এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ২০ হুমায়ূন আহমেদ

এইসব দিনরাত্রি পর্ব – ২০

কবির মাস্টার মিম্বর মিয়ার সঙ্গে দেখা করে ঠাণ্ডা, গলায় বলে এসেছেন, দেখ মিম্বর, উনিশ শ সত্ত্বর সনে তুমি হাফপ্যান্ট পরতে। দাড়িগোঁফও জ্বালায় নি। তোমার কাছ থেকে এগার হাজার টাকা কার্জ নিল পালরা! জালিয়াতি করতে হলে বুদ্ধি লাগে, তোমার মতো বেকুবের কাজ না।মিম্বর মিয়া কোনো উত্তর দেয় নি, কিন্তু এমনভাবে তাকিয়েছে-যার মানে সে সহজে ছাড়বে না।কিছু দিন হল, কবির মাস্টার ভাবছেন, গার্লস স্কুলটা পালদের বসতবাড়িতে শুরু করলে কেমন হয়? নাম দেবেন-বরুণাবালিকাবিদ্যালয়। বরুণা যদি সত্যি সত্যি ফিরে আসে, সে খুশিই হবে। আর, এক বার স্কুল চালু হয়ে গেলে সহজে কেউ হাত ব্লাড়াবে না।

ঝড় ভালোই হয়েছে। গাছপালা পড়ে চারদিক লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। অধিকাংশ কাঁচা বাড়ি ঝড়ে উড়ে গেছে। মানুষজন মারা যায় নি। তবে বদিউজ্জামানের মার পা ভেঙেছে দু জায়গায়। সে চিৎকার করছে গরুর মতো। বদিউজ্জামানের সেদিকে লক্ষ নেই। সে তার ঝড়ে উড়িয়ে নেওয়া ঘরের শোকে কাতর। সে উঠোনে বসে আছে মাথা নিচু করে। মায়ের চি ৎকারে বিরক্ত হয়ে এক বার ধমকে উঠেছে, আরে, খালি চিল্লায়। চুপ করেন।ডাক্তারের কাছে আমারে লইয়া যা রে বদিউজামান।সকাল হউক।সকালতক বাঁচতাম না।না বাঁচলে নাই।

বদিউজ্জামানের স্ত্রী হাঁস-মুরগির খবর নিতে ছোটাছুটি করছে।আকাশের অবস্থা ভালো নয়। সাধারণত কালবৈশাখীর পরেপরেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়। এবার সে-রকম হচ্ছে না। টিপটপ করে বৃষ্টি পড়ছে। বাড়িঘর-ভাঙা মানুষগুলির জন্যে রাতের একটা আশ্রয় দরকার। এতগুলি আশ্রয় দেবার মতো ব্যবস্থা হঠাৎ করা মুশকিল।কবির মাস্টার ছাতা মাথায় দিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ালেন। এত বড়ো একটা ঝড় হয়ে গেল, কিন্তু এক জন মানুষও মারা গেল না-এই ব্যাপারটি তাঁকে অভিভূত করল। ঝড়ের মধ্যে বেঁচে এদের অভ্যাস আছে।বদিউজ্জামানের মাকে সদরে পাঠানো দরকার। বদিউজ্জামানের সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। ঘরের শোকেই সে কাতর।কবির মাস্টার বিরক্ত হয়ে বললেন, মাথায় হাত দিয়ে বসে আছিস কেন?

মাকে হাসপাতালে নিয়ে যা।সকাল হউক, সকালে নিমু।সকালে নিবি কিরে ব্যাটা? অবস্থা তো খুবই খারাপ।এখন রওনা দিলে শেষ রাইতে পৌঁছমুসদরে। কেউ পুছত না আমারে।রুয়াইল বাজারে নিয়ে যা। ডাক্তার দেখা।পয়সা নাই মাস্টার সাব। হাঁস মারা গেছে দুইটা। তুফানে ফতুর হইছি।বদিউজ্জামান থুক করে এক দল থুথু ফেলল। তার মা প্ৰাণপণে চিৎকার শুরু করল। কবির সাহেব বললেন, ডাক্তারের খরচ আমার কাছ থেকে নে!তিনি তাঁকে পঞ্চাশটা টাকা দিলেন। এদের এত খারাপ অবস্থা! দুঃসময়ের জন্যে কোনো সঞ্চয় নেই। একটা নীলগঞ্জ তহবিল করা দরকার। যেখান থেকে দুঃসময়ে টাকা পয়সা নেওয়া যাবে। তবে যথাসময়ে সে টাকা ফেরত দিতে হবে। তাতে সবার মনে একটা সাহস হবে।

বদিউজ্জামান।জ্বি।টাকাটা ফেরত দিবি মনে করে। আমার নিজের টাকা না। সুখী নীলগঞ্জের টাকা।কবির সাহেব রাতে আর ঘুমুতে গেলেন না। সমস্ত গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখতে অনেকটা দেরি হয়ে গেছে। না। তিনি তাঁর চিঠিপত্র নিয়ে বসলেন। চিঠিপত্র আসতে শুরু করেছে। ছাত্রদের কাছ থেকে যে-রকম সাড়া পাওয়া যাবে বলে মনে করা হয়েছিল, সে-রকম সাড়া পাওয়া যায় নি। চিঠির উত্তর সবাই দিচ্ছে, কিন্তু আসল জায়গায় পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। যেসব চিঠি পাচ্ছেন তার একটির নমুনা এরকম

শ্রদ্ধেয় স্যার,

আমার সালাম জানবেন। এই বৃদ্ধ বয়সেও যে আপনি একটা কিছু করতে যাচ্ছেন, তা জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। আশা করি আপনার স্বপ্ন সফল হবে। সুখী নীলগঞ্জ প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। আমি কতটুকু সাহায্য করতে পারব তা জানি না। কারণ বৰ্তমানে কিছু আর্থিক সমস্যা যাচ্ছে। সমস্যাটা ঘটলেই আমি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।

ইতি

আপনার স্নেহধন্য

আমীরুল ইসলাম

এই জাতীয় চিঠিগুলির উপর তিনি লাল কালি দিয়ে লেখেন-সাক্ষাৎ যার মানে হচ্ছে, চিঠিতে এর কাছে কোনো কাজ হবে না, দেখা করতে হবে। অবশ্যি মাঝে মাঝে দু-একটা এমন চিঠি পান যে আনন্দে চোখ ভিজে ওঠে। রংপুর থেকে ওহীদুল আলম বলে একটি ছেলে লিখল—স্যার, আমি ভাবতেও পারি নি আমার কথা আপনার মনে আছে। কী যে খুশি হয়েছি চিঠি পড়ে! অতি নিকৃষ্ট ছাত্র হয়েও আপনার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হই নি, এই আনন্দ আমার রাখার জায়গা নেই। স্যার, আমি জীবনে তেমন কোনো সাফল্য লাভ করতে পারি নি। মোটামুটি একটি টানাটানির সংসার বলতে পারেন। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না।আমি আপনাকে সাহায্য করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব। পাঁচ শ টাকা মনিঅৰ্ডার করে পাঠালাম।

আমি আমার বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে আপনাকে পাঠাব। এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আমার মহা সৌভাগ্য যে আপনার জন্যে কিছু করতে পারছি। স্কুলে ছাত্র থাকাকালীন সময়ে এক দিন একটা বড়ো অপরাধ করেছিলাম। আপনি আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে এক লাইনের যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমার তা এখনো মনে আছে। যত দিন বেঁচে থাকব। তত দিন তা মনে থাকবে।…

এই জাতীয় চিঠিগুলি তিনি আলাদা করে রাখেন। কোনো কারণে মন খারাপ হলে পড়েন। মুহূর্তের মধ্যেই মন ভালো হয়ে যায়। মনে হয় সুখী নীলগঞ্জ প্রকল্প নিশ্চয়ই এক দিন শুরু হবে।তিনি ফজরের আজান পড়ার আগ পর্যন্ত চিঠিপত্র নিয়ে ব্যস্ত রইলেন। তারপর রুটিনমতো বেড়াতে বেরুলেন। দক্ষিণপাড়া থেকে কান্নার শব্দ আসছে। ব্যাপার কী? তিনি দ্রুত দক্ষিণ দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।কাঁদছে বদিউজ্জামান এবং তার স্ত্রী। বদিউজ্জামান তার মাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় নি। তার মা কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছে।তিনি অবাক হয়ে নীলুর দিকে তাকালেন।যেন নীলুর কথা ঠিক বুঝতে পারছেন না। নীলু বলল, স্যার, আমি খুব লজ্জিত। শেষ মুহূর্তে জানালাম।বড়ো সাহেব বললেন, লজ্জিত হওয়াই উচিত। অন্তত এক মাস আগে জানলেও আমরা অন্য কাউকে পাঠাতে পারতাম।নীলু মাথা নিচু করে বসে রইল। বড়োসাহেব বললেন, আপনার সুইডেনে যেতে না পারার পেছনে কারণগুলি কী?

আমার একটা ছোট বাচ্চা আছে। ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না।কত ছোট? সাড়ে তিন বছর বয়স।এই প্রবলেমটা আগে লক্ষ করলেন না কেন? আগে ভেবেছিলাম সম্ভব হবে। দেখতে দেখতে ছ মাস কেটে যাবে।বড়ো সাহেব যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছেন। নীলু তার মুখ দেখেই সেটা বুঝতে পারছে। কিন্তু তার করার কিছুই নেই।টেনিং হবে দুই পর্যায়ে। তিন মাস অফিস ম্যানেজমেন্ট এবং পরের তিন মাস সেলস অ্যাণ্ড প্রমোশন। আপনি না-হয় প্রথম তিন মাসের ট্রেনিংটা শেষ করে চলে আসুন। নাকি সেখানেও অসুবিধা? মেয়েদের স্যার অনেক অসুবিধা।তিন মাস আপনার বাচ্চাকে দেখবার কেউ নেই? তার দাদী, কিংবা খালা, ফুপু?

মৃদুস্বরে বলল, আমি একা একা এত দূর যাই এটা আমার স্বামীর পছন্দ নয়।আই সি।আপনি যদি মনে করেন আমি কথা বললে তিনি কনভিন্সড হবেন, তাহলে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারি।দরকার নেই স্যার।নীলু উঠে দাঁড়াল। এখন সাড়ে বারটা বাজে। কিছুক্ষণের মধ্যেই লাঞ্চ ব্রেক হবে। তার আজ আর কাজ করতে ইচ্ছা করছে না। সে ছুটি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।কেন জানি বাসায় যেতেও ইচ্ছা করছে না। আবার একা একা ঘুরে বেড়াতেও ইচ্ছা করছে না। বন্যা তার অফিসে, নয়তো তার বাসায় গিয়ে আড্ডা দেওয়া যেত। অনেক দিন বন্যার সঙ্গে দেখা হয় না। তার অফিসে চলে গেলে কেমন হয়? আগে কোনো দিন যায় নি। ঠিকানা আছে, খুঁজে বেঃ করতে অসুবিধা হবে কেন?

বন্যা খুবই অবাক হল। দু বার বলল, একা একা খুঁজে বের করলি? তুই তো দারুণ স্মার্ট হয়ে গেছিস? অল্প কিছু দিন চাকরি করেই তোর তো ভালো উন্নতি হয়েছে! তবে ভালোমতো বুদ্ধি খেলাতে পারিস নি। তোর প্রথমে উচিত ছিল টেলিফোন করে দেখা আমি আছি কিনা।তোর এখানে আসব, এমন কোনো প্ল্যান ছিল না। হঠাৎ ঠিক করা।আর মিনিট দশেক দেরি হলেই আমার সঙ্গে দেখা হত না।এই সময় ছুটি হয়ে যায় নাকি তোদের? না, ছুটি হয় চারটায়। আজ একটু সকাল-সকাল ফিরছি, বাড়ি দেখতে যাব।বাড়ি বদলাচ্ছিস? না। ঘরের সঙ্গে বনিবন। একেবারেই হচ্ছে না। আমি আলাদা বাসা নিচ্ছি। তোকে সব বলব। দাঁড়া একটু, বসকে বলে আসি। তুই কিছু খাবি?

না।নীলু অবাক হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কী সব পাগলামি যে করছে বন্যা! বনিব্যুনা না হলেই আলাদা বাসা ভাড়া নিতে হবে? তাছাড়া এই শহরে একটি মেয়েকে কেউ বাসা ভাড়া দেবে না। এই শহরে কেন, কোনো শহরেই দেবে না।বন্যা নীলুকে নিয়ে রিকশায় উঠল। হালকা গলায় বলল, তোর হাতে সময় আছে তো? আছে।তাহলে চল আমার সঙ্গে। এক জন কেউ সঙ্গে থাকলে সাহস হয়। নিউ এ্যালিফেন্ট রোডে একটা মহিলা হোস্টেলের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম, কম্পাউণ্ডের ভেতর ঢুকেই কেমন গা ছমছম করতে লাগল। সুন্দর সুন্দর সব মেয়েরা ঘুরঘুর করছে। ববক্যাট চুল, ঠোঁটে লিপস্টিক। বেশ ভদ্রঘরের মেয়ে বলে মনে হয়, কিন্তু কেমন একটু খটকা লাগল। হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে কথা বললাম। বিশাল মৈনাক পর্বতের মতো এক মহিলা।

প্রথমে বলল সীট আছে। তারপর যখন শুনল আমি একটা এ্যাম্বেসিতে চাকরি করি, তখন বলল সীট নেই।তুই কী বললি? কিছু বলিনি, চলে এসেছি। জায়গাটা ভালো না।নীলু ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল, এখন কি আবার ঐখানেই যাচ্ছিস নাকি? না, আরেকটা মহিলা হোস্টেল আছে। শুনেছি, সেটা ভালো। অনেক চাকরিজীবী মহিলা থাকে। তবে সীট পাওয়া মুশকিল।হাসবেণ্ডের সঙ্গে কী হয়েছে, সেটা শুনি।রিকশায় বসে বলার মতো কোনো স্টোরি না। নিরিবিলিতে বলব। আর ঐসব শুনে কী করবি?

হোস্টেল-টোস্টেল খোঁজার চেয়ে ঝামেলাটা মিটিয়ে ফেলা ভালো না? আমি কিছু মেটাব না। ও যদি মেটাতে চায়, মেটাবে। দোষটা ওর, আমার না।রিকশাতেই বন্যা নিচু গলায় তার সমস্যার কথা বলতে শুরু করল।তোকে তো আগেই বলেছি, আমার চাকরি করাটা ও পছন্দ করে না। মাসখানেক আগে আমাদের এক জন অফিসার বেড়াতে এসেছেন আমার বাসায়। কাটিসি ভিজিট। এতেই তার মুখ গম্ভীর-কেন এসেছে? মহিলা কলিগদের বাসায় ঘুরঘুর করার দরকারটা কী? এইসব। তারপর কী হল শোন। সেই ছেলেটা আরেক দিন এল। আর ওর মাথায় একদম রক্ত উঠে গেল—কেন বারবার আসবে? নীলু ক্ষীণস্বরে বলল, সত্যি তো, কেন আসবে বারবার? বারবার কোথায় দেখলি? দু বার এসেছে মাত্র। আর আমি কি তাকে বলতে পারি, আপনি আসবেন না। আমার এখানে?

নীলু চুপ করে রইল। বন্যা গম্ভীর গলায় বলল, তারপর কী হল শোন, ও বলল, তুমি চাকরি ছেড়ে দাও। আমার সঙ্গে যদি থাকতে চাও, তাহলে চাকরি ছাড়তে হবে। তুই কী বললি? আমার রাগ উঠে গেল। আমি বললাম, তুমি এমন কি রসোগোল্লা যে, তোমার সঙ্গে থাকতেই হবে।কী সৰ্ব্বনাশ!সর্বনাশের কী আছে? সত্যি কথা বললাম। মেয়ে হয়েছি বলে সত্যি কথা বলতে পারব না? সত্যি-মিথ্যা এখানে কিছু নেই। তুই তোর বরকে রাগিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিলি।তা করেছিলাম। ও আমাকে রাগিয়ে দিতে পারবে, আমি পারব না? খুব পারব।কত দিন থাকবি আলাদা?

যা দিন দরকারর হয়, তত দিন থাকব। নিজ থেকে ফিরে যাবার মেয়ে না!হোস্টেলে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হল। সুপার আসেন পাঁচটায়। সুপার ছাড়া অন্য কেউ কিছু বলতে পারবে না।মহিলা হোস্টেলটি বেশ সুন্দর। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ভেতরের দিকে ফুলের বাগান আছে। কমনরুমটি বিশাল। মেয়ের হৈহৈ করে পিৎপং খেলছে। নীলু অবাক হয়ে দেখল, একটা টেবিল ঘিরে কয়েক জন মেয়ে তাস খেলছে। মেয়েরাও তাঁস খেলে নাকি? রবীন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতিতে মেয়েদের তাস খেলার ব্যাপারটা আছে। বাস্তবেও যে খেলা হয়, নীলুপ্রথম দেখল।দেখ বন্যা, তাস খেলছে।খেলবে না কেন?

এক শ বার খেলবে। জুয়া খেলবে। মদ খেয়ে রাতে বাড়ি ফিরে স্বামীকে ঠ্যাঙাবে। কোনো ছাড়াছাড়ি নেই।নীলু হেসে ফেলল। বন্যার স্বভাব-চরিত্রে অনেকখানি পাগলামি এসে ঢুকে যাচ্ছে।সুপার এল সাড়ে পাঁচটায়। সুপার মহিলা নয়, পুরুষ। অভদ্র ধরনের লোক। কেউ কিছু বললে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে, যার থেকে ধারণা হয়, লোকটি কারো কোনো কথা শোনে না।এখানে কোন সীট নেই দরখাস্ত করলে ওয়েটিং লিস্টে নাম তুলব। ফরম নিয়ে দরখাস্ত করুন। কেন মহিলা হোস্টেলে থাকতে চান, তার কারণ আলাদা একটা কাগজে লিখে সঙ্গে দিন। সীট খালি হলে আপনাকে জানানো হবে।কবে নাগাদ খালি হবে?

তা আমি কী করে বলব? আর খালি হলেই আপনি পাবেন কেন? ওয়েটিং লিস্টে যে প্রথমে আছে, সে পাবে।আপনি এত অভদ্রভাবে কথা বলছেন কেন? কোন কথাটা অভদ্রভাবে বললাম? সারক্ষণই তো ক্যাটক্যাট করে কথা বলছেন।হোস্টেল সুপার থমথমে মুখে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে থেকে বলল, এ্যাপ্লাই করতে চাইলে ফরম নিয়ে এ্যাপ্লাই করুন। পাশের কামরায় ফরম। আছে।নীলুমৃদুস্বরে বলল, করবি এ্যাপ্লাই? করব। করব না কেন? এখন যাবি কোথায়? কোথায় আবার যাব? বাসায় যাব। রোজ একবার খোঁজ নেব সীট খালি হল কিনা।নীলু লক্ষ করল, বন্যাকে কেমন যেন ক্লান্ত লাগছে। চোখের নিচে কালি। দেখেই মনে হয়। শরীর বিশ্রামের জন্যে কাতর। বাচ্চা-টাচ্চা হবে না তো?

রাস্তায় নেমেই নীলু বলল, তোর কি আর কোনো খবর আছে? আর কি খবর থাকবে? এই ধর, জনসংখ্যা বৃদ্ধি-বিষয়ক কোনো খবর।বন্যা জবাব দিল না। অন্যমনস্কভাবে নিঃশ্বাস ফেলল। নীলু বলল, কী, আছে নাকি? জানি না। তুই এখন বাসায় চলে যা। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। যেতে পারবি তো এক একা? পারব।আয়, তোকে বাসে তুলে দিয়ে আসি।বাসে তুলে দিতে হবে না। তুই বাসায় গিয়ে বিশ্রাম কর। তোর বিশ্রাম দরকার।বলতে বলতে নীলু রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল। বন্যা বিরক্ত হয়ে বলল, কী যে বাজে কথা বলিস! তাহলে তোর কোনো খবর নেই? বন্যা এই প্রশ্নের জবাব দিল না। তার মুখ বিষন্ন। এমন একটি সুখের সময়ে কেউ এত বিষণ্ণ থাকে কেন? এমন ছেলেমানুষ কেন বন্যা?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *