নাম স্মরণ নাই)উক্ত নদীর তীরে এক সন্ধ্যায় বসিয়াছিলাম দিবাবসানের পরপরই আমার মনে গভীর আবেগের সৃষ্টি হয়কবিতা রচনার উপকরণ সঙ্গে না থাকায় আবেগটি যথাযথ ধরিয়া রাখিতে পারি নাইসমস্ত কবিতাটি মনে মনে রচিত করিয়া পরে লিপিবদ্ধ করিতে হইয়াছে। 

অন্য একটি কবিতার (বাসর শয্যা) ফুটনােটটি এরকমএই দীর্ঘ কবিতাটি আমি আমার বাসর রাত্রে রচনা করিয়াছিসেই সময় বাহিরে খুব দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ছিলপ্রচণ্ড হাওয়া এবং অবিশ্রান্ত বর্ষণক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুৎ চমকাইতেছিলআমার নবপরিণীতা বালিকাবধূ মেঘগর্জনে বারবার কাপিয়া উঠিতেছিল । 

বাসর রাত্রিতে স্বামীর এই কাব্যরােগ দেখে নতুন বৌটি নিশ্চয়ই দারুণ অবাক হয়েছিলতার চোখে ছিল বিস্ময় এবং হয়তাে কিছুটা ভয়। কবি স্বামী দীর্ঘ রচনাটি কি সেই রাত্রেই পড়ে শুনিয়েছেন তাঁর স্ত্রীকে ? না শুনিয়ে কি পারেন ? ঝড় জলের রাতহাওয়ার মাতামাতিটাটকা নতুন কবিতারহস্যমণ্ডিত এক নারীসেই রাত কী যে অপূর্ব ছিল সেটি আমরা ফুটনােট পড়ে কিছুটা বুঝতে পারি। 

এবং এও বুঝতে পারি, যে লােক বিয়েরাতে সাড়ে দুপৃষ্ঠার একটি কবিতা লিখতে পারেন, তিনি পরবর্তী সময়ে কী পরিমাণ বিরক্তি হতাশার সৃষ্টি করেছেন তাঁর স্ত্রীর মনেঘরে হয়তাে টাকাপয়সা নেই ছােট ছেলের জ্বর

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *