গারােদের ধুতি পরা মনিশংকর বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যেককেই আলাদা করে বলছেন, শেখের পাে’রা প্রাসাদ না নিয়া কেউ যাবে না । সইন্ধ্যাকালে বাইজি নাচ হবে। দলে–বলে আসবা। মেয়েছেলেদের জন্যে চিকের পর্দার ব্যবস্থা আছে।
পূজা নিয়ে জুলেখার সংসারে বিরাট অশান্তি শুরু হলাে। জুলেখা স্বামীর কাছে বায়না ধরেছে পূজা উপলক্ষে তাকে নতুন লাল শাড়ি দিতে হবে। সুলেমান বিস্মিত হয়ে বলেছে, তােমারে শাড়ি দিব কেন ? তুমি কি হিন্দু ?
জুলেখা বলল, ঈদেও শাড়ি দেন নাই। …………পয়সার অভাবে দিতে পারি নাই। এখন তাে পয়সা হইছে। নয়া বাবুর কাম করেছেন। এখন দেন। ……….সুলেমান মহাবিরক্ত হয়ে বলেছে, পূজার সময় শাড়ি দেয়া ইসলামধর্মে নিষেধ আছে। বিরাট পাপ হয়। যে শাড়ি দিবে সে যেমন পুলসেরাত পার হইতে পারবে না, যে শাড়ি পরবে সেও পারবে না।
আপনেরে বলছে কে? ……..বলাবলির কিছু নাই। সবাই জানে। প্রয়ােজনবােধে জুম্মাঘরের ইমাম সাবরে জিগাইতে পার। ………আমার একটা মাত্র শাড়ি। ভিজা শাড়ি শরীরে শুকাইতে হয়। …….সুলেমান দরাজ গলায় বলল, পূজার ঝামেলা শেষ হােক, একটা শাড়ি কিন্যা দেব ।
লাল শাড়ি। ……সন্তান হওনের পর লাল শাড়ি পরা নিষেধ। জিন–ভূতের নজর থাকে লাল শাড়ির দিকে। তারপরেও দেখি বিবেচনা করে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ
জুলেখার লাল শাড়ির শখ অদ্ভুত উপায়ে মিটে গেল। মনিশংকর বাবু পূজা উপলক্ষে বিতরণের জন্যে একগাদা শাড়ি নিয়ে এসেছিলেন। পূজার দ্বিতীয় দিনে তিনি আঁকাভর্তি শাড়ি নিয়ে বিতরণে বের হলেন । হিন্দু মুসলমান বিবেচনায় না। এনে সবাইকে শাড়ি দিতে লাগলেন। জুলেখার বাড়ির সামনে যখন এসে দাঁড়ালেন তখন দুপুর। জুলেখা পুকুরে গােসল সেরে ভেজা শাড়িতে উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে। সুলেমান বাড়িতে নেই। তার ছেলেও বাড়িতে নেই। মনিশংকরকে দেখে গায়ে লেপ্টে থাকা ভেজা শাড়ির জন্যে তার লজ্জার সীমা রইল না। তার ইচ্ছা করল আবার ঝাপ দিয়ে পুকুরে পড়তে।
মনিশংকর বললেন, মাগাে, আমি আপনার পুত্র। পুত্রের কাছে মাতার লজ্জার কিছু নাই। দেবী দুর্গা আপনার জন্যে সামান্য উপহার পাঠিয়েছেন। গ্রহণ করলে ধন্য হবাে। ……..জুলেখা বলল, কে পাঠায়েছেন ? আমার মাধ্যমে দেবী দুর্গা পাঠিয়েছেন। আমি মুসলমান। জানি। মাগাে, পছন্দ করে একটা শাড়ি নেন।
জুলেখা কাঁপা কাঁপা হাতে একটা শাড়ি নিল । তার কাছে মনে হলাে সে তার জীবনে এত সুন্দর শাড়ি দেখে নি । জবাফুলের মতাে লালশাড়ি। আঁচলে সােনালি ফুল। ফুলগুলি থেকে সােনালি আভা যেন ঠিকরে পড়ছে। শাড়ি নিয়ে সুলেমান কোনাে ঝামেলা করল না। পূজার পরে তাকে শাড়ি কিনে দিতে হবে এই স্বস্তিই কাজ করল।
হরিচরণের বাড়িতে মনিশংকর উপস্থিত হয়েছেন। তার হাত ধরে আছে পুত্র শিবশংকর। ছেলেটা বাবার ন্যাওটা। বাবাকে ছেড়ে একমুহূর্তও থাকতে পারে না। পূজাবাড়ির হৈচৈ ফেলে সে বাবার হাত ধরে ঘুরছে।
হরিচরণ ব্যস্ত হয়ে উঠানে এসে দাঁড়াতেই মনিশংকর বললেন, আমার বাড়িতে মা এসেছেন। আপনি নাই কেন? …………হরিচরণ বললেন, আমি কীভাবে যাব ? আমি পতিতজন।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ
মনিশংকর বললেন, মা‘র কাছে কেউ পতিত না। আমি আপনাকে নিতে এসেছি। ……….পূজামণ্ডপে আমি উপস্থিত হলে অন্যরা আপনাকে ত্যাগ করবে। …….অন্যরা ত্যাগ করলে করবে। মা আমাকে ত্যাগ করবে না। আপনি যদি আমার সঙ্গে না যান আমি কিন্তু আপনার উঠানে উপবাস করব ।
দীর্ঘদিন পর হরিচরণের চোখে পানি এসে গেল। মনিশংকর ছেলেকে বললেন, যাও কাকাকে প্রণাম কর। ………..হরিচরণ আঁৎকে উঠে বললেন, না। না।। …মনিশংকর বললেন, আপনি অতি পূণ্যবান ব্যক্তি। আপনাকে প্রণাম না করলে কাকে করবে!
মূল মণ্ডপের বাইরে উঠানে হাঁটুগেড়ে জোড় হস্তে হরিচরণ বসেছেন। তাঁর চোখ বন্ধ। ঘণ্টা এবং ঢাকের আওয়াজ কানে আসছে। নাকে আসছে ধূপের গন্ধ। তার উচিত দেবী দুর্গার বন্দনা করা। তিনি একমনে বলছেন, কৃষ্ণ কোথায় ? আমার কৃষ্ণ! কৃষ্ণ।
এইসময় একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। মােটামুটি অপরিচিত লােকজনের মধ্যে পরিচিত একজনকে দেখে দৌড়ে এসে তার কোলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। জহির। হরিচরণ অনেকদিন আগে দেখা স্বপ্নে ফিরে গেলেন। তাঁর মনে হলাে, সত্যি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ তার কোলে। জ্ঞান হারিয়ে উঠানে পড়ে গেলেন। চারদিকে হৈচৈ পড়ে গেল। পূজারি ঠাকুর ঘােষণা করলেন, ধর্মচ্যুত মানুষ দেবীর কাছাকাছি আসায় এই বিপত্তি। দেবী বিরক্তি হয়েছেন। দেবীর বিরওি দু। করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। আলাদা পূজাপাঠ লাগবে।
হরিচরণ দুর্বল শরীরে শুয়ে আছেন। তাঁকে দেখতে এসেছেন শশী। ভট্টাচার্য। ডাক্তার কবিরাজের মতাে গম্ভীর ভঙ্গিতে নাড়ি ধরে থেকে বলেছে, আপনার কি মৃগী আছে ? হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া মৃগীর লক্ষণ।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৫)-হুমায়ূন আহমেদ
আমার মৃগী নাই। ……..নাই, হতে কতক্ষণ ? সাবধানে থাকবেন। একডােজ ওষুধ দিচ্ছি, খেয়ে ঘুমিয়ে থাকুন। ওষুধের কারণে সুদ্রিা হবে। ক্লান্তি দূর হবে। …….হরিচরণ বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি ডাক্তারি কর না–কি ? …শশী ভট্টাচার্য বললেন, আমি শখের চিকিৎসক। বায়ােকেমিক চিকিৎসা করি । বায়ােকেমিক চিকিৎসা বিষয়ে কি আপনি কিছু জানেন ?
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
