লিলিয়ান বলল, তুমি আমাকে ক্রমাগত মশার ভয় দেখিয়েছ। মশা কিন্তু নেই। ‘তাই দেখছি। তবে ঘুমুতে হবে মশারি খাটিয়ে। মশা না থাকুক, পােকামাকড় আছে।

আজ রাতে না ঘুমুলে কেমন হয়? ‘কি বললে?” ‘চল আমরা বারান্দায় বসে জোছনা দেখি। ‘আর কোন পরিকল্পনা আছে?”
‘আমার খুব শাড়ি পরতে ইচ্ছা করছে। সুন্দর একটা শাড়ি জোগাড় করতে পারবে? আমাকে শিখিয়ে দেবে কি করে পরতে হয়?
‘তােমার কি মনে হয় না লিলিয়ান তুমি বাড়াবাড়ি করছ?” ‘না, আমার মনে হয় না। ‘আমার কিন্তু মনে হচ্ছে তুমি বাড়াবাড়ি করছ।
লিলিয়ান কিছুক্ষণ স্থির চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, তােমার এ রকম মনে হয়ে থাকলে আমি দুঃখিত। আমার যা মনে হয়েছে আমি তােমাকে বলেছি। তােমাদের এই বাড়িটা ভাঙা। দরজা–জানালা লােকজন খুলে নিয়েছে। তারপরেও এ বাড়িতে পা দেয়ার পর থেকে আমার ভাল লাগছে। এক ধরনের আনন্দ অনুভব করছি। সেই আনন্দ লুকানাের চেষ্টা করি নি। হয়ত সেটা করাই উচিত ছিল।
লিলিয়ান বারান্দায় চলে গেল। তার খুব খারাপ লাগছে। চোখে পানি এসে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখলে তাহের হেসে উঠতে পারে। লিলিয়ান চোখের পানি দিয়ে তাহেরকে হাসাতে চায় না। লিলিয়ান একটা ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে লাগল। তার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে, ঘরগুলি তাকে ডেকে ডেকে বলছে, এস লিলিয়ান, এস। আমাকে দেখে যাও।তাহের এসে লিলিয়ানকে আবিষ্কার করল সর্বদক্ষিণের বারান্দায়। এখান থেকেই লােহার সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
‘লিলিয়ান! ‘কি?” ‘তুমি কি আমার উপর রাগ করেছ?” “না।”
‘মনে হচ্ছে তুমি রাগ করেছ। আসল ব্যাপার কি জান, আমার চাচার সঙ্গে কথা বলে মেজাজ হয়েছে খারাপ। কিছুই ভাল লাগছিল না। এই কারণেই তােমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি। কিছু মনে করো না।
‘আমি কিছু মনে করি নি। ‘খাওয়া–দাওয়ার পর আমরা ছাদে বসে জোছনা দেখব। ‘ছাদে উঠার সিঁড়ি আছে?” ‘হ্যা, সিড়ি আছে। তালাবন্ধ। চাচার ছেলেটাকে পাঠিয়েছি চাবি আনতে। “থ্যাংক ইউ। ‘তােমার খিদে পেয়েছে লিলিয়ান?” ‘এখনাে খিদে পায় নি।
একটা বিরাট ভুল হয়েছে। ওদের বলে দেয়া উচিত ছিল মসলা কম দিতে। এরা প্রচুর মসলা দিয়ে রান্না করবে। ঝালের জন্যে কিছু মুখে দিতে পারবে না।
‘আমার খাওয়া নিয়ে ভেবাে না। তুমি যা খেতে পারবে, আমিও পারব। ‘সব ঘর দেখা হয়েছে?
‘আয়নাঘর? আয়নাঘর দেখেছ?
‘না তাে। আয়নাঘর কি ?
‘ওটা একটা ইন্টারেস্টিং ঘর। আমার দাদার বাবা – দি গ্রেট জাঙ্গির মুনশি, এই ঘর বানিয়েছিলেন। তালাবন্ধ কি–না জানি না। তালাবন্ধ থাকার কথা। চল দেখি – খুঁজে বের করতে হবে – কোন দিকে তাও জানি না।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
ঘরটা তালাবন্ধ। বেশ বড় তালা ঝুলছে। কয়েকবার ঝাকি দিতেই তালা খুলে গেল। অনেকদিন বন্ধ থাকায় ঘরে ভ্যাপসা জলজ গন্ধ। ছােট্ট ঘর, কোন জানালা নেই। ঘরে ঢােকার একটিই দরজা। সেই দরজাও নিচু। ঘরের একদিকের পুরাে দেয়াল জুড়ে বিশাল আয়না। অন্য পাশে কাবার্ড।
লিলিয়ান বলল, এত বড় আয়না কোথায় পেলেন?
তাহের হাসতে হাসতে বলল, জানি না কোথায় পাওয়া গেছে। দি গ্রেট জাঙ্গির মুনশি জোগাড় করেছিলেন সাহেব বাড়ি থেকে। অর্থাৎ ইংরেজদের কাছ থেকে। এই ঘরটার নাম হল আয়নাঘর। জাঙ্গির মুনশির স্ত্রী তিতলী বেগম এই ঘরে সাজগােজ করতেন। সাজের সময় বাইরের কেউ যেন দেখতে না পায় এ জন্যেই এ–ঘরের কোন জানালা নেই। লক্ষ্য করেছ?
‘হ্যা, লক্ষ্য করেছি।‘
‘ঐ মহিলা অসম্ভব রূপবতী ছিলেন। তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রের জন্মদিনে মারা যান। মাত্র ষােল বছর বয়সে।
‘আহা! ‘আয়নাঘর উনার খুব প্রিয় ছিল। উনি যখন মােটামুটি নিশ্চিত হলেন যে মারা যাচ্ছেন তখন তিনি তার স্বামীকে বলেন তাকে আয়নাঘরে নিয়ে যেতে। তাই করা হল। তিনি মারা গেলেন আয়নাঘরে। জাঙ্গির মুনশি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন নি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি প্রায় চল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
এই চল্লিশ বছর তিনি আয়নাঘর বন্ধ করে রেখেছিলেন। একদিনের জন্যেও খুলেন নি। উনার মৃত্যুর পর আয়নাঘর প্রথম খােলা হয়। এস লিলিয়ান, খুব সম্ভব খাবার নিয়ে এসেছে। খেয়ে নেই। খিদে লেগেছে। তাছাড়া আমার বেশিক্ষণ থাকা ঠিকও নয়। আয়নাঘরে কোন পুরুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ।
‘তুমি যাও। আমি এই ঘরে একটু একা একা থাকি। “কেন বল তাে?
‘আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে ভাল লাগছে। এই দেখ আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে – দেখ, দেখ।
তাহের বিস্মিত হয়ে বলল, হ্যা দেখলাম। কারণটা কি? ‘প্রায় দেড়শ‘ বছর আগে এই বাড়ির বউ এক আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজেকে
দেখেছিল। আজ আমি নিজেকে দেখছি। আমিও এই বাড়িরই বউ। এই আয়নাটা আমার।
তাহের বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। লিলিয়ান বলল, আমি যখন অসুস্থ হয়ে পড়ব তখন তুমি আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসবে। আমি চাই আমার মৃত্যু যেন আয়নাঘরে হয়।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ
‘সে তাে অনেক দূরের ব্যাপার। আপাতত ভাত খাই চল।
“প্লীজ, প্লীজ, আমি খানিকক্ষণ এখানে একা থাকব। খুব অল্প কিছুক্ষণ।
তাহের চিন্তিতমুখে বের হয়ে এল। লিলিয়ান তাকিয়ে আছে আয়নার দিকে। তাহের লিলিয়ানের কাণ্ডকারখানা কিছুই বুঝতে পারছে না।
রান্নার আয়ােজন ভাল। রুই মাছ ভাজা। পােলাও কোরমা। এক বাটি পায়েস। লিলিয়ানের জন্যে একটা কাঁটা চামচও দেয়া হয়েছে। তবে পােলাও সিদ্ধ হয় নি — চাল চাল রয়ে গেছে। কোরমা রান্না হয়েছে প্রচুর পরিমাণে চিনি দিয়ে।
Read more
