দীপাবলী ছবি থেকে চোখ সরিয়ে বলল, ‘এইসব নাম আমি বইয়ে পড়েছি।
শমিত মাথা নাড়ল, ‘আমিও। তবে অনেকেই ওঁর অভিনয় দেখেছেন অনেকবার। ওঁর সঙ্গে অভিনয় করা মানুষেরও অভাব নেই শহরে। বসাে।। তিনটে বেতের চেয়ারের মাঝখানে ছােট টেবিল । দীপাবলী বসল । উল্টোদিকে শমিত। দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, বাড়িতে কেউ নেই ?
নাঃ মা গিয়েছে তার বােনের বাড়িতে। চা-ফা খাওয়াতে পারব না। শমিতের এইরকম কথা বলা ভাল লাগে দীপাবলীর । সে হাসল, ‘আমার চায়ের নেশা এখনও তীব্র নয়। আমি কিন্তু অন্য প্রয়ােজনে এসেছি।
‘শােনা যাক। প্রয়ােজন ছাড়া আজকাল কেউ কারাে কাছে আসে না। ‘সে কি! আপনি যে আমার জন্যে এত করলেন, এতবার গেলেন তার পেছনে কোন প্রয়ােজন ছিল বলে তাে মনে হয়নি!
‘ছিল। প্রথমতঃ, তােমাকে আমাদের নাটকের দলে টানতে চেয়েছিলাম। ‘ও, শেষ পর্যন্ত হতাশ হয়ে যাওয়া বন্ধ করলেন ? ‘তা ঠিক নয়। ‘প্রথমত বললেন যখন তখন দ্বিতীয় কোনাে ব্যাপার নিশ্চয়ই আছে !
শমিত হঠাৎ হাে হাে করে হেসে উঠল, তােমার উচিত আইন পড়া। চমৎকার প্র্যাকটিস করতে পারবে তাহলে ! বল, প্রয়ােজনটা কি ?
সাতকাহন পর্ব-(১০)
মুখ গম্ভীর হল দীপাবলীর। তারপর বলে ফেলল, আমার একটা চাকরি চাই। আপনি বলেছিলেন স্কুলে ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে কাজ করা যাবে !
‘সে কি। তােমার তত বড় বড় আইডিয়া। আই এ এস, ডব্লু বি সি এস ! ‘আইডিয়াগুলাে মরে যায়নি বলেই পার্মানেন্ট পােস্ট চাইছি না !
“ঠিক আছে, চেষ্টা করব। স্কুলে গিয়ে কথা বলতে হবে। শমিত চোখ বন্ধ করল, ‘তিন চার মাস কিন্তু।
‘তাতেই হবে। তবু তাে একটা কাজ করা যাবে ! ‘হােস্টেল কেমন চলছে ? ‘ঠিক আছে। বৃষ্টির জল পুকুরে পড়লে পুকুরের জল হয়ে যায়। ‘বাঃ। দারুণ।‘ শমিত উঠল, ‘বসাে। ‘কোথায় যাচ্ছেন ? ‘বাড়িতে অতিথি এল, কিছু যােগাড় করি!
দীপাবলী ঝটপট উঠে দাঁড়াল, ‘না, না, আমি কিছু খাবাে না, আপনি একদম ব্যস্ত হবেন । আমার খারাপ লাগছে।
হঠাৎ চোখ স্থির হল শমিতের, ‘দীপা! দীপাবলী অবাক হয়ে তাকাল।।
চোখ না সরিয়ে শমিত বলল, তুমি কি সত্যি কখনাে আমাকে তুমি বলতে পারবে না ? আমি কি এতই অযােগ্য ?
‘হঠাৎ একথা ? ‘জিজ্ঞাসা করছি। ‘যােগ্যতা বা অযােগ্যতার কথা নয়। আপনি বা তুমি বলার মধ্যে পার্থক্য করছেন কেন ?
সাতকাহন পর্ব-(১০)
হঠাৎ সামনে এগিয়ে এসেই নিজেকে সংযত করল, শমিত, ‘না, ঠিক আছে, শােন, আমি তােমাকে আমার জীবনে চাই। পেতে পারি কি ?
ঠিক এইরকম কিছু আন্দাজ আসছিল কিছুক্ষণ। মুখ ফেরাল দীপাবলী । ‘আমি তােমাকে স্পর্শ করব না, কোন জোরজবরদস্তি করব না, তুমি নির্দ্বিধায় না বলতে পার। আমি কিছু মনে করব না।
দীপাবলী কোন কথা বলতে পারছিল না। তার গলা আচমকা শুকিয়ে যাচ্ছিল, গালে রক্ত জমছিল । শমিত সেটা লক্ষ করল। সে বলল, তুমি কি কখনও আমার মনের কথা বােঝনি ? আমি যে বারেবারে তােমার কাছে ছুটে গিয়েছি তা কি শুধু নাটকের প্রয়ােজনে।
তাই তাে বললেন একটু আগে। দীপাবলী মৃদুস্বরে বলল মুখ ফিরিয়ে। ‘সেটা অবশ্যই সত্যি। কিন্তু শেষ সত্যি নয়। দ্বিতীয় প্রয়ােজনটা যখন তােমাকে বলতে পারিনি। হ্যাঁ, আমি আমার জন্যে গিয়েছিলাম ।
‘আপনি তাে আমার সব কথা জানেন।
‘জানি। তুমি বিধবা না কুমারী তাতে আমার কিছু এসে যায় না।’শমিত আরও এগিয়েএল, ‘আমি তােমার ভালবাসা চাই।’
‘সমস্ত শরীরে কাঁটা ফুটল দীপাবলীর, ‘আমি একটু ভাবব। ‘ভালবাসা ভেবে আসে না। ‘না ভেবেও তাে আসেনি ! ‘আমার জন্যে তােমার ভালবাসা আসেনি ?
সাতকাহন পর্ব-(১০)
দীপাবলী জবাব দিল না। শমিত তার দিকে উদ্বেগে তাকিয়ে আছে। সে বলল, “আমি এখন যেতে পারি ?
হঠাৎ শমিত অদ্ভুতভাবে ডুকরে উঠল। তারপর ছুটে গেল ভেতরের ঘরে। বাইরের ঘরে দাঁড়িয়েই দীপাবলী ওর কান্নার শব্দ শুনতে পেল। নাটকের দলে বা বাইরে যে বেপরােয়া অথচ ব্যক্তিত্বপূর্ণ শমিতকে সে দেখেছে তার গলায় ওই শব্দ এই কায়া কিছুতেই মানায় না।
ইচ্ছে সত্ত্বেও শুধু এই কারণে বাইরের দরজা খুলে রাস্তায় নামতে পারল না দীপাবলী। পায়ে পায়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে একটি আটপৌরে শাওয়ার ঘর দেখতে পেল। খাটের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে আছে শমিত। কামার শক ছিটকে উঠছে চাপা মুখ থেকে, পিঠ ওঠানামা করছে। একমুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দীপাবলী খাটের একপাশে বসে ওর পিঠে হাত দিতেই শরীর স্থির হল। দীপাবলী বলল, এমন করবেন না।
সাতকাহন পর্ব-(১০)
হঠাৎ ঘুরে উঠে বসল শমিত। তারপর দীপাবলী কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু-হাত
বাড়িয়ে তাকে বুকে টেনে নিয়ে পাগলের মতাে চুমু খেতে লাগল। আচমকা প্রবল বর্ষণে বট গাছের পাতারাও যেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে তেমনি টালমাটাল হল দীপাবলী। প্রতিরােধ করার চেষ্টা তীক্ষ্ণ হবার আগেই যেন তার শরীর শক্তিশূন্য হয়ে গেল। ততক্ষণে তার ঠোঁট খুঁজে পেয়েছে শমিত। সেই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সে ফিসফিস করল, বল, তুমি আমাকে ভালবাস না?
‘না। দীপাবলী কোন রকমে ঠেটি সরাল।
‘কেন ? আচমকা সমস্ত আক্রমণ গুটিয়ে গেল, শমিত যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। অন্তত ওই মুহূর্তে এমন উত্তর সে আশাই করেনি।
মুক্ত দীপাবলী সরে বলল, ‘আপনি ভুলে যাচ্ছেন মায়া আপনাকে ভালবাসে। ‘মায়া ? আমাকে ! স্তম্ভিত হয়ে গেল শমিত। ‘আপনি জানেন না ? ‘না! তােমাকে বলেছে একথা ? ‘মেয়েরা বুঝতে পারে, বলতে হয় না।’ ‘যা তা বকো না। মায়া আমার বন্ধু, জাস্ট বন্ধু, তার বেশি আর কিছু নয়। ‘আমি বিশ্বাস করি না।‘
তুমি কি মনে করছ মায়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও আমি তােমাকে এসব কথা বলছি ? তুমি আমাকে কি মনে করছ ? | ‘কিছু না। কিন্তু মায়াকে আমি কষ্ট দিতে পারব না। আপনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব নষ্ট হবে না। শুধু আজকের এই ঘটনাটা আমি যেমন ভুলে যেতে চাইব আপনিও যদি ভুলে যান তাহলে দুজনেরই ভাল হবে। চুপচাপ বেরিয়ে এসেছিল দীপাবলী। শমিত ওঠেনি খাট থেকে।
সাতকাহন পর্ব-(১০)
‘তুমি চা খেলে না ? তিরির মুখে প্রশ্নটা উচ্চারিত হতেই দীপাবলী চায়ের কাপের দিকে তাকাল। ইতিমধ্যে সর পড়ে গিয়েছে ওপরে। হাত বাড়িয়ে কাপটাকে ধরতেই বুঝল ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। এখনও চায়ের নেশা তাকে তেমনভাবে পাকড়াও করেনি। সে বলল, ‘নিয়ে যা । খাবাে না।’
আর তখনই বাইরের দরজায় শব্দ হল । তিরি বল ‘ওই লােকটা বােধহয় এসেছে। সে বাইরের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু দীপাবলী পিছু ডাকল, ‘দাঁড়া, তােকে যেতে হবে।
আমি যাচ্ছি।
ভারী পা নিয়ে বাইরের ঘরে এসে কোন প্রশ্ন না করে সে দরজা খুলল। খুলতেই চমকে উঠল সে, আপনি ?
পেছনের দরজায় অন্ধকার আলােয় দাঁড়াননা তিরি দৌড়ে ভেতরে চলে গেল।
অর্জুন নাযেক হেসে বলল, ‘খুব অসময়ে এসেছি, না ? আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। আপনি যদি এখন কথা বলতে না চান তাহলে আমি চলে যাচ্ছি।’
কথা বলার কোন আগ্রহ দীপাবলীব ছিল না। যদিও লােকটা খুবই বিনয় নিয়ে কথা বলছে তবু ওর ঠোঁটের কোণেব সেই চটচটে হাসিটা দেখতে পাচ্ছিল সে হ্যারিকেনের আলােয। লােকটা ধান্দাবাজ এবং নিঃসন্দেহে বদ লােক। কিন্তু হঠাৎ দীপাবলীর জেদ চেপে গেল। সে বলল, আপনি বসতে পারেন।’ একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ধপাস করে বসে দুটো পা ছড়িয়ে যেন আম পেতে চাইল অজুন। এবং তারপরেই যেন খেয়াল হল, পা গুটিয়ে বলল, ‘সবি।
দীপাবলী কথা না বলে উল্টোদিকের চেয়ারে বসে বলল, ‘অফিসের পরে যখন এসেছেন এখন নিশ্চয়ই জরুবি কিছু বলার আছে আপনাৰ ।
Read more
