মধ্যাহ্ন-(শেষ পর্ব)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

একবার কিছু পড়লেই তার মনে থাকে। শশী মাস্টার তার এই ছাত্রটিকে কোনাে এক বিচিত্র কারণে সহ্য করতে পারেন না।…….ব্রিটিশ সরকার সে সময়ে একটি বৃত্তি চালু করেছিলেন। সমগ্র ভারতে ক্লাস টু’র ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রতিযােগিতামূলক পরীক্ষায় এই বৃত্তি দেয়া হতাে। মাসিক দু’টাকা হারে এক বৎসরের জন্যে বৃত্তি। সুলেমানের ছেলে জহির এই বৃত্তি পেয়ে সবাইকে চমকে দিল ।

জেলা শিক্ষা অফিসার আলহাজ রমিজউদ্দিন সাহেব বৃত্তির খবর নিয়ে বান্ধবপুরে উপস্থিত হলেন। জহিরের মাথায় হাত রেখে চোখ বন্ধ করে দোয়া করলেন। তারপর জহিরকে কাছে টেনে গলা নামিয়ে বললেন, তােমার মা নাকি তােমাদের সঙ্গে থাকে না। এটা কি সত্য ? 

জহির বলল, সত্য। সে থাকে কোথায় ? জহির চুপ করে রইল। জবাব দিল না।। কোথায় থাকে জানাে না ? ………..জহির এই প্রশ্নেরও জবাব দিল না। আলহাজ রমিজউদ্দিন গলা আরাে খাদে নামিয়ে বললেন, লােকমুখে শুনলাম তােমার মা রঙিলা নটিবাড়িতে থাকে, এটা কি সত্য ? 

সত্য। ………..ঠিক আছে। ঠিক আছে। যা হয় সবই আল্লাহ পাকের হুকুমেই হয়। উনার হুকুম বিনা কিছু হয় না। তুমি নিজের মতাে লেখাপড়া চালিয়ে যাবে। তােমার মা কোথায় থাকে কী সমাচার তা নিয়া মাথা ঘামাবে না। ঠিক আছে ? 

হুঁ না, বলাে জি আচ্ছা, জনাব । এইসব সহি আদব। শুধু লেখাপড়া শিখলে হবে না। আদবও শিখতে হবে। বললা, জি আচ্ছা, জনাব। জি আচ্ছা, জনাব।

মধ্যাহ্ন-(শেষ পর্ব)-হুমায়ূন আহমেদ

আলহাজ্ব রমিজউদ্দিন জহিরকে একটা ফাউন্টেনপেন উপহার হিসেবে দিয়ে গেলেন। ফাউন্টেনপেনের নাম রাইটার। ………..শশী মাস্টারের কাছে জুলেখার শীতলপাটি পৌঁছেছে। যে নিয়ে এসেছে তার নাম সামছু সদাগর। মিশাখালি বাজারে তার পাটের আড়ত। শশী মাস্টার বললেন, পাটি কে দিয়েছে ? 

সামছু সদাগর বললেন, রঙিলা নটিবাড়ির এক নটি দিয়েছে। রাখলে রাখেন, না রাখলে ফেলে দেন। নটির নাম চান বিবি। …………..চান বিবি নামে কাউকে আমি চিনি না। ……..আপনি মাস্টার মানুষ। আপনার না চেনাই ভালাে। তার আরেক নাম জুলেখা । 

জুলেখা ? সামছু সদাগর বললেন, এখন কি চিনেছেন ? হ্যা চিনেছি। পরিচয় ছিল আপনার সাথে ? …….ছিল। চাইপা যান। কাউরে কবেন না। মাস্টার সাব, উঠি ? ……..শশী মাস্টার সারা দুপুর ঝিম ধরে বসে রইলেন। সন্ধ্যার পর কলের গান ছেড়ে জামগাছের নিচে গভীর রাত পর্যন্ত বসে রইলেন। 

মাওলানা ইদরিসের কাছে জুলেখার পাঠানাে তুর্কি টুপি পৌছেছে। সামছু সদাগরই নিয়ে গেছে। ……….মাওলানা বললেন, আপনারে তাে চিনলাম না। ……সামছু সদাগর বললেন, আমারে চেনার প্রয়ােজন নাই। আপনার কাছে একটা জিনিস পৌছায়ে দেওয়ার কথা । দিলাম । ….জিনিসটা দিয়েছে কে? চান বিবি দিয়েছে। চান বিবিকে তাে চিনি না! 

মধ্যাহ্ন-(শেষ পর্ব)-হুমায়ূন আহমেদ

সামছু সদাগর উদাস গলায় বললেন, এখন তারে না চেনাই ভালাে। সময়ে চেনা সময়ে না–চেনা বুদ্ধিমান মানুষের লক্ষণ। আপনি বুদ্ধিমান। …….মাওলানা ইদরিস বললেন, একজন এত সুন্দর একটা টুপি পাঠায়েছে, তারে চিনব না— এটা কেমন কথা ? 

সামছু বলল, চিনতে হইলে রঙিলা নটি বাড়িতে যান। ঐ মেয়ে রঙিলা বাড়ির নটি । …..মাওলানা হতভম্ব গলায় বললেন, এইটা কী কথা? ……সত্য কথা । নটি বেটি আপনারে টুপি পাঠায়েছে। বড়ই সৌন্দর্য মেয়ে। বেহেশতের হুর বরাবর সুন্দর। তার টুপি আপনি মাথায় দিয়ে জুম্মার নামাও। পড়বেন, না গাঙের পানিতে ফেলবেন— এটা আপনার বিবেচনা। আমি উঠলাম। 

তুর্কি ফেজ টুপিটা টিনের ট্রাঙ্কের উপর রাখা। টুপিটা কোথেকে এসেছে মাওলানা এখন বুঝতে পারছেন। এই টুপি মাথায় দেয়ার প্রশ্নই আসে না। গাঙের পানিতে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। টুপির মতাে পবিত্র একটি বস্তু পানিতে ফেলে দেওয়া কি ঠিক ?

এই বিষয়ে হাদিস কোরানের পরিষ্কার ব্যাখ্যা কী তাও তিনি জানেন না। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবেন তাও সম্ভব হচ্ছে না। হাদিস কোরান জানা লােক আশেপাশে কেউ নেই। তার খুবই ইচ্ছা দেওবন্দ মাদ্রাসায় যাওয়া। তার মনে অনেক প্রশ্ন আছে। তিনি হাতির ছবিআঁকা একটা দু‘নম্বরি খাতায় প্রশ্নগুলি লিখে রেখেছেন। যেমন, রােজার সময় ধূমপান করলে কি রােজা ভাঙে? চিংড়ি মাছ খাওয়া মকরুহ। কাঁকড়া খাওয়াও কি মকরুহ ? মাওলানা টুপি বিষয়ক একটি প্রশ্ন খাতায় লিখলেন। 

মধ্যাহ্ন-(শেষ পর্ব)-হুমায়ূন আহমেদ

কোনাে ব্যক্তি (পুরুষ বা মহিলা) যদি অসৎপথে উপার্জন করা অর্থের বিনিময়ে কাউকে টুপি, তসবিহ কিংবা জায়নামাজ দেয় তখন সেই টুপি, তসবিহ, জায়নামাজ ব্যবহার করা কি জায়েজ আছে ? টুপিটা ঘরে আসার পর থেকে মাওলানা ভালাে সমস্যায় আছেন। প্রায়ই রাতে জুলেখাকে স্বপ্নে দেখছেন। স্বপ্নের ধরন দেখে তিনি নিশ্চিত স্বপ্নগুলি ইবলিশ শয়তান দেখাচ্ছে। একটি স্বপ্নে তিনি দেখলেন জুলেখা তার স্ত্রী (নাউজুবিল্লাহ)। সে তার বাড়িতেই থাকে। ঘরদুয়ার ঠিকঠাক রাখে । রান্না করে। রাতে সব কাজকর্ম শেষ করে বানানাে পান হাতে নিয়ে তার সঙ্গে ঘুমাতে আসে (নাউজুবিল্লাহ)। 

এরচেয়েও খারাপ স্বপ্ন একবার দেখলেন। এমন স্বপ্ন যা কাউকে বলা যাবে না। তার অত্যন্ত মনখারাপ হলাে। ইবলিশ শয়তান কোনাে এক জটিল খেলা শুরু করেছে, এই বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। তার মতাে নাদান মানুষ কীভাবে শয়তানের হাত থেকে বাচবেন ? তার কতটুকই বা ক্ষমতা ? হযরত আদমের মতাে মানুষ শয়তানের ধোকা থেকে বাঁচতে পারেন নাই। এমনকি একবার আমাদের নবিজিকেও শয়তান ধোকা দিয়েছিল। নবিজির মুখ দিয়ে ওহি হিসেবে মিথ্যা আয়াত বলিয়েছিল। 

গভীর রাতে ইবলিশ শয়তান কিংবা তার সাঙ্গপাঙ্গ যে তার বাড়ির চারপাশে | ঘােরাঘুরি করে, গাছের ডাল নড়ায়, এটা তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারেন। বাতাস নেই কিছু নেই, গাছের ডাল নড়ছে। একবার রাতে তসবি পড়ছিলেন, হঠাৎ পেছনের জানালা আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেল। আবার খুলল।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *