গানের কথাগুলি জুলেখা এখনই তৈরি করল । তার এত ভালাে লাগল। তার বাপজানের গুণ কি তার মধ্যে আছে ? কোনােদিন কি সে তার বাপজানের মতাে মুখে মুখে গান বাঁধতে পারবে? মাওলানা ইদরিস খুতবা পাঠ শেষ করলেন। মুসুল্লিদের দিকে তাকালেন। মাত্র নয়জন। তার হিসেবে আরাে বেশি হবার কথা। কাঠমিস্ত্রি সুলেমান তার পুত্রকে নিয়ে এসেছে।
এটা ভালাে। সুলেমান সবসময় আসে না। মাঝেমধ্যে একা আসে, ছেলেকে আনে না। শিশুদের শুরু থেকেই ধর্মকর্মে আগ্রহী করা পিতা মাতার কর্তব্য। যে পিতা–মাতা এই কর্তব্যে অবহেলা করবেন রােজ হাশরে তাদের জন্যে কঠিন শাস্তির বিধান আছে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-২০-হুমায়ূন আহমেদ
মাওলানা বললেন, আপনাদের জন্য সামান্য শিন্নির ব্যবস্থা আছে। মাওলানা শিন্নির হাঁড়ি এবং চামচ নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুসুল্লিরা কলাপাতা হাতে নিলেন। নবিজি মিষ্টি খেতে পছন্দ করতেন। নবিজির পছন্দের জিনিস করা তাঁর উম্মতের জন্যে সােয়াবের কাজ। | শিন্নি মাওলানা নিজেই তার বাড়িতে প্রস্তুত করেছেন। দুধ, আলােচাল, গুড়, সঙ্গে কিছু কিশমিশ এবং তেজপাতা।
খাটি দুধ। দীর্ঘসময় জ্বাল হয়ে অপূর্ব স্বাদু বস্তু তৈরি হয়েছে। সবাই আগ্রহ করে খাচ্ছে। মাওলানা দ্বিতীয়বার শিন্নি দিতে দিতে বললেন, আল্লাহপাক আমার উপর বড় একটা দয়া করেছেন বলেই এই শিন্নির ব্যবস্থা। আপনারা আমার জন্যে আল্লাহপাকের দরবারে দোয়া করবেন। সবাই হা–সূচক মাথা নাড়ল। কেউ জানতে চাইল না— বড় দয়াটা কী ?
মধ্যাহ্ন-পর্ব-২০-হুমায়ূন আহমেদ
মাওলানা নিজেই খােলাসা করলেন। তিনি কোরান মজিদ পুরােটা মুখস্থ করেছেন। এখন তাকে কোনাে আলেম হাফেজের কাছে যেতে হবে। তাঁকে কোরানমজিদ মুখস্থ শােনাতে হবে। হাফেজ সাহেব যদি বলেন ঠিক আছে, তাহলে নামের শুরুতে তিনি হাফেজ টাইটেল ব্যবহার করবেন। তার টাইটেল হবে হাফেজ মাওলানা ইদরিস।
জীবনের একটা আকাঙ্ক্ষাই তখন অপূর্ণ থাকবে— নবিজির মাজার জেয়ারত। হজু তার জন্যে ফরজ না। তিনি বিত্তহীন সামান্য মাওলানা । হজে তাঁর না গেলেও হবে, কিন্তু নবিজির মাজার জেয়ারত করা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন । তিনি নবিজির মাজারের কাছে যাবেন, দু‘ফোঁটা চোখের জল ফেলে বলবেন, হে জগতের আলাে, পেয়ারা নবি! আসসালামু আলায়কুম। আমি আল্লাহপাকের
নাদান বান্দা গুনাগার ইদরিস। যে পাক কোরান আপনার মাধ্যমে দুনিয়াতে এসেছে সেই পাক কোরান আমি মুখস্ত করেছি। আমার দিলের একটা খায়েশ আপনেরে কোরান মজিদ আবৃত্তি করে শােনাব। যদি অনুমতি দেন।
জুমার নামাজ শেষ করে মাওলানা নিজের ঘরে ফিরেছেন। আজকের দিনটি স্মরণে যেন থাকে এইজন্যে বাড়ির দক্ষিণ দিকে একটা লিচুগাছের চারা লাগালেন। গাছ বড় হবে‘। একসময় ফল আসবে। নবিজি গাছ রােপণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। একবার এক হত্যাঅপরাধীর মৃত্যুদণ্ড রদ করে গাছ রােপণের দণ্ড দিয়েছিলেন। তার শাস্তি হয়েছিল সে একশ’ খেজুর গাছ লাগাবে এবং প্রতিটি গাছকে সেবাযত্নে ফলবতী করবে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-২০
এই অঞ্চলে লিচুগাছ নেই। হিন্দুবাড়িতেও নেই, মুসলমান বাড়িতেও নেই। লােকজ বিশ্বাস— বসতবাড়ির আশেপাশে লিচুগাছ লাগানাে যাবে না। লিচুগাছ মানুষকে নির্বংশ করে। মাওলানার চালাঘরটা সুন্দর । উঠানে একটা পাতা পড়ে নেই। দু‘বেলা এই উঠান মাওলানা নিজে ঝাট দেন। সপ্তাহে একদিন গােবর–মাটির মিশ্রণ লেপে দেন। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতার উপর ইসলাম ধর্মে অনেক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
লিচুগাছ লাগানাের পরপরই মাওলানা অনুভব করলেন তাঁর জ্বর আসছে। শরীর কেমন যেন করছে। গা গুলাচ্ছে। বমি আসছে। আজকের দিনের অতিরিক্ত উত্তেজনায় কি এমন হচ্ছে? মাওলানা ঘরে এসে শুয়ে পড়লেন। দীর্ঘ কয়েক বছর পর আজ প্রথম তার আসরের নামাজ কাজা হলাে। মাগরেবের নামাজ কাজা হলাে। বমি করে তিনি ঘর নষ্ট করলেন, নিজের পায়জামা–পাঞ্জাবি নষ্ট করলেন।
একজন কোরানে হাফেজ অপবিত্র থাকতে পারেন না। তাঁকে সবসময় অজুর মধ্যে থাকতে হবে। কারণ তার শরীরে পবিত্র কোরান মজিদ। তিনি জ্বর গায়েই গােসল করলেন। ধােয়া পায়জামা–পাঞ্জাবি পরলেন।
সুলেমানের বাড়ি অন্ধকার। সন্ধ্যার পরপর বাড়িতে আলাে দিতে হয়। সন্ধ্যায় আলাে না দিলে বসতবাড়িতে ভূত–প্রেত ঢােকে। খারাপ বাতাস কপাটের পেছনে স্থায়ী হয়ে যায়। সুলেমানের স্ত্রী জুলেখা বাড়ির পেছনের উঠানের জলচৌকিতে বসে আছে। তার হাতের কাছে কুপি, সে এখনাে কুপি ধরায় নি। সন্ধ্যা থেকে কাঁদছিল, এখন কান্না বন্ধ। গালে পানির দাগ বসে গেছে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-২০
আজ তাকে কঠিন শাস্তির ভেতর দিয়ে যেতে হবে তা সে জানে। শাস্তি কী হবে জানে বলেই অশান্তি। আজ সে অপরাধও করেছে গুরুতর। দুপুরে যখন ঘরে কেউ ছিল না (সুলেমান গেছে হাটে। তার পুত্র গেছে হরিচরণের বাড়িতে হাতি দেখতে।) তখন সে বাড়ির পেছনের পুকুরে গােসল করতে গেল। পুকুর ঠিক না, বড়সড় ডােবা। বর্ষায় পানি হয়। সুলেমান কাঠের কয়েকটা গুড়ি ফেলে ঘাটের মতাে করে দিয়েছে। ডােবার চারদিকেই ঘন জঙ্গল। আব্রু রক্ষার আলাদা ব্যবস্থার প্রয়ােজন নেই। জুলেখা গােসল করতে ঘাটে গেল। পানিতে নামল সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে। গায়ে কোনাে কাপড় ছাড়া পানিতে ভেসে থাকার অন্যরকম আনন্দ। কেউ
তাে আর দেখছে না। জুলেখা অতি রূপবতীদের একজন। আজ তাকে আরাে সুন্দর লাগছে। শখর মতাে শাদা গা থেকে অলাে ঠিকরে আসছে। খাড়া নাক আজ অনেক তীক্ষ লাগছে। বড় বড় চোখ । ছায়াদায়িনী দীর্ঘ পল্লব যেন আরাে গাঢ় হয়েছে। পান না খেয়েও ঠোট লাল। মাথার চুল ঈষৎ পিঙ্গল। সেই চুল নেমে এসেছে। হাঁটু পর্যন্ত । …….বাড়ির সীমানার বাইরে যাওয়া জুলেখার নিষেধ । বাপের দেশে নাইয়র যাওয়াও নিষেধ।
Read More
