চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৩ হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৩

আসমানী চোখ বন্ধ করে আছে অথচ চোখ বন্ধ অবস্থায় সে সবাইকে দেখছে। এটা কি খুবই বিস্ময়কর ঘটনা না? মাথায় পানি ঢালছেন, মা। তিনি মাথার পেছনে, চোখ খোলা অবস্থায়ও তাঁকে দেখতে পাবার কথা না। মাছি হলে দেখতে পেত। মাছিদের মাথার পেছনেও চোখ থাকে। কিন্তু সে মাছি না হয়েও দেখতে পারছে। এটা কি একটা অদ্ভুত ঘটনা না? মা কি শাড়ি পরে আছেন তাও সে দেখতে পাচ্ছে। ব্লক প্রিন্টের শাড়ি। ডিজাইনটা চোখে লাগছে।

আজ তাঁর মেয়ের বিয়ে তিনি এমন কুৎসিত ডিজাইনের শাড়ি পরেছেন কেন। তাঁকে বলতে হবে সুন্দর একটা শাড়ি পরতে। মেয়ের বিয়েতে সবচে বেশী সাজ করা উচিত মেয়ের মার।আসমানীর ঘুম ঘুম পাচ্ছে। পানির শীতল ধারা চুলের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে পরছে-কি আরামই না লাগছে। ঘুমিয়ে পড়লে এই আরাম লাগবে না। জ্বরের ঘুম খুব কষ্টের ঘুম। ঘুমের মধ্যেও মাথার ভেতরটা জ্বালা করতে থাকে। আসমানীকে জেগে থাকতে হবে। আজ তার বিয়ে।

কত কাজ পরে আছে। গোসল করে একটা হলুদ শাড়ি পরবে। হলুদ শাড়ি পরে ছবি তুলবে। অনেক অনেক দিন পর পুরানো এলবামে এই ছবি দেখে তার বড়মেয়ে বলবে—মা, গায়ে হলুদের দিন তোমাকে এত সুন্দর দেখাচ্ছিল? তোমার কি তখন এত চুল ছিল? হুঁ ছিল।তোমাকে হলুদ পরীর মত লাগছে মা।একদিন তোকেও এমন হলুদ পরীর মত লাগবে।মাগো কি যে সুন্দর তোমাকে লাগছে। তবে মুখটা খুব রোগা। তখন আমার খুব জ্বর ছিলরে মা।জ্বর ছিল?

হ্যাঁ আকাশ পাতাল জ্বর। মাথায় পানি ঢালাঢালি। জ্বর নামানোর সবাই এত চেষ্টা করছে। কিন্তু জ্বর নামছে না।আহারে। আমি থাকলে চট করে জ্বর নামিয়ে দিতাম।কি ভাবে জ্বর নামাতি? চুমু দিয়ে দিয়ে জ্বর নামাতাম। চোখে চুমু দিলে জ্বর নেমে যায়।তোকে কে বলেছে।কেউ বলেনি। আমি জানি।

আসমানী চোখ মেলল। তার মনে হল বাড়ি ভর্তি লোকজন। তাদের নিঃশ্বাসে ঘরের বাতাস পর্যন্ত ভারী হয়ে আছে। এত মানুষ কোত্থেকে এল? সে ভালমত দেখার চেষ্টা করল। না লোকতো বেশী না। এইত বড় মামা। বড়মামার পাশে নিশা। কাজের বুয়া একটু দূরে দাঁড়িয়ে। মাথার পেছনে মা। বাবা এখনো ডাক্তার নিয়ে ফেরেন নি। তাহলে বাড়ি ভর্তি লোক মনে হচ্ছে কেন? আসমানী আবারো চোখ বন্ধ করল। ফরহাদকে মনে মনে একটা চিঠি লিখলে কেমন হয়।

এইযে বাবু সাহেব। আজ যে আপনার বিয়ে সেটা কি মনে আছে? না সব ভুল মেরে বসে আছেন? গায়ে হলুদের মাছ পাঠানোর কথা মনে আছে? দয়া করে কাতল মাছ পাঠাবেন না। আমি কাতল মাছ খাই না।শুনুন বাবু সাহেব আমার শরীর খুব খারাপ করেছে। এখন আমার মাথায় পানি এবং জলপট্টি দেয়া হচ্ছে। আমার জ্বর কত উঠেছে শুনতে চান? একশ পাঁচ। কি সর্বনাশ তাই না? একশ পাঁচ হোক বা দশ হোক বিয়ে কিন্তু হবে। আপনার বাসর রাতটা কাটবে স্ত্রীর সেবা করে। পারবেন না?

আমাদের বাসরটা হাসপাতালে হলে কেমন হয়? হাসপাতালের ধবধবে শাদা বিছানায় আমি শুয়ে আছি। আমাকে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। আর আপনি আমার পায়ের কাছে মুখ শুকনো করে বসে আছেন। ঘর ভর্তি স্যাভলনের গন্ধ। সবার হয় ফুলশয্যা আমাদের হবে স্যাভলন শয্যা। মজা হবে না?

আসমানী চোখ মেলল। সে অবাক হয়ে দেখল রাত হয়ে গেছে। ঘর অন্ধকার। দেয়ালে জিরো পাওয়ারের বাতি জ্বলছে। সেই বাতির আলো নরম। ঘরটা অতিরিক্ত ঠাণ্ডা। বিজবিজ বিজবিজ শব্দ হচ্ছে। এসি চলছে না-কি? শব্দটা এসির আওয়াজের মত লাগছে। তাদের বাড়িতেতো এসি নেই। তাকে কি কোন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে?

হ্যাঁ ক্লিনিক বলেইতো মনে হচ্ছে। এইতো স্ট্যাণ্ডের সঙ্গে স্যালাইনের ব্যাগ ঝুলছে। তাকে স্যালাইন দেয়া হচ্ছে। পায়ের কাছে একজন নার্স দাঁড়িয়ে আছে। নার্সটার চেহারা কোমল। নার্স এপ্রন পরে আছে। এনে তার নাম লেখা— রোকেয়া। এপ্রনের পকেটেই ষ্টেথিসকোপ। না তাহলে উনি নার্স না। নার্সরা এপ্রনের পকেটে স্টেথিসকোপ নিয়ে ঘুরেন না। ইনি ডাক্তার। ডাক্তার এগিয়ে আসছেন।

তিনি আসমানীকে কি যেন বললেন। আসমানী পরিষ্কার শুনতে পেল না। এসির শব্দে ডাক্তার মেয়েটির কথা ঢাকা পরে গেছে। আসমানীর ইচ্ছা করছে তাকে জিজ্ঞেস করতে–আচ্ছা শুনুন, আজ আমার বিয়ে হবার কথা ছিল। বরযাত্রী এসেছে কি-না আপনি কি জানেন? যদি না জানেন একটু কি জেনে দেবেন? আমার আত্মীয় স্বজনরা নিশ্চয়ই আশে পাশেই আছেন। তাদের জিজ্ঞেস করলেই জানতে পারবেন।

আসমানী কথা বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু কথা বলতে পারছে না। ডাক্তার মেয়েটি এগিয়ে এসে স্যালাইনের ব্যাগ নাড়াচাড়া করছে। আসমানী স্যালাইনের ব্যাপের দিকে তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।আসমানীর বিয়ে হয় নি। তার অসুখের কারণে যে হয় নি তা-না। বিয়ে হয়নি কারণ আজ সকাল এগারোটা দশ মিনিটে ফরহাদের দাদাজান মারা গেছেন। মরা বাড়িতে বিয়ে হয় না।

কামরুল ইসলাম সাহেবকে আজ বিদেশী টুরিস্টদের মত লাগছে। তাঁর গায়ে থাই সিল্কের ঢোলা সার্ট। সেই সার্ট লাল, নীল, সবুজ অনেক কটা রঙ। চোখে সানগ্লাস। গলায় ক্যামেরা ঝুললেই পুরোপুরি টুরিস্ট। তাঁর গা থেকে ভুর ভুর করে গন্ধও বের হচ্ছে। গাড়ির পেছনের সীটে তিনি গা এলিয়ে বসে আছেন। ফরহাদ তাঁর পাশে। গাড়ি এয়ারপোর্ট রোড ধরে চলছে।

তিনি কোথায় যাচ্ছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ফরহাদ ভেবেছিল তাকে নিয়ে তিনি যাচ্ছেন, পিজিতে। আসমানী আছে পিজিতে। কিন্তু শাহবাগের মোড়ে এসে তিনি ড্রাইভারকে বললেন—এয়ারপোর্ট রোড ধরে এগিয়ে যাও। তারপরই ফরহাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাদের এদিকে ভাল কফি শপ নেই তাই না।

ফরহাদ বলল, আমি ঠিক বলতে পারছি না।আসমানী বলেছে নেই। আসমানী আর নিশাকে নিয়ে একবার কফি শপের সন্ধানে বের হয়েছিলাম।পান নি? কয়েকটি পেয়েছি। গুলশানের দিকে। তবে ঠিক কফি শপ না। ফাস্ট ফুডের দোকান। চা কফিও বিক্রি করে। সবগুলিই ইয়াং ছেলেমেয়েদের দখলে। আমার এমন কফি শপ দরকার যেখানে আমার মত বুড়ো মানুষও যেতে পারে।আমরা কি এখন কোন কফি শপে যাচ্ছি?

হ্যাঁ। কিছু কথা আছে বাড়িতে নিরিবিলি বসে বলতে হয়। কিছু কথা আছে পার্কে হাঁটতে হাঁটতে বলতে হয়। আবার কিছু কথা আছে বলতে হয় ভীড়ের মধ্যে। কফি শপে কিংবা পাবে। তোমার চারপাশে লোজন থাকবে। তারা সবাই কথা বলবে। তুমিও বলবে। কেউ কারো কথা শুনবে না। জনতার মধ্যেই আছে নির্জনতা।

ফরহাদ কিছু বলল না। আসমানীর মামা তাকে বিশেষ কিছু কথা বলতে চান। সেই বিশেষ কথাগুলি কি সে ধরতে পারছে না। তিনি কি তাকে বলবেন, আসমানীর ভয়ংকর কোন অসুখ হয়েছে। এটা তাকে বলার দরকার নেই। এটা সে কারো সঙ্গে কথা না বলেও বুঝতে পারছে।

ফরহাদ? জ্বি।তোমার দাদাজানের মৃত্যুশোক তোমরা কি সামলে উঠেছ? ফরহাদ বলল, জ্বি।এখন কেউ কান্নাকাটি করছে না? উনার বয়স হয়েছিল। মৃত্যু তার জন্যে প্রয়োজন ছিল। কেউ তেমন কান্নাকাটি করে নি।তোমার খুব খারাপ সময় যাচ্ছে তাই না? জ্বি।

শুনলাম যে বাড়িতে থাকতে সেই বাড়ি ছেড়ে দিতে হচ্ছে? জ্বি।যাচ্ছ কোথায়? নতুন বাসা ভাড়া করছ? এখনো করি নি।তোমার যে চাকরি নেই এটাও জানতাম না। এটা আমাকে বলা দরকার ছিল। আসমানী কি জানে? জ্বি জানে।এটা ভাল যে তাকে বলেছ। তার কাছে কিছু গোপন করনি। চাকরি যে নেই, সংসার কিভাবে চলবে না চলবে কিছু ভেবেছ? জ্বি না।

যে ছেলে বিয়ে করবে তার কোন প্ল্যানিং থাকবে না? তোমার মার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। চমৎকার মহিলা। তিনি দুঃখ করে বলছিলেন তুমি যে বিয়ে করতে যাচ্ছ এই খবরটা তুমি তাঁকেও দাও নি। তোমার যে চাকরি নেই এটাও তিনি জানতেন না। তুমি একটা মেয়ের গভীর প্রেমে পড়েছ এটা খুবই ভাল কথা। যখন ঠিক করলে মেয়েটাকে তুমি বিয়ে করবে তখনই কিন্তু রেসপনসিবিলিটির ব্যাপারই চলে আসছে। আসছে না?

জ্বি।সিনেমায় বা রোমান্টিক উপন্যাসে কপর্দকহীন ছেলে প্রেমিকাকে বিয়ে করে। তাদের কোন সমস্যা হয় না, তারা সুখেই সময় কাটায়। রিয়েল লাইফে তা হয় না। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে কল্পনা এবং বাস্তবের সীমারেখা সম্পর্কে তুমি জান না। তুমি পুরোপুরি কল্পনাতেও বাস করছ না, আবার বাস্তবেও বাস করছ না। দুয়ের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় বাস করছ। আমি নিজে যে ভুলটা করেছি সেটা হচ্ছে আসমানীর আবেগের মূল্য দিয়েছি। তোমার বিষয়ে কোনরকম খোঁজ খবর করার প্রয়োজন বোধ করি নি।খোঁজ খবর করে সব জানলে বিয়েতে রাজি হতেন না?

রাজি হতাম। আসমানীর দিকে তাকিয়ে রাজি হতাম।কফি শপ একটা পাওয়া গেল। কামরুল ইসলাম সাহেবের পছন্দ হল না। ছোট্ট জায়গা। ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বার্গার-ফার্গার খাচ্ছে। এদের দেখে মনে হচ্ছে এদের বাড়িতে রান্না হয় না। দোকানের বার্গারই একমাত্র ভরসা। কামরুল সাহেব বললেন, চল এক কাজ করা যাক কোন চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসি।

ফরহাদ বলল চাইনিজ রেস্টুরেন্টে কফি পাওয়া যায় না।চাইনিজ চা নিশ্চয়ই আছে। চল চা খেতে খেতে কথা বলি। এই এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রেস্টুরেন্ট কোনটা? আমি বলতে পারব না মামা। গুলশান বিত্তবান লোকদের এলাকা। আমি এদিকে আসি না।চল খুঁজে বের করি। একটা পছন্দ না হলে আরেকটায় যাব। আসলে আজ আমার ঘুরতে ইচ্ছা করছে। কোন কোন দিন আসে যখন ঘরে থাকতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় সারাদিন ঘুরি। তাই না?

জ্বি।আবার কোন কোন দিন আসে যখন ঘর থেকে বেরুতে ইচ্ছা করে না। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। মনে হয় দরজা জানালা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকি। মানুষ হয়ে জন্মানোর অনেক যন্ত্রণা আছে। ঠিক বলছি না ফরহাদ? জ্বি।আচ্ছা ধর তোমাকে একটা চয়েস দেয়া হল—তুমি মানুষ না হয়ে অন্য যে কোন পশুপাখি কীট পতঙ্গ হয়ে জন্মাতে পার। তুমি কি হতে চাইবে?

কামরুল সাহেব তাকিয়ে আছেন। কালো চশমার কাৰণে তার চোখ দেখা যাচ্ছে না, তবে তিনি যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তা বোঝা যাচ্ছে। ফরহাদ বুঝতে পারছে আসমানীর মামা অস্থির বোধ করছেন। অস্থির মানুষ নিজের অস্থিরতা চারদিকে ছড়িয়ে দিতে চায়।

এই অস্থিরতা কি অসমানীর বিয়ে নিয়ে? না-কি আসমানীর অসুখ নিয়ে? চাইনিজ রেস্টুরেন্টের নিরিবিলিতে তিনি ফরহাদকে কি জিজ্ঞেস করবেন? সে পরের জন্মে কি হয়ে জন্মাতে চায়? না-কি উনি বলবেন—আসমানীর সঙ্গে তোমার বিয়ের ব্যাপারটা আপাতত স্থগিত। তুমি কোন ভদ্র চাকরি জোগাড় কর। বউকে নিয়ে কোথায় তুলবে সেই ব্যবস্থা কর। তারপর দেখা যাবে।

পছন্দের চাইনিজ রেস্টুরেন্ট একটা পাওয়া গেছে। এরা আবার কফিও বিক্রি করে। কামরুল সাহেব দু কাপ এসপ্রেসো কফির অর্ডার দিলেন ফরহাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার সিগারেট খেতে ইচ্ছা করলে খাও। আমাকে গুরুজন হিসেবে সম্মান দেখাতে গিয়ে সিগারেট বন্ধ রাখার দরকার নেই। তোমার কাছে সিগারেট আছে?

জ্বি না।আচ্ছা আমি আনিয়ে দিচ্ছি। আমার নিজেরও সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে।কামরুল ইসলাম সিগারেট আনতে পাঠালেন। সব চায়নীজ রেস্টুরেন্ট অন্ধকার অন্ধকার থাকে। এটিও তাই। কামরুল ইসলাম এই অন্ধকারেও চোখ থেকে সানগ্লাস খুলেন নি।

ফরহাদ! জ্বি।আসমানীর অসুখটা ভাল না বলে ডাক্তাররা সন্দেহ করছেন। ও।আগেও একবার ডাক্তাররা এ জাতীয় সন্দেহ করেছিলেন। অনেক পরীক্ষা নীরিক্ষা করার পর তারা সন্দেহমুক্ত হয়েছিলেন। বিউমেটিক ফিভারের চিকিৎসা করা হয়। এতে উপকারও পাওয়া যায়। এখন মনে হচ্ছে ভুল চিকিৎসা হয়েছে। ভুল চিকিৎসার মাশুল খুব চড়া হয়। চড়া মাশুল দিতে হবে।

ওর অসুখটা কি? এখনো জানি না। এখনো পরীক্ষা নীরিক্ষার পর্যায়ে আছে। নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি।ডাক্তাররা কি সন্দেহ করছেন? ভয়ংকর কিছু সন্দেহ করছেন। রেড ব্লাড সেল কাউন্ট অনেক বেশী। বেশী হলেও এরা ঠিক মত অক্সিজেন সাপ্লাই করতে পারছে না। নানান হাবিজাবি বলছে। ব্লাড ট্রান্সফিউশান করা হয়েছে। এতে ডাক্তাররা ভাল ফল পেয়েছেন। লোহীত রক্ত কণিকার অসুখ।চিকিৎসা আছে?

লোহিত রক্ত কণিকার অসুখের আবার না-কি নানান ভেরাইটি আছে। কিন্তু কিছু ভেরাইটির ভাল চিকিৎসা আছে। এমনও আছে যে বোন-মেরো ট্রান্সপ্রেন্ট করে রোগ পুরোপুরি সারানো যায়। বোন-মেরো পাওয়াটাই সমস্যা।

সমস্যা কেন? সব বোন-মেরো ট্রান্সপ্লেন্ট করা যাবে না। ক্রস ম্যাচিং এ দেখতে হবে ম্যাচ করে কি-না। ক্রস ম্যাচিং করতে হবে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে। বিরাট জটিলতা। বাংলাদেশে ক্রস ম্যাচিং এর ব্যবস্থাও নেই। সিঙ্গাপুরে আছে।আসমানী কি তার অসুখের কথা জানে? না। তাকে বলা হয়েছে রিউম্যাটিক ফিভারের কথা। তোমাকে নিরিবিলিতে ডেকে আনার উদ্দেশ্যটা কি জান? জ্বি না।

আসমানীর অসুখের খবর দেয়ার জন্যে তোমাকে ডাকি নি। অসুখের খবর দেয়ার জন্যে চাইনিজ রেস্টুরেন্টও লাগে না, এসপ্রেসো কফিও লাগে না। তোমাকে ডেকেছি এই কথাটা বলার জন্যে যে বিয়ের ব্যাপারটা তুমি আপাতত মাথা থেকে সরিয়ে দাও। আসমানী বিয়ের জন্যে খুব অস্থির হয়ে আছে। জ্ঞান ফেরার পর প্রথম সে যে কথাটা বলেছে তা হচ্ছে আমার বিয়ে হয়নি? ওকে কি সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হবে?

জানি না। আমার এত টাকা নেই। শুধু আসমানীকে একা নিলেতো হবে না। বোন-মোরো ক্রস ম্যাচিং করার জন্যে আরো অনেককে নিতে হবে। আমার এত টাকা নেই।সিগারেট চলে এসেছে। ফরহাদ সিগারেট ধরাল। কামরুল ইসলাম সাহেব সিগারেট খেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি প্যাকেটের দিকে হাত বাড়ালেন না।

কফির কাপে চুমুক দিতে নড়ালেন।

ফরহাদ!

জ্বি।

চল আসমানীকে দেখতে যাই।

জ্বি চলুন।

কামরুল ইসলাম সাহেব উঠলেন না বসে রইলেন। কফি শেষ হয়ে গেছে তারপরেও তিনি শূন্য কাপে চুমুক দিচ্ছেন।ফরহাদ।জ্বি।তুমি কিন্তু আমার একটা প্রশ্নের জবাব দাও নি।কোন প্রশ্ন? পরের জন্মে তুমি কি হয়ে জন্মাতে চাও? আসমানীকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম সে খুব অদ্ভুত উত্তর দিল। সে বলল… কামরুল ইসলাম সাহেব কথা শেষ না করে উঠে পড়লেন। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, আমি হাসপাতালে যাব না। আমাকে বাসায় নামিয়ে রেখে তুমি যাও।

আরেকটা কথা আসমানীর অসুখটা যে ভয়াবহ এই তথ্য অবশ্যই গোপন রাখবে।জ্বি রাখব।আসমানী যখন ছোট ছিল তখন সে কিছু অদ্ভুত কান্ড করতো। একটা তোমাকে বলি…। ফরহাদ অদ্ভুত কান্ড শোনার জন্যে অপেক্ষা করছে, কিন্তু কামরুল ইসলাম সাহেব চুপ করে গেছেন। মনে হয় অদ্ভুত কান্ডের গল্প করতে এখন তিনি আর উৎসাহ পাচ্ছেন না।বাবু সাহেব কেমন আছেন?

হাসপাতালের বিছানায় বসে আসমানী চুল আঁচড়াচ্ছে। বেশ আয়োজন করেই আঁচড়াচ্ছে। বিছানার উপর স্ট্যান্ড লাগানো আয়না। নিজেকে দেখতে দেখতে চুল। আঁচড়ানো। আসমানী মনে হয় সাজগোজও করেছে। চোখে কাজল। কপালে টিপ। পরনের শাড়িটাও নতুন। মনে হচ্ছে না সে হাসপাতালে আছে। মনে হচ্ছে সে। নিজের বাড়িতেই বাস করছে। বিকেলে মহিলা সমিতিতে নাটক দেখতে যাবে। এটা তার প্রস্তুতি।বাবু সাহেব আমার কথার জবাব দিচ্ছেন না কেন? কেমন আছেন? ভাল।আপনি কি কখনো লক্ষ্য করেছেন আমার চুল কত লম্বা?

এখন লক্ষ্য করছি।দাঁড়িয়ে আছেন কেন বসুন।ফরহাদ বসতে বসতে বলল, তুমি একা কেন? তুমি আমাকে দেখতে আসছ এই জন্যে ইচ্ছা করে একা হয়েছি। বাবা আর নিশা ছিলেন তাদের জোর করে করে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। একজন আয়া ছিল বসিরের মা। তাকে বলেছি বিকেলে আসতে। আশা করি তুমি বিকেল পর্যন্ত থাকবে।

হ্যাঁ থাকব। শুধু বিকাল পর্যন্ত না যতক্ষণ আমাকে থাকতে দেয় ততক্ষণ থাকব।রাতে চলে যাবে? রাতেও যেতে চাচ্ছি না। হাসপাতালের লোকজন যদি অনুমতি দেয় তাহলে তোমার ঘরের সামনের বারান্দায় যে টুলটা আছে সেই টুলে শুয়ে থাকব। তুমি যতবার আমাকে ডাকবে ততবার আমি বাইরে থেকে জবাব দেব।

আসমানী হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, তুমি যে ভাবে কথা বললে তাতে মনে হচ্ছে তুমি সুনীলের কোন রোমান্টিক উপন্যাস থেকে উঠে এসেছ। আমি হচ্ছি নীরা। আমার অসুখ হয়েছে। নীরার অসুখ।নীরা কে? নীরা হল সুনীলের চির প্রেমিকা। তোমার জন্যে সিগারেট আনিয়ে রেখেছি। আমার সামনে বসে আরাম করে একটা সিগারেট খাওতো।হাসপাতালে রোগীর ঘরে বসে সিগারেট খাবো?

হ্যাঁ খাবে। কারণ আমি ছোট্ট একটা পরীক্ষা করতে চাই। আমার শরীরটা আজ কত ভাল সেই পরীক্ষা। যদি দেখি সিগারেটের গন্ধ সহ্য হচ্ছে—তাহলে বুঝব শরীর বেশ ভাল।শরীর ভাল লাগছে? হ্যাঁ ভাল লাগছে। আমি গান জানলে গুনগুন করে গান গাইতাম। আমি অবশ্যি গান না জানলেও গুনগুন করে গাই। সবচে বেশি কোন গানটা গাই জান? সবচে বেশী গাই–

ভালবেসে যদি সুখ নাহি

তবে কেন মিছে এ ভালবাসা।

আচ্ছা আমি কি খুব বকবক করছি?

ফরহাদ সিগারেট ধরাল। সে তাকিয়ে আছে আসমানীর দিকে। তাকে সামান্য রোগা লাগছে। চোখের কোণে কালি, সেই কালিও সামান্য। এছাড়া তার মধ্যে অসুস্থতার কোন চিহ্ন নেই। আসমানী বিছানার মাঝখন থেকে সরে এক পাশে চলে গেল। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসল। হঠাৎ তাকে সামান্য ক্লান্ত মনে হচ্ছে। ফরহাদ বলল, সিগারেটের গন্ধটা কি সহ্য হচ্ছে? আসমানী বলল, না।ফেলে দি?

না ফেলবে না। তুমি সিগারেট খাচ্ছ দেখতে ভাল লাগছে। আচ্ছা শোন আমার উচিত ছিল তোমার দাদাজান বিষয়ে কথা বলা। তোমাদের বাড়িতে একজন মানুষ মারা গেছে অথচ তা নিয়ে আমি কোন কথা বলিনি। আসলে ইচ্ছা করে বলি নি। তোমার সঙ্গে অপ্রিয় কোন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। আমি সারা জীবণু তোমার সঙ্গে সুখ নিয়ে কথা বলতে চাই।

ফরহাদ সিগারেট ফেলে দিল। আসমানী বলল, তোমাদের খুব দুঃসময় যাচ্ছে তাই না? ফরহাদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।আগের বাড়িটা কি তোমরা ছেড়ে দিয়েছ? আজ ছাড়ব।তোমরা উঠবে কোথায়? আমার একজন ছোটবোন আছে—-জাহানারা আপাতত তার বাড়িতে।তুমি কোন রকম দুঃশ্চিন্তা করবে না। তোমার সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।কি ভাবে? কি ভাবে তা জানি না। কিন্তু হবে।

If winter comes can spring be far behind?

ফরহাদ হাসতে হাসতে বলল, সাহিত্যে অনেক সুন্দর সুন্দর কোটেশন আছে। কিন্তু পৃথিবীটা কোটেশন মত চলে না। পৃথিবী চলে তার নিজের নিয়মে। সেই নিয়মটা কি তাও আমরা ভালমত জানি না।প্লীজ দার্শনিকের মত কথা বলবে না। অসহ্য লাগছে।আচ্ছা বলব না।

আমার বড় মামা কি আমাদের বিয়ের ব্যাপারে তোমাকে কিছু বলেছেন? না।আমার মনে হয় বলেছেন। তিনি এখন চান না যে বিয়েটা হোক। তিনি এখন বলছেন—বিয়ে হবে আমার অসুখ সারলে।সেটাইতো ভাল।সেটা মোটেই ভাল না; অসুখ সারার জন্যে অপেক্ষা করলে আর আমার বিয়ে হবে না। কারণ আমার অসুখ সারবে না।সারবে না কেন?

সারবে না কারণ, অসুখটা ভয়ংকর। যদিও সবাই আমাকে বলছে রিউম্যাটিক ফিভার। আমি জানি ব্যাপারটা কি? জেনেও ভাণ করছি জানি না। আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তোমার সঙ্গে ভাণ করব না। কাজেই সত্যি কথা বললাম।ফরহাদ চুপ করে গেছে। সে এখন আর আসমানীর দিকে তাকাচ্ছে না। তাকিয়ে আছে খোলা দরজার দিকে। আসমানী বলল, এই তুমি অন্যদিকে তাকিয়ে আছ কেন? তুমি যতক্ষণ আমার সামনে থাকবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে।

ফরহাদ তাকাল। আসমানী বলল, এই তো ঠিক আছে। এখন মন দিয়ে আমার জরুরি কথাটা শোন—আমার অসুখ যত ভয়ংকরই হোক আমি একদিনের জন্যে হলেও তোমাকে বিয়ে করতে চাই। মামা এই বিয়ে হতে দেবে না। কাজেই তুমি যা করবে তা হচ্ছে কাজির অফিসে ব্যবস্থা করে রাখবে। আমি গোপনে উপস্থিত হব। বিয়ে শেষ হলে হাসপাতালে ফিরে এসে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকব। ঠিক আছে?

হ্যাঁ ঠিক আছে।আচ্ছা শোন পৃথিবীর সমস্ত প্রেমিক তার প্রেমিকার চুল হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে চায়। তুমি কখনো আমার চুল ছুঁয়ে দেখনি। নাও চুলগুলি ছুঁয়ে দেখ। কারণ বেশিদিন আমার মাথায় চুল থাকবে না। যখন কেমোথেরাপি শুরু হবে সব চুল পড়ে যাবে। নাও চুলে হাত দাও।

ফরহাদ ফুল স্পর্শ করল।আসমানী হোট্ট করে নিশ্বাস ফেলে বলল, এখন তুমি চলে যাও।চলে যাব।হ্যাঁ চলে যাবে। কারণ তোমাকে দেখে আমার খুব খারাপ লাগছে। কষ্ট হচ্ছে, এবং কান্না পাচ্ছে। তুমি সারা জীবন আমার পাশে থাকবে না, ভাবতেও পারছি না। সত্যি সত্যি হয়তো কেঁদে ফেলব। আমাকে কাঁদতে দেখে তুমি কাঁদবে।

পুরুষ মানুষের কান্না খুব বিশ্রী। প্লিজ তুমি বিদেয় হও। ফরহাদ অবিশ্বাসী গলায় বলল, বিদেয় হব।হ্যাঁ বিদেয় হবে। আর শোন আমাকে বিয়ে করতে হবে না। এতক্ষণ তোমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিলাম। যে মেয়ে কবরের উপর দাঁড়িয়ে আছে তার আবার বিয়ে কি? আচ্ছা বল তো আমাকে কি আজ সুন্দর লাগছে?

 

Read more

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১৪ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.