দ্বৈরথ পর্ব:৭
সে নিজের ঘরে ঢুকে গেল। না নিজের ঘরে নয়। এই বাড়িতে তার নিজের কোনো ঘর নেই। একলা হতে ইচ্ছা করলেও এ-বাড়িতে সে উপায় নেই। অথচ এখন তার একা থাকতে ইচ্ছা করছে। সোমা হাত বাড়িয়ে চা নিল।ছদরুদ্দিন সাহেব খাটে আধশোয়া হয়ে বসা। তাঁর সামনের চেয়ারে বিজু। বিজুর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। হাত মুঠি করা। ঘরে আর কেউ নেই তবে তিথি মাঝে-মাঝে দরজার কাছে এসে দাঁড়াচ্ছে এবং চলে যাচ্ছে। তিথির চোখে ভয়।ছদরুদ্দিন সাহেব কঠিন গলায় বললেন, তুই আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলছিস?
বিজু কঠিন গলায় বলল, হ্যাঁ। দশ দিনের মধ্যে চলে যাবেন।দশ দিনের মধ্যে চলে যাব? হ্যাঁ, আমাদের অসুবিধা হচ্ছে। বড় আপার ঘুমাবার জায়গা নেই। আমি ঘুমাই। বারান্দায়। বিশ্বাস না হলে এক বার এসে দেখে যাবেন।সোমাকে আমার এখানে পাঠিয়ে দিলেই হয়। তিথির সাথে থাকবে।বড় চাচা, আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন না। বাড়িটা আপনি দশ দিনের মধ্যে ছাড়বেন।কেন? আবার বলছেন কেন? আপনি জানেন না কেন?
না, জানি না।
এই বাড়ি আমাদের।
কে বলেছে তোকে?
কি বলছেন আপনি? কে বলেছে মানে?
যা, একটা দলিল এনে আমাকে তুই দেখা যে এই বাড়ি তোর। যেদিন দেখাবি সেই দিনই ছেড়ে দেব। আর শোন বিজু, তোর মাথাটা বেশি গরম হয়ে আছে। মাথা এত গরম করিস না। এই বয়সে মাথা যদি এত গরম হয় তা হলে বাকি জীবনটা কি করবি?আপনি দয়া করে উপদেশ দেবেন না। উপদেশের আমার দরকার নেই।তা নেই। তোর যে জিনিসের দরকার সেটা হল জুতোর বাড়ি। নেংটা করে তোকে। জুতো দিয়ে পেটানো দরকার। আর মাথাটা কামিয়ে দেওয়া দরকার।বিজু থমথমে মুখে উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে যাবার সময় পিছনে-পিছনে তিথি আসছে। তিথি নরম গলায় বলল, বিজু ভাইয়া।
বিজু জবাব দিল না।তিথি বলল, আমরা এই বাড়িতে থাকব না বিজু ভাইয়া। এই বাড়ি ছেড়ে দেব। সবাই মামার বাড়িতে চলে যাব। আগেই যেম, শুধু বাবা যেতে চাচ্ছে না বলে যাচ্ছি। না। বাবা মামাদের একেবারেই সহ্য করতে পারে না। দেখলেই কেমন পাগলের মতো হয়ে যান। বিজু ভাইয়া, তুমি রাগারাগি করো না। আমরা থাকব না।বিজু কোনো জবাব দিল না। তবে তিথি যে শান্ত-সহজ ভঙ্গিতে এতগুলো কথা বলতে পারল তাতে সে অবাক হল। ও সেদিনও পুঁচকে মেয়ে ছিল, আজ কেমন গুছিয়ে কথা বলতে শিখেছে। বিজুর মনে হল বড় চাচার মেয়েগুলো বড়চাচা কিংবা বড় চাচির মতো খারাপ হয় নি। চেহারা ভালো না, কিন্তু মেয়েগুলো ভালো। বিশেষ করে তিথি। এর গলায় সে কোনোদিন একটা উঁচু স্বর শোনে নি। তিথির সঙ্গে সোমার কোথায় যেন মিল আছে।
সাইফুদ্দিন সাহেব আজ সকাল সকাল বাড়ি ফিরবেন ভেবেছিলেন। শরীরটা ভালো লাগছে না। কাল রাতে ঠাণ্ডা লেগে জ্বর-জ্বর লাগছে। যেদিন সকাল সকাল ফিরবেন। ভাবেন সেদিনই ফেরা হয় না। ছ সাত জন রুগী বসে আছে। তাঁর জন্যে এতগুলো রুগী অপেক্ষা করবে এটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার। শেষ বয়সে পসার বাড়তে শুরু করল কি-না কে জানে! খারাপ সময়টা বোধহয় কেটে যাচ্ছে। দিনের পর দিন গিয়েছে একটা রুগী পান নি।
কম্পাউন্ডারের যে কাজ ইনজেকশান দিয়ে দুটাকা নেওয়া সেই কাজও করতে হয়েছে। জীবনের শেষে এসে সুদিনের মুখ দেখছেন। ডাক্তার হিসাবে আগে যা ছিলেন এখনো তাই আছেন, তা হলে রুগী আসছে কেন? বয়সের কারণে কি চেহারায় ডাক্তার ভাবটা বেশি এসেছে? হতে পারে। তাঁর মাথায় চুল লম্বা। সব চুল পেকে ধব ধব করছে বলে চেহারায় একটা ঋষি-ঋষি ভাব এসে গেছে।তিনিপর্দা সরিয়ে ডাকলেন, এখন কে? আপনি? আসুন।ছেলে কোলে নিয়ে মধ্যবয়সী এক লোক ঢুকল। ছেলের বয়স চার-পাঁচ। রোগা লিক-লিক করছে। চেহারা দেখেই বোঝা যায় এর একমাত্ৰ অসুখ অপুষ্টি।
থোকার কি হয়েছে?
পেটে ব্যথা। কাল সারা রাত ঘুমাতে দেয় নাই। ছটফট করছে।
ব্যথা কি এখনো আছে?
কিছু বলছে না।
কি খোকা, ব্যথা আছে?
ছেলে না সূচক মাথা নাড়ল। সাইফুদ্দিন সাহেব হাসিমুখে বললেন, ব্যথা থাকলেও অনেক সময় ছেলেরা ডাক্তারের ভয়ে বলে, না।ঠিক বলেছেন ডাক্তার সাহেব।দেখি থোকাকে এখানে শুইয়ে দিন তো। কি খোকা, আমাকে ভয় লাগে? খোকা হেসে ফেলল। দীর্ঘ সময় নিয়ে সাইফুদ্দিন সাহেব রুগীকে দেখলেন। তাঁর পসার বাড়ছে। তাঁকে আরো সাবধান হতে হবে। পসারের সাথে সাথে দায়িত্ব চলে আসে।রুগী দেখে শেষ পর্যন্ত বেরুতে বেরুতে নটা বেজে গেল।
এখান থেকে বাড়ি প্রায় আধ মাইলের মতো। এইটুকু পথ হেঁটে হেঁটে যান। এতে শরীরটা ঠিক থাকে। রাতে সুনিদ্ৰা হয়।রাস্তায় নামতেই দেখলেন বিজু দাঁড়িয়ে আছে। তিনি হাসিমুখে বললেন, কি রে বিজু তুই।তোমার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি। মেলা রুগী আসছে দেখি তোমার কাছে।তিনি তৃপ্তির হাসি হাসলেন। বিজু বলল, রিকশা নেবে না হাঁটবে? চল হাঁটি। তুই কিছু বলবি? হাতে একটা জুলন্ত সিগারেট থাকলে বিজর কথা বলতে সুবিধা হয়। তবে বাবার সঙ্গে তো আর সিগারেট হাতে কথা বলা যায় না। বিজু সিগারেট ফেলে দিল। আস্ত সিগারেট ফেলে দিতে মায়া লাগল। সাইফুদ্দিন সাহেব বললেন, সোমার ব্যাপারে কিছু বলবি?
না। আচ্ছা বাবা, দাদার মৃত্যুর পর তোমাদের সম্পত্তির ভাগটাগগুলো কীভাবে হল।
সম্পত্তি আছেই বা কি আর ভাগই বা কি হবে।
তবু যা আছে সেটার কথাই বল।
কাগজপত্রে তো কিছু নাই, মুখে মুখে ভাগ।
বল কি?
কেন, কি হয়েছে?
বিজ জবাব দিল না। এক দলা থথ ফেলে মুখ বিকৃত করল। তার অনেক পরিকল্পনা মাথায়। এখন মনে হচ্ছে সব পরিকল্পনায় পানি লেগে গেছে। কোনো পরিকল্পনা কাজে লাগানো যাবে না। ঢাকা শহরের এমন সুন্দর একটা জায়গায় তাদের সাড়ে পাঁচ কাঠা জমি। পুরনো বাড়িটা ভেঙে ব্যাংক লোন নিয়ে ছতলা দালান তোলা যায়। নিচের তলায় হবে ডিপার্টমেন্ট স্টোর, উপরে ফ্ল্যাট। একেক ফ্লোরে দুটো করে ফ্ল্যাট, মোট দশটা ফ্ল্যাটে চার হাজার করে ভাড়া হিসাব করলেও হয় চল্লিশ হাজার। ডিপার্টমেন্ট স্টোর সে নিজে চালাবে। সব পাওয়া যাবে এখানে। একটা স্ন্যাকস কর্নার থাকবে। ভিডিও কর্নার থাকবে আজকাল ভিডিও ব্যবসা জমজমাট। লোকজন বাজার করতে এসে পছন্দসই একটা ক্যাসেট নিয়ে চলে যাবে।
বিজু একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
সাইফুদ্দিন সাহেব বললেন, কি হয়েছে রে বিজু?
বিজু এক দল থুথু ফেলল, জবাব দিল না। তার কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। বড় গরম লাগছে। আজ আবার গরম পড়ে গেছে।প্যাকেট করা নতুন ক্যাসেট ডেক জোগাড় করতে কামালের বেশ ঝামেলা হয়েছে। তিন ঘন্টার জন্যে নিয়ে যাবে, প্যাকেট খোলা যাবে না-এই কথার পরও কোনো দোকানদার রাজি হয় না। এই তিন ঘন্টার জন্যে পাঁচ শ টাকা দিতে সে রাজি, তাতেও কাজ হয় না। শেষ পর্যন্ত সাত শ টাকায় রফা হল। ঠিক হল দোকানের এক জন কর্মচারীও সাথে যাবে। তাতেই সই। এত যন্ত্রণা করে শেষ পর্যন্ত একটা পয়সা না পাওয়া গেলে মাথায় বাড়ি।
দোকানের কর্মচারী যাবার পথে বলল, তিন ঘন্টার জন্যে জিনিসটা নিচ্ছেন কেন? কামাল বিরক্ত হয়ে বলল, এত কথার আপনার দরকার কি? এই নেন পঞ্চাশটা টাকা রাখেন। চা-পানি খাবেন। আর দয়া করে মুখটা বন্ধ রাখবেন।ব্যাপরটা কি? ব্যাপারটা কি না জিজ্ঞেস করার জন্যেই তো পঞ্চাশ টাকা। আবার বলেন ব্যাপারটা কি? বাড়ি কোথায় ভাই আপনার? কর্মচারী চুপ করে গেল।ক্যাসেট ডেক ভদ্রলোকের পছন্দ হল। মুখে সে কিছু বলল না তবে পছন্দ যে হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। চোখ চক চক করছে। চোখের পাতা ঘন ঘন কাঁপছে। কামাল মনে মনে বলল, হারামজাদা লোভী।
ভদ্রলোক বললেন, কত চান আপনি?
কামাল বলল, এর আসল দাম আপনি জানেন?
আপনি কত হলে দিতে পারেন শুনি।
পনের হাজার।
আপনি পাগল না-কি, ব্ল্যাক মার্কেটের জিনিস চাচ্ছেন পনের হাজার।
ব্ল্যাক মার্কেটের বলেই পনের চাচ্ছি—আসল দাম চল্লিশ।
আমি ছয় হাজার দিতে রাজি।
কত বললেন?
ছয়।
রাগে কামালের ব্ৰহ্মতাল জ্বলে গেল। হারামজাদা বলে কি?
রাজি থাকলে বলেন আমি এক্ষুনি দিয়ে দিচ্ছি ক্যাশ।
এই দামাদামি কার কাছে শিখছেন ভাইসাব?
কি বললেন?
না বলব আবার কি?
ব্ল্যাক মার্কেট করছেন এইটাই তো অপরাধ তার ওপর আবার প্রফিট করার চেষ্টা।
তা তো ঠিকই।
আপনাকে তো পুলিশেও ধরিয়ে দিতে পারি। পারি না?
জ্বি পারেন। কেন পারবেন না?
সাড়ে ছয় পাবেন।
কামাল মধুর ভঙ্গিতে হাসল। ভদ্রলোক বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে যান, সাত হাজার। ক্যাশ দিয়ে দিচ্ছি। রাজি থাকলে বলেন হ্যাঁ।রাজি আছি। বিকালে আসব টাকা জোগাড় রাখবেন।বিকালে আসতে হবে না এখনই দিয়ে দিচ্ছি। আপনার লোককে বলুন ফিট করে দিক।এটা তো দেওয়া যাবেনা। আরেক জনকে দেখাতে নিয়ে যাব। আমার তিনটা সেট আছে তিনটাই বেচতে হবে।
একই জিনিস?
জ্বি একই জিনিস। একই কোম্পানি। একই মাল।
ওদের কাছে কততে বেচবেন।
যত পাওয়া যায়। তবে সাত পর্যন্ত আসলে ছেড়ে দেব। বেশি লোভ করতে নাই।
আপনি নিজে কত দিয়ে কিনেছেন?
কামাল মধুর ভঙ্গিতে হাসল। ভদ্রলোক বললেন, এইটাই রেখে যান। অন্য সেট কাস্টমারদের দেখান।অন্য দুই সেট আছে টঙ্গিতে। আবার টঙ্গি যাব? বিকেলে আমি নিয়ে আসব। জিনিস দেখে ফিট করে তারপর টাকা দিবেন। আমি ভাই এক কথার মানুষ।কামাল সন্ধ্যার পর ঐ বাড়িতে উপস্থিত হল। ভদ্রলোক চিন্তিত হয়ে অপেক্ষা করছেন। এটাই স্বাভাবিক। কামালকে দেখেই উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, জিনিস কোথায় সেটা শুনি।আপনার এখান থেকে গেলাম না? ভদ্রলোক জিনিস দেখে মুগ্ধ। এক কথায় বার হাজার দিতে রাজি। আমি তিনটাই খালাস করে দিলাম পঁয়ত্রিশ হাজারে।সে কি? তিনটাই কিনে নিলেন?
জ্বি। আমি ভাবলাম খবরটা আপনাকে দিয়ে যাই। বলে গিয়েছিলাম, অপেক্ষা করে আছেন।এই খবরে আমার লাভটা কি? বার হাজার তো আমিও দিতে পারতাম।আপনি তো ভাই দিতে চান নাই। আপনি বলেছেন সাত।ভদ্রলোক মুখ কালো করে বসে রইলেন। কামাল বলল, ভাইসাব মন খারাপ করবেন না, এই রকম চালান যদি আরো আসে আপনাকে খবর দিব। আমি আপনাকে কথা দিলাম যে দাম আপনার সাথে ঠিক হয়েছে ঐ দামেই দিব। সাত হাজার। আমি এক কথার মানুষ।কবে আসবে এরকম চালান?
তার কি ভাই কোনো ঠিক আছে? কালও আসতে পারে, আবার ধরেন দুই মাসও লাগতে পারে। তবে আপনাকে কথা দিচ্ছি আসামাত্র আপনাকে টেলিফোন করব। আমি এক কথার মানুষ।ভদ্রলোক মন খারাপ করে বসে রইলেন। কামাল হৃষ্টচিত্তে বেরিয়ে এল। হারামজাদা টোপ গিলেছে। এখন টেলিফোন করলেই পকেটে টাকা নিয়ে ছুটে আসবে। টঙ্গি আসতে বললে টঙ্গি আসবে। জয়দেবপুর যেতে বললে যাবে জয়দেবপুর। তবে টেলিফোন করতে হবে মাস খানেক পরে। দু এক দিনের মধ্যে করলে সন্দেহ করতে পারে। লোভ, লোভ। শালা ললাভের জন্যে মারা পড়ছিস। লোভটা একটু কমা। একটু না-কমালে ধনে প্রাণে যাবি।
বিজু মুরাদকে ধরে এনেছে।কলেজে যাওয়ার পথে সে মুরাদকে প্রথম এক ঝলক দেখতে পায়। সে আমজাদের চায়ের দোকানে বসেছিল। বিজুকে দেখেই চট করে সরে পড়ল। বেশি দূর যেতে পারল না। বিজু ছুটে গিয়ে ধরে ফেলল, পর মুহূর্তেই প্রচণ্ড এক চড় বসাল। এমন প্ৰচণ্ড চড় যে, মুরাদ উলটে পড়ে মাথায় চোট খেল। এক ভদ্রলোক আঁতকে উঠে বললেন, করেন কি?
বিজু বলল, কি করছি দেখতে পাচ্ছেন না, আর দিচ্ছি। আপনার বাসা থেকে টাকা নিয়ে পালালে আপনি কি করতেন? কোলে নিয়ে চুমু খেতেন? কি চুমু খেতেন কোলে নিয়ে? ভদ্রলোক কথা বললেন না। বিজু মুরাদের চুল ধরে টানতে টানতে বাসায় নিয়ে এল। তার মূর্তি ভয়ঙ্কর। ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে। মাঝে-মাঝে হিংস্র গলায় বলছে, তোর বাপের নাম ভুলিয়ে দেব। এত বড় সাহস। বাজারের টাকা নিয়ে উধাও। মামদোবাজি? সোমা ব্যাপার দেখে স্তম্ভিত। এক জন মানুষ অন্য এক জনকে এমনভাবে মারতে পারে? সোমা বলল, এই সব কী হচ্ছে?
বিজু বলল, আদর হচ্ছে। হারামজাদাকে আদর করছি।
সোমা কড়া গলায় বলল, ছাড়—ওর চুল ছাড়।
তুমি এখান থেকে যাও তো আপা।
তুই ওর চুল ছাড়।
বললাম তো–তমি এখান থেকে যাও।
ওকে ছেড়ে দে বিজু।
তুমি বড় যন্ত্রণা করছ আপা।
তুই ওকে না ছাড়লে আমি এই মুহূর্তে বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।
বিজু চুল ছেড়ে ছিল। সোমা বলল, তুই এসব কী শুরু করেছিস?
চোরকে ধরে কয়েকটা চড় দিয়েছি, এর বেশি কী করলাম?
বড় চাচাকে তুই কী বলেছিস?
বড় চাচার কথা এখানে আসছে কেন?
তুই কী বলেছিস বড় চাচাকে?
কী বলব, কিছুই বলি নি।
কিছুই বলিস নি তা হলে উনি এরকম করছেন কেন?
কীরকম করছেন?
তাও জানিস না?
তুমি বড় চেঁচামেচি করছ আপা। এত চেঁচামেচি করার তো কিছু হয় নি, তুমি অনেক কিছু করছ যা আমার পছন্দ না। কিন্তু কই আমি তো চেঁচামেচি করছি না। আমি তো চুপ করে আছি।সোমাচাপা স্বরে বলল, আমি কী করেছি? ঐ হারামজাদা প্রফেসরের বাসায় তুমি যাও নি? এত কিছুর পরও তো গিয়েছ। হেসে হেসে গল্পগুজব করেছ। কর নি?জাহানারা বের হয়ে এলেন। কঠিন স্বরে বললেন, যথেষ্ট হয়েছে। বিজু ঘরে যা।
বিজু ঘরে ঢুকে গেল। হাত-মুখ ধুয়ে সহজ-স্বাভাবিক গলায় বলল, চা দে তো ঊর্মি। আজ ক্লাসটা মিস হয়ে গেল। ইম্পৰ্টেন্ট ক্লাস ছিল। তুই কলেজে যাস নি কেন রে? কলেজ বন্ধ।আজ আবার কীসের বন্ধ? যন্ত্রণা হল দেখি। দুই দিন পর পর বন্ধ? তোদর কলেজের অবস্থা তো দেখি আমাদেরটার চেয়েও খারাপ।বিজু সহজ ভঙ্গিতে কথা বলছে। একটু আগের ঘটনার কোনো ছাপ তার মধ্যে নেই। আবার কলেজের দিকে রওনা হবার আগে সে সোমাকে বলল, আপা, তোমার টবের এই গাছ দুটা চমৎকার। বগনভিলিয়ার এত সুন্দর কালার হয় জানাই ছিল না। একসেলেন্ট।
সোমা জবাব দিল না।বিজু নিচু গলায় বলল, মাঝে-মাঝে হট ব্রেইনে কি বলে ফেলি কিছু মনে রেখ। না আপা। আর ঐ পিচ্চিকে পাঁচটা টাকা দিয়ে দিয়েছি। দেখ গিয়ে ও দাঁত বের করে হাসছে। মারধরে ওদের কিছু হয় না। মারধর ওদের ডাল ভাত।দুপুরে সোমা বড় চাচাকে দেখতে গেল। তিথি কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, বাবার বোধহয় মাথাই খারাপ হয়ে গেছে আপা। ঐদিন বিজু ভাই কি-সব বলে গেছেন। তারপর থেকে……
সোমা বলল, চাচি নেই?
মা সাত দিন আগে রাগারাগি করে ঐ যে বড় মামার বাসায় গেছেন আর আসছেন না। কী করি বল তো আপা?
বড় চাচার অবস্থার কথা চাচি জানেন?
জানেন। আমি নিজে গিয়ে বলেছি।
চাচি কী বললেন?
কিছুই বলেন না।
সোমা বড় চাচার ঘরে ঢুকল। তিনি একদৃষ্টিতে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, কে, সোমা না?
জ্বি।
ভালো আছিস মা?
জ্বি ভালোই তো?
শরীরটা ভালো তো?
জ্বি ভালো।
শরীরটা ঠিক রাখবি। শরীর ঠিক রাখাটা খুবই দরকার। শরীরটা নষ্ট হয়ে গেছে—তাই আমার এই অবস্থা। শরীর ঠিক থাকলে তিথির তিন মামাকে কি করতাম দেখতে পেতিস। ধরে ধরে আছাড় দিতাম। তিনটাই বদ। মহা বদ। দুটো কাঁচাপয়সার মুখ দেখে মনে করছে দুনিয়া কিনে ফেলেছে। দুনিয়া কেনা এত সস্তা না। ফেরাউন বাদশা কিনতে পারে নি। তার তো টাকার অভাব ছিল না। ব্যাটা তোদের কটা টাকা হয়েছে বল দেখি? দুটো ব্যাঙের আধুলি পেয়ে মনে করেছিস কি? তোদের মুখে আমি পেচ্ছাব করে দিইইয়েস পেচ্ছাব। স্ট্রেট পেচ্ছাব করে দেব। তখন বুঝবি কত ধানে। কত চাল? তোরা ভেবেছিস কী? দুই মণ ধানে দুই মণ চাল? উঁহু, এত সহজ না। দুই মণ ধানে এক মণ চাল–খুব বেশি হলে দেড় মণ……
বড় চাচা অনবরত কথা বলে যাচ্ছেন। এক মুহূর্তের জন্যেও থামছেন না। তিথি ও মিথি দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে তাদের মুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। মিথি হাত ইশারা করে সোমাকে ডাকছে।সোমা উঠে গেল বড় চাচার কথা বলা বন্ধ হল না। তিনি কথা বলেই যাচ্ছেন। মিথি বলল, কি করব আপি? বড় চাচিকে নিয়ে আয়। কিংবা তোর কোনো মামাকে আন। ভয় নেই আমি এখানে আছি।বাবা কি পাগল হয়ে গেছেন?
আরে না, মানুষ এত সহজে পাগল হয় না। মাথাটা গরম হয়েছে। ওষুধপত্র খেলে ঠিক হয়ে যাবে। যা তোরা দুজনে মিলে চলে যা।মিথিরা চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় চাচা বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। বেশ আরামের ঘুম। তাঁর নাক ডাকতে লাগল।সোমা পাশেই বসে রইল। তার কিছুই করার নেই। একটা বই হাতের কাছে থাকলে বসে বসে পড়া যেত। অনেক দিন বই পড়া হয় না। বই পড়তে কেমন লাগবে এখন কে জানে। বিকেলের দিকে একবার কি যাবে বই আনতে? না থাক। যন্ত্ৰণা বাড়িয়ে লাভ নেই। এমনিতেই অনেক যন্ত্ৰণা।
সোমার বড় চাচি তাঁর ছোট ভাইকে নিয়ে সন্ধ্যার আগে আগে ফিরলেন। বড় চাচা তখনো ঘুমে। সোমা নিজের ঘরে চলে এল। ঘুমন্ত মানুষের পাশে থেকে থেকে তারও ঘুম পাচ্ছে। সারা দিন সে কিছুই করে নি। তবুখুব ক্লান্ত লাগছে। সে খানিকক্ষণ ঘুমুবে। ঊর্মিকে বলে দেবে তাকে যেন ডাকা না হয়। রাতের খাবার সময়ও যদি দেখা যায় তার ঘুম ভাঙে নি তবু যেন ডাকা না হয়। এক রাত না খেলে কিছু হয় না।সোমা কতক্ষণ ঘুমিয়েছিল সে বলতে পারবে না, তার কাছে মনে হল শুধু তার চোখ একটু লেগেছে ওমনি যেন ঊর্মি এসে তার গা ঝাঁকাচ্ছে, আপা ওঠ তো। প্লিজ ওঠ।
সোমা বিরক্ত গলায় বলল, তোকে কী বলেছিলাম? আপা ওঠ, দরকার আছে। প্লিজ।সোমা উঠে বসল। ঘর অন্ধকার। বারান্দায় বাতিও জ্বালানো হয় নি। দরজা-জানালা লাগানো।তুমি অনেকক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছ আপা। এখন সাড়ে নটা বাজে।সত্যি? হ্যাঁ সত্যি। তবে তোমাকে ঘুম থেকে তুলেছি অন্য কারণে। প্রফেসর সাহেব এসেছেন।কে এসেছেন? প্রফেসর সাহেব। ঐ যে দোতলা বাড়ির। সন্ধ্যার পর পর এসেছেন। আর যেতে চাচ্ছেন না। আমি এতক্ষণ গল্প করলাম। গল্প আমার পেটে যা ছিল সব শেষ। তিনিও চুপচাপ বসে। আমিও চুপচাপ। আপা হাত মুখে একটু পানি দিয়ে চলে এস।
সোমা কখনো ভাবে নি যে, সে বসার ঘরে ঢুকতেই তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবেন। যেন সোমা এক জন খুব সম্মানিত মহিলা। সোমার ভীষণ লজ্জা লাগল।সে নিচু গলায় বলল, আপনি বসুন।ঊর্মি বলছিল, তোমার শরীর ভালো না। সন্ধ্যা থেকে ঘুমুবার সময় বলে গেছ-তোমাকে যেন ডাকা না হয়। আমি তাই অপেক্ষা করছিলাম।সোমা কি বলবে ভেবে পেল না। বসার ঘরের অবস্থা কি হয়ে আছে। উনি আসবেন জানলে সে ঘর গুছিয়ে রাখত।প্রফেসর সাহেব নরম গলায় বললেন, তোমার ঘোটবোনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে খুব হাসছিলাম। ও যে এত মজার মজার গল্প জানে—আশ্চর্য। মেয়েরা সাধারণত রসিকতা করতে পারে না। কিন্তু ও দেখলাম সুন্দর রসিকতা করে।আপনাকে কি ও চা দিয়েছে?
হ্যাঁ তিন বার দিয়েছে। আর চা খাব না, তোমার সঙ্গে কয়েকটা কথা বলে চলে যাব।বলুন।তুমি এত দূরে বসেছ কথা বলতে হলে তো চেচিয়ে বলতে হবে। কাছে এস।সোমা এগিয়ে এল।নিজেদের বাড়িতে তুমি এত লজ্জা পাচ্ছ কেন বল তো? লজ্জা পাচ্ছি না।আমি যে জন্যে এসেছি সেটা বলে চলে যাই। তুমি খুবই অস্বস্তি বোধ করছ। তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলা আমার উদ্দেশ্য নয়। আচ্ছা শোন, ঐ দিন যে তুমি আমার বাসায় গিয়েছিলে তা নিয়ে কি কোন সমস্যা হয়েছে? না। সমস্যা হবে কেন? গত কাল সন্ধ্যায় তোমার বাবা আমার বাসায় এসেছিলেন। কাজেই মনে হল হয়তো কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। আমার মনটা খুব খারাপ হয়েছে। তোমার বাবাকে সেটা বুঝিয়ে বললাম।
বাবা আপনার কাছে গিয়েছিলেন?
তুমি জান না?
না।
হ্যাঁ গিয়েছিলেন। তিনি তোমাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত। তোমার আগের হাজব্যান্ড না-কি খুব বিরক্ত করছে তোমাকে? না তো।তোমার বাবা তোতাই বললেন। রাত দশটা-এগারটার দিকে বাসার সামনে দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে। ক্রিমিনাল নেচারের মানুষ, তাই তোমার বাবা ভয় পাচ্ছেন। যদি কোনো ক্ষতিটতি করার চেষ্টা করে।ও কোনো ক্ষতিটতি করার চেষ্টা করবে না।
না করলে তো ভালোই। তোমার বাবাকে সেই কথা বললাম। এবং আরো একটা কথা বললাম; সেই কথাটা তোমাকেও বলা দরকার। কথা ঠিক না, এক ধরনের আবেদন বলতে পার। আমি তোমার বাবাকে বলেছি যে, আপনার বড় কন্যাকে আমি খুবই পছন্দ করি। তার জীবনের ভয়াবহ দুর্যোগের জন্যে আমি পরোক্ষভাবে হলেও দায়ী, কাজেই……. সোমা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
Read more
