Categories
শিল্প-ও-সাহিত্য

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

অম্বার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে । সে ক্ষীণস্বরে বলল, আমি মরতে চাই না । এরা আমাকে মেরে ফেলবে ।

সম্রাট ঘোড়া থেকে নামলেন । অম্বার কাছে এগিয়ে গেলেন । গলা নিচু করে বললেন, আমি নিজের হাতে তোমাকে পানি খেতে দেব । তুমি বিসমিল্লাহ্ বলে সেই পানি খাবে । মনে থাকবে ?

অম্বা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। সে খানিকটা হকচকিয়ে গেছে । মেয়েটির আত্মীয়স্বজন এবং জড়ো হওয়া লোকজন এগিয়ে আসতে চাচ্ছে কিন্তু সম্রাটের রক্ষীবাহিনীর কারণে কাছে আসতে পারছে না । তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে । হুমায়ূন তাদের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচু করে বললেন, অম্বা নামের এই মেয়েটা এইমাত্র আমার হাতে বিসমিল্লাহ্ বলে পানি খেয়েছে । বিধর্মীর হাতে পানি খাওয়ার কারণে তার জাত গেছে । বিসমিল্লাহ্ বলায় মেয়েটি মুসলমান হয়ে গেছে । আমার আইনে কোনো মুসলমান মেয়েকে সতী হিসেবে দাহ করা যাবে না ।

সম্রাট হুমায়ূন অম্বাকে নিয়ে শিবিরের দিকে রওনা হলেন । মাতাল ডোমের দল লাঠিসোটা নিয়ে পিছন পিছন ছুটল । তাদের সঙ্গে পুরোহিতের দল । বাজনাদারদের দল । মহিলাদের দল । ‘সতী’ কন্যাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে-এ হতে দেওয়া যায় না ।

সম্রাটের নির্দেশে তীরন্দাজরা তীর ছুঁড়ল । অব্যর্থ তীরের আঘাতে চারজন পুরোহিতের তিনজনই মাটিতে লুটিয়ে পড়ল । হতভম্ব দল উল্টাদিকে দৌড়াতে শুরু করল ।

মাগরেবের নামাজের শেষে সম্রাট দরবার বসিয়েছেন । চুনার দুর্গ দখলে এসেছে । দুর্গের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে সেই বিষয়ে পরামর্শসভা বসেছে । বাংলামুলুক অভিযানে কখন রওনা হতে হবে-সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে । আজকের সভা গুরুত্বপূর্ণ। আমীররা সবাই উপস্থিত ।রুমী খাঁ (মীর আতশ) উপস্থিত ।দরবারে খাসের নিয়ম ভঙ্গ করে চারজন নর্তকী উপস্থিত ।এদেরকে আনা হয়েছে চুনার দুর্গ থেকে । গুরুত্বপূর্ণ সভায় নর্তকীরা কখনোই উপস্থিত থাকে না । আজ তারা কেন উপস্তিত বোঝা যাচ্ছে না। নর্তকীরা ভীতসন্তস্ত্র । তারা মাথা নিচু করে আছে । কিছুক্ষণ পরপর একে অন্যের ‍দিকে তাকাচ্ছে । একজন গোপনে অশ্রুবর্ষণ করছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

সম্রাট চুনার দুর্গ দখলে আসার কারণে আল্লাহ্ পাকের দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন । সবাই বলল, আমীন ।

আমীর বেগ মীরেক-কে চুনার দুর্গের গভর্নরের দায়িত্ব দেওয়া হলো । সবাই বলল, অতি উত্তম সিদ্ধান্ত ।

সম্রাট সবাইকে ভোজসভায় আহ্বান জানালেন । মীর আতশ বললেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং গোপন মিটিংয়ে নর্তকীরা উপস্থিত । এর কারণ বুঝতে পারছি না ।

সম্রাট বললেন, এরা আমার কাছে একটা অভিযোগ করেছে । অভিযোগ গুরুতর । আমার ধারণা অভিযোগ মিথ্যা । যদি মিথ্যা প্রমাণিত হয় তাহলে হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে এদের হত্যা করা হবে ।

বৈরাম থাঁ বললেন, অভিযোগ কী ?

হুমায়ূন বললেন, অভিযোগ হচ্ছে রুমী খাঁ দুর্গে প্রবেশের পরপর সাড়ে তিন শ’ মানুষের দুই হাত কেটে ফেলার নির্দেশ ‍দিয়েছেন । সেই নির্দেশ সঙ্গে সঙ্গে পালন করা হয়েছে । রুমী খাঁ, এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী ?

রুমী খাঁ বললেন, ঘটনা সত্য । আমি যা করেছি মহান সম্রাটের নিরাপত্তার জন্যে করেছি । যে সাড়ে তিন শ’ মানুষের দুই হাত কেটে ফেলা হয়েছে, এরা সবাই দুর্ধর্ষ কামানচি । এরা যেন আর কখনো সম্রাটের বাহিনীর উপর কামান চালাতে না পারে সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছে । শক্রকে সমূলে বিনাশ করতে হয় ।

হুমায়ূন বললেন, আপনাকে সাহসী মানুষ ভেবেছি । আপনি নিতান্তই কাপুরুষের মতো একটি কাজ করেছেন । আমি কাপুরুষ অপছন্দ করি ।

যুদ্ধক্ষেত্রে কাপুরুষতা একটি সৎ গুণ । অনেক সময় কাপুরুষতা যুদ্ধজয়ে ভূমিকা রাখে।

সম্রাট বললেন, দুর্গের মানুষজন দুর্গ সমর্পণ করেছেন । কাজেই দুর্গ যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল না । আপনি যে ভয়াবহ অন্যায় করেছেন, তার শাস্তি আপনারও দুই হাত কেটে নেওয়া ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

উপস্থিত আমীরদের একজন বললেন, সম্রাটকে আমি তাঁর আদেশ পুনর্বিবেচনা করার  জন্যে অনুরোধ করছি । সম্রাটের কামানবহর পরিচালনার দায়িত্ব রুমী খাঁর উপর । শের খানের বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধযাত্রা করব । যুদ্ধের জয় পরাজয় নির্ভর করবে কামানের উপর । অর্থাৎ রুমী খাঁর নৈপুণ্যের উপর । যার রণকৌশলে মুগ্ধ হয়ে সম্রাট তাকে মীর আতশ সম্মানে সম্মানিত করেছেন ।

হুমায়ূন বললেন, যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ভর করে মহান আল্লাহ্ পাকের ইচ্ছায় । কাপুরুষ রুমী খাঁর নৈপুণ্যে না । আগামীকাল ফজরের নামাজের পর মীর আতশের দুই হাত কনুই থেকে কেটে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছি ।

সম্র্রাট দরবার ছেড়ে উঠে পড়লেন  । মাগরেবের নামাজের সময় হয়েছে । তিনি অজু করার জন্যে উঠে পড়লেন । রুমী খাঁকে গ্রেফতার করে তার তাঁবুতে নিয়ে যাওয়া হলো । রুমী খাঁ সেই রাতেই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলেন ।

অম্বার জায়গা হয়েছে হুমায়ূনের মেয়ে আকিকা বেগমের তাঁবুতে । অম্বা অতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে গেছে । একদিন আগের ঘটনার স্মৃতি কিছুই তার মনে নেই । অম্বা আকিকা বেগমের তাঁবুর জাঁকজমক দেখে হতভম্ব । চারজন খোজা প্রহরী সারাক্ষণ তাঁর পাহারা দিচ্ছে । আকিকা বেগমের সেবায় নিযুক্ত আছে আটজন দাসী । দু’জন দাসীর হাতে ময়ূরের পালক বানানো বিশাল পাখা । তারা সারাক্ষণই হাওয়া করছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

আকিকা বেগম অম্বাকে খুবই পছন্দ করেছে । সে তার সঙ্গে পদ্মা ফুল পাতিয়েছে । আকিকা বেগম তার গলার নীলকান্তমণির মালা অম্বার গলায় পরিয়ে দিয়েছে । এখন চলছে ধাঁধার আসর । ধাঁধার উত্তর যে দিতে পারবে না, তাকে সঙ্গে সঙ্গে নাকে মাটি ঘষতে হবে । দু’জনের হাতেই মাটির দলা ।

আকিকা বলল, দিনে রাজপ্রাসাদে থাকে রাতে থাকে জঙ্গলে, ফজরের ওয়াক্তে থাকে মাটির নিচে । এটা কী ?

অম্বা বলল, জানি না ।

আকিকা বলল, মাটি ঘষো ।

অম্বা নাকে মাটি ঘষল ।

আকিকা বলল, এখন তোমার পালা ।

অম্বা বলল, তার এক শ’ চোখ । কিন্তু সে চোখে দেখে না ।

আকিকা এক শ’ চোখ কিন্তু চোখে দেখে না । আমি জানি না এটা কী ।

এর নাম আনারস ।

আনারস আবার কী ?

এক ধরনের ফল বাঙ্গালমুলুকে পাওয়া যায় ।

আকিকা বেগম আনারস ফল বাঙ্গালমুলুক থেকে আনার হুকুম দিল । ফল দেখার পর সে নাকে মাটি ঘষবে । আকিকা বেগমের নির্দেশে দু’জন অশ্বারোহী আনারসের সন্ধানে গেল । অম্বা হতভম্ব । বাচ্চা একটি মেয়ের এত ক্ষমতা!

শের খাঁ গোপন বৈঠকে বসেছেন । চুনার দুর্গ হাতছাড়া হওয়ায় তাঁকে মোটেই বিচলিত বলে মনে হচ্ছে না । শের খাঁ’র দুই পুত্র এবং তিনজন সেনাপতি বৈঠকে উপস্থিত । শের খাঁ বললেন, আমি নিশ্চিত সম্রাট হুমায়ূনকে আমরা পরাজিত করব । আমার পরিকল্পনা নির্ভুল । চুনার দুর্গ দখলের জন্যে হুমায়ূন ছয় মাস অপেক্ষা করেছেন । এই ছয় মাস আমি শক্তি সঞ্চয় করেছি । সম্রাটের প্রধান স্তম্ভ রুমী খাঁ গত । এটা আমাদের জন্যে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –১১

উপস্থিত সবাই বলল, মারহাবা।

শের খাঁ বললেন, এখানে উপস্থিত সবার প্রতি আমার একটি কঠিন নির্দেশ আছে ।

সম্রাট হুমায়ূনকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা করা যাবে না ।

শের খাঁর পুত্র জলাল খাঁ বললেন, কেন না ?

শের খাঁ বললেন, হুমায়ূন আমার পরম শত্রু এটা সত্যি, কিন্তু তিনি এমন শত্রু যাঁকে আমি শ্রদ্ধা এবং সম্মান করি ।

তিনি মহান মানুষদের একজন ।

এই মানুষটির অন্তর স্বর্ণখণ্ডের মতো উজ্জ্বল ।

সেখানে কলুষতার কণামাত্রও নাই ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –১২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *