মামি : পড়াশােনা করা কি খারাপ? বড় মামা : পুঁথিগত পড়াশােনা করা খুব খারাপ। প্রতিভাবান মানুষেরা কখনাে পাঠ্যবই পড়ে না।
মামি ; তােমাকে কে বলেছে? বড় মামা : বলাবলির তাে কিছু নেই— সবাই জানে। পাঠ্যবই থেকে শেখার কিছু নেই। মামি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বললেন, আমাকে তুমি এত অপছন্দ করাে কেন ?
বড়মামা বললেন, শুধু তােমাকে নয়, সব মেয়েকেই আমি অপছন্দ করি। মেয়েরা প্রকৃতিতে নিষ্ঠুর। যেমন ধর, একটা কালাে স্ত্রী মাকড়সা দৈনিক ২৫০টা পুরুষ মাকড়সাকে হত্যা করে।
আমি কি মাকড়সা ? মাকড়সা না হলেও কাছাকাছি। এখন যাও, আমি কাজ করব।
কী কাজ?
ঐ সব তুমি বুঝবে না। একটা প্রহসন লিখছি। মেয়েরা আশেপাশে থাকলে কোনাে বড় কাজ হয় না।
ও আচ্ছা, তাহলে যাচ্ছি, বড় কাজ করাে।
মামি প্রায় ছুটে বের হয়ে এলেন। খানিকক্ষণ পর শেফু এসে আমাকে কানে কানে বলল, মামি ছাদে দাড়িয়ে খুব কাঁদছে।
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। শেফু বলল, কাঁদছে কেন রে, দাদা ?
মামিকে মাকড়সা বলেছে— এই জন্যে কাঁদছে। মামিকে মাকড়সা বলা মামার উচিত হয় নি। অন্যায় হয়েছে।
দাদা শােন, এখন থেকে আমি পুরােপুরি মামির দলে। তুই কার দলে ?
দল ত্যাগ করা নিতান্তই অধর্ম হবে বলে আমি বড় মামার দলেই রইলাম, তবে মন পড়ে রইল মামির দলে ।
বড়মামার প্রহসন লেখা শেষ হয়েছে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
প্রচণ্ড হাসির একটা ব্যাপার। এমন মজার যে কিছুক্ষণ পরপর হা–হা করে হাসতে হয়। মামা পুরােটা আমাদের পড়ে শােনালেন। আমাদের একবারও হাসি এলাে না। তবে মামা যতবার হাসলেন আমরাও ততবার হাসলাম। পড়া শেষ হলে খাতা বন্ধ করতে করতে মামা বললেন, প্রচণ্ড হাসির হয়েছে, কী বলিস ?
জি মামা ।
এই জিনিস মঞ্চে করা যাবে না। হাসির চোটে দর্শক ডায়ালগ বুঝতে পারবে না। এটা আগে খেয়াল করি নি। আগে খেয়াল করলে হাসি আরেকটু কমিয়ে দিতাম। গ্রেট মিসটেক । শ্রোতাদের পাঁচ মিনিট গ্যাপ দিয়ে দিয়ে হাসাতে হয়। হাসি খুব পরিশ্রমের ব্যাপার। তাই একবার হাসির পর খানিকক্ষণ করে বিশ্রাম দিতে হয় ।
প্রহসন শেষ হবার পর মামা গােয়েন্দা উপন্যাস লিখতে বসলেন। নাম— ‘ভয়ঙ্কর রাতের বিভীষিকা। রক্ত জমাট করা গােয়েন্দা গল্প । দুর্বল হার্টের লােকের পড়া একেবারেই নিষিদ্ধ। বইয়ের শুরুতেই মামা একথা লিখে দিয়েছেন। খুবই ভয়ঙ্কর গল্প । ছােটদের পড়া নিষিদ্ধ। আঠারাে বছরের বেশি না হলে কেউ এই বই পড়তে পারবে না। মামিও পারবেন না, কারণ মামির বয়স আঠারাের নিচে। আমার ধারণা, মামা এই বই লিখছেন যাতে মামি পড়তে না পারেন। মামির খুব খারাপ অভ্যাস মামা কিছু–একটা লিখলেই তিনি গােপনে সেটা পড়ে ফেলবেন এবং চোখ বড় বড় করে বললেন, মানুষটার কি মাথা খারাপ ? এইসব কী লেখে ? মামা তার সব লেখা এখন তালাবন্ধ করে রাখেন। সেই তালার চাবি থাকে তার পকেটে।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
দেখতে দেখতে দিন কাটতে লাগল। মামি বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেন ভাব করতে, লাভ হলাে না । বড়রা তাে ছােটদের মতাে না যে ডাব ডাব ডাব ভাব ভাব ভাব’ বলে বুড়াে আঙুল ছোঁয়ালেই ভাব হবে। তাদের ভাব হওয়া খুব কঠিন। মামি যতবারই ভাব করতে গেলেন ততবারই নতুন করে ঝগড়া হলাে। ঝগড়ার সময় মামা খুব কঠিন কথা বললেন। যেমন, বড়মামা : আমার সাহিত্য প্রতিভার যে স্বীকৃতি দেয় না, যে আমার
রচনা নিয়ে হাসাহাসি করে, তার সাথে আমার বাস করা সম্ভব না। তাছাড়া প্রতিভাবান মানুষদের বিয়ে করা উচিত বিয়ে করা ভুল। যদি কেউ তা করে তবে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় স্ত্রীর সাথে বাস না করে।
মামি : তুমি প্রতিভাবান কে বলল?
বড়মামা : (ভয়ঙ্কর রাগ) আমি প্রতিভাবান না ?
মামি : উঁহু। হাতির ছবি আঁকা ছাড়া তুমি আর কিছু পার না।
বড়মামা : কী বললে ?
মামি : যা সত্যি তাই বললাম। তােমার হাতির ছবিও যে খুব ভালাে হয় তাও না। হাতির মুখটা দেখতে হয় ইঁদুরের মুখের মতাে।
বড়মামা : কী বললে ?
মামি ; যে ছবি আঁকতে পারে সে সবকিছুর ছবি আঁকতে পারে। বাঘ, ভালুক, গাছপালা, নদী... তুমি শুধু হাতি আঁক, আর কিছু না।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ
বড়মামা : এতে কী প্রমাণিত হয় ?
মামি : এতে প্রমাণিত হয় তুমি ছবি আঁকতে পার না এবং...বড়মামা : এবং কী ? মামা : এবং আমার ধারণা তুমি খানিকটা বােকা। বড়মামা : কী বললে ? আমি বােকা ?
মামি : হঁা বােকা বােকা না হলে পরপর তিনবার কেউ আই. এ. পরীক্ষা দিয়ে ফেল করে ? বড়মামা : (অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর) তুমি এ–ঘর থেকে যাও।
আমি তােমার মুখ দর্শন করতে চাই না। মামি ; তুমি আমার মুখ দেখতে চাও না? বড়মামা : না। এই জীবনে নয়। এ আমার কঠিন প্রতিজ্ঞা। কলম হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করছি। তােমার মুখ আমি দেখতে চাই না। –না–না।
মামি : বেশ, মুখ দেখতে হবে না। আমি কাল ভােরে দেশে চলে যাব। শুধু পরীক্ষার সময় এসে পরীক্ষা দিয়ে যাব। বড়মামা : বাঁচলাম।
Read more