এরপর থেকে তার অভ্যাস হয়ে গেল – গভীর রাতে আয়নাঘরের দরজা খুলে সেখানে ঢুকতেন। অনেকক্ষণ থাকতেন। আয়নাঘরের মেঝেতে পাটি পেতে দুপুরে ঘুমুতেন।

আমার বাবা জানতে পেরে খুব রাগ করেন। বাবার ধারণা, এই বাড়িটা অভিশপ্ত। এ বাড়িতে থাকলে অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ হবে না। তিনি মাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান।
‘কোথায় যান ?
‘প্রথম ময়মনসিংহ শহরে যান। সেখান থেকে যান ঢাকায়। ঢাকায় যাবার পর থেকে মা’র মাথায় পাগলামি ভর করে। তিনি রাতে একেবারেই ঘুমুতেন না। ছটফট করতেন। আর বলতেন – ঐ বাড়ি ফেলে এসেছি – উনি খুব রাগ করছেন। খুব মন খারাপ করছেন। উনার কত শখ বাড়ি ভর্তি থাকবে ছেলেমেয়েতে। তারা হৈচৈ করবে, চেঁচামেচি করবে।
“উনি মানে কে? তিতলী বেগম?”
মা খুব কান্নাকাটি শুরু করেন বাড়ি যাবার জন্যে। বাবা পাত্তাই দেন নি। বাবা বলতেন –– ঐ বাড়িতে থাকার জন্যেই তোমার মাথার দোষ হয়েছে। আমি ওখানে তােমাকে নিয়ে যাব না। বাবা নিয়ে যান নি। মা‘র মৃত্যু হয় ঢাকায়।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
‘তােমার কি মনে হয় না তােমার বাবা ভুল করেছিলেন?‘
‘না মনে হয় না। বাবা যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন। মা‘র মনের ভ্রান্তিকে তিনি আমল দেন নি। তুমি নিশ্চয়ই মনে কর না আয়নাঘরে একজন মৃত মানুষ বাস করে।
‘জৎ বড়ই রহস্যময় তাহের।
জগৎ মােটেই রহস্যময় নয়। জগৎ কঠিন নিয়ম–শৃঙ্খলায় বাধা। প্রকৃতি কখনাে কোন নিয়মের ব্যতিক্রম হতে দেয় না। রহস্যের বাস মানুষের মনে। মানুষই রহস্য লালন করে। যেমন তুমি কর। কত আয়ােজন করে জোছনা দেখলে। জোছনার যে সৌন্দর্য তার সবটাই তুমি আরােপ করেছ। জোছনা কি ? সূর্যের প্রতিফলিত আলো – একে নিয়ে মাতামাতি করার কিছু নেই। কিন্তু তুমি মাতামাতি করছ। তােমার মত অনেকেই করছে। কবিতা লেখা হচ্ছে। গান লেখা হচ্ছে – আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে ...‘
লিলিয়ান বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে। ছালাম’ সব কাজ ফেলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিলিয়ানের দিকে। লিলিয়ান বাংলায় বলল, “আপনাদের পাঠানো খাবার উত্তম হয়েছে। পান খুবই উত্তম হয়েছে।” ছালাম কিছু বলছে না। তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে লিলিয়ানের কোন কথা তার কান দিয়ে ঢুকছে না। লিলিয়ান বলল, আমি আমাদের এই বাগান প্রাতকালে পরিচ্ছন্ন করব। আমি কিছু লেবারার নিয়ােগ করব। দয়া করে আমাকে সাহায্য করবেন। আপনি কি আমার বাংলা ভাষা বুঝতে পারছেন ?
আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
ছালাম কিছু বলল না। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল। তাহের বলল, বিদেশী উচ্চারণে তােমার অদ্ভুত বাংলা সে কিছুই বুঝে নি। বােঝার চেষ্টাও করে নি। আমিই বুঝতে পারি না, আর বুঝবে ছালাম আলি। সে হা করে তাকিয়ে ছিল তােমার দিকে। যাই হােক এসে বস এখানে। জোছনা দেখ।
লিলিয়ান বসল। তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, কাপাচিনাে কফি খেতে পারলে ভাল হত। যা ঘুম পাচ্ছে বলার না! চাদটাকে ঘুমের ট্যাবলেটের মত লাগছে। যতই দেখছি ততই ঘুম পাচ্ছে। ভাল কথা, জঙ্গল পরিষ্কারের কথা কি বলছ? এইসব মাথা থেকে দূর কর। ‘না দূর করব না। আমি বাগান পরিষ্কার করব। বাড়ি ঠিকঠাক করব। আমাদের এত সুন্দর বাড়ি এভাবে পড়ে থাকবে ?”
‘সুন্দর দেখলে কোথায় ? ‘আমার কাছে খুব সুন্দর লাগছে।‘ ‘আচ্ছা ধরে নিলাম সুন্দর। কে থাকবে তােমার এই সুন্দর বাড়িতে? ‘আমরা দু‘জন থাকব। আমাদের ছেলেমেয়েরা থাকবে। এর বাগানে খেলবে। আমি এদের জন্যে দোলনা বানিয়ে দেব। জোছনা রাতে বাচ্চাদের হাত ধরে আমরা নদীর পারে হঁটব। আর একটা বড় নৌকা কিনব। নদীর ঘাটে নৌকা বাধা থাকবে।
আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
তাহের হাসতে হাসতে বলল, কি বলছ পাগলের মত? ‘আমার মনের ইচ্ছার কথা তােমাকে বলছি। ‘লােকালয় ছেড়ে আমরা বনে পড়ে থাকব?” ‘হ্যা। ‘তােমার কি হয়েছে বল তাে লিলিয়ান?” ‘বুঝতে পারছি না।
‘আমার মনে হয় ঘুমের অভাবে তােমার চিন্তাশক্তি এলােমেলাে হয়ে গেছে। ভাল করে ঘুমাও – দেখবে মাথা থেকে ভূত নেমে গেছে। চল শুয়ে পড়ি।
‘তুমি শুয়ে পড়। আমি খানিকক্ষণ বসি।
‘আচ্ছা বস, আমি তাহলে এখানেই শুয়ে থাকি। তােমার যখন জ্যোত্না দেখা শেষ হবে, আমাকে ডেকে দিও।
একটুক্ষণ জেগে থাক না। আমার খুব গল্প করতে ইচ্ছা করছে।
তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, আমি জেগে থাকার চেষ্টা করছি। তুমি গল্প শুরু কর। আমার পক্ষে গল্প করা সম্ভব না। আমার পক্ষে যা সম্ভব তা হচ্ছে হাই তােলা। ঐ কাজটা আমি দায়িত্বের সঙ্গে করে যাচ্ছি। তাহের দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করল। মনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। লিলিয়ান গলার স্বর হঠাৎ অনেকখানি নিচে নামিয়ে বলল, আমি তােমাকে কতখানি ভালবাসি তা কি তুমি জান?
অহের চোখ না মেলেই বলল, জানি। ‘কিভাবে জান ?” ‘বলতে চাচ্ছি না। বললে তুমি লজ্জা পাবে। ‘আমি লজ্জা পাব না। তুমি বল। আমার শুনতে ইচ্ছে করছে। ‘তােমার শুনতে ইচ্ছা করলেও, আমার বলতে ইচ্ছা করছে না। আমার ঘুমুতে ইচ্ছা করছে। আমি কি তােমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে পারি ?
আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
পার। আমি সারারাত কিন্তু এখানেই বসে থাকব। তুমি এইভাবেই ঘুমুবে।
‘তােমার মধ্যে পাগলামির বীজ আছে লিলিয়ান। আমার ধারণা বেশ ভালমত আছে। লিলিয়ান হালকা গলায় বলল, হয়ত আছে। এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে কি জান? আমার মনে হচ্ছে এই যে – তুমি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছ একজন কেউ তা দেখছে। খুব আনন্দ নিয়ে দেখছে।
‘সেই একজন কেউ’ টা কে ? ভূত–প্রেত ?
বুঝতে পারছি না, তবে তার উপস্থিতি অনুভব করছি। ‘এ বাড়িতে তােমাকে বেশিদিন রাখা ঠিক হবে না। তােমার ব্রেইন পুরােপুরি নষ্ট হবার আগেই আমাদের চলে যেতে হবে।
Read more
