মৃন্ময়ী-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

আসলে তা না, মা জগতের বেশির ভাগ বিষয় সম্পর্কেই কিছু জানেন না। জানার আগ্রহও নেই। তবে এই ঘটনা বাইরের কারাের বােঝার সাধ্যও নেই। উদাহরণ দিয়ে বলি, একবার আমাদের ড্রয়িংরুমে বাবার কিছু বন্ধু (বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।

এদের সঙ্গে বাবার সামান্য যােগাযােগ। আছে। দু‘ তিন মাস পরপর দাওয়াত করে খাওয়ান।) মিলে আড্ডা জমিয়েছে। মা–ও আছেন তাদের সঙ্গে। তুমুল আলােচনা চলছে। আলােচনার বিষয় ‘ব্ল্যাক হােল। মাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি গভীর মনােযােগ দিয়ে আলােচনা শুনছেন। এবং ব্ল্যাকহােলের রহস্যময়তায় তিনি চমৎকৃত। স্টিফান হকিং লােকটির মেধায় অভিভূত। 

আলােচনার এক পর্যায়ে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, ব্ল্যাক হােলের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভয়াবহ। সে সবকিছুই টেনে নিজের ভেতর নিয়ে নেয়। আচ্ছা, এখন যদি সমান ক্ষমতার দু’টা ব্ল্যাক হােল সামনাসামনি চলে আসে তখন কী হবে? দু’জনই তাে চেষ্টা করবে অন্যজনকে নিজের ভেতর নিয়ে আসতে। 

আডডা কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়ে গেল। তারপর সবাই কথা বলতে শুরু করল— মা‘র দেয়া সমস্যা নিয়ে। সবাই মহাউৎসাহী। শুধু বাবা বিরক্ত মুখে মা‘র দিকে তাকিয়ে রইলেন। কারণ তিনি জানেন— মা ভেবে–চিন্তে কিছু বলেন নি। মনে একটা কথা এসেছে, বলে ফেলেছেন— এখন আবার যাবেন চা–নাস্তার ব্যবস্থা করতে। দু‘টা সমান শক্তির ব্ল্যাক হােল মুখােমুখি থাকলে মার কিছুই যায় আসে।

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

ওরা ওদের মতো দড়ি টানাটানি করুক। দুইজন একটা সময় দুইজনকে গিলে ফেলুক। চায়ের সঙ্গে নাস্তা ঠিকমতাে দিতে পারলেই তিনি খুশি। 

অস্থির ভঙ্গিতে টানা বারান্দায় বাবা হাঁটাহাঁটি করছেন। আমাকে দেখে এমনভাবে তাকালেন যেন চিনতে পারছেন না। এর একটাই অর্থ— কোনাে একটা বিষয় নিয়ে বাবা খুব চিন্তিত। আমি বললাম, বাবা ঘুম আসছে না? …………বাবা বললেন, এখনাে বিছানায় যাই নি। কাজেই ঘুম আসছে কি আসছে না বুঝতে পারছি না। এনি প্রবলেম ? 

বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, টগরের ঘরে একটা ছেলে এসেছে। ছেলেটাকে আমি চিনি। পুলিশ তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ছেলেটা মনে হয় রাতে থাকতে এসেছে। আমি নিশ্চিত। আগেও কয়েক রাত এ বাড়িতে কাটিয়েছে।………………..আমি বললাম, এটা এমন কোনাে সমস্যা না। আমি ভাইয়াকে গিয়ে বলছি ছেলেটাকে বিদায় করে দিতে। 

ছেলেটির সামনে কিছু বলবি না। এদের ঘাটানাে ঠিক না। তুই বরং টগরকে ডেকে নিয়ে আয়। যা বলার আমি বলব। …………………ভাইয়ার ঘরের দরজা খােলা। ঘরে বাতি জ্বলছে। ভাইয়া চেয়ারে বসে কী যেন লিখছে। এত রাতে আমাকে ঢুকতে দেখে সে কিছু মাত্র অবাক হলাে না। যেন সে আমার জন্যেই অপেক্ষা করছিল। লেখা থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, কী ব্যাপার ? 

আমি বললাম, কোনাে ব্যাপার না। তােমার কাছে কেউ কি এসেছিল ? ভাইয়া অবাক হয়ে বলল, না তাে! ……..বাবার ধারণা কেউ তােমার কাছে এসেছিল। বাবা এটা নিয়ে খুব চিন্তিত। ভাইয়া তুমি খুব খেয়াল রাখবে— কেউ যেন তােমার কাছে না আসে। আর যদি এসেও পড়ে, চেষ্টা করবে তৎক্ষণাৎ বিদায় করতে। তাই তো করি। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

বাবার ধারণা— তুমি উল্টোটা করাে। মাঝে মাঝে তােমার দু একজন বন্ধু তােমার ঘরে রাত কাটায়। ……….আর কিছু বলবি? ………..বলব। কথাগুলাে শুধু যে বাবার তা না। আমারও কথা। ভাইয়া, সাবধান থাক। সময়টা খুব খারাপ। 

আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি কী লিখছ ? ………….ভাইয়া চট করে খাতা বন্ধ করে বলল, কিছু লিখছি না। তাের কথা শেষ হয়ে থাকলে চলে যা। ……………………………..কাউকে চিঠি লিখছ না–কি? 

ভাইয়া মাথা নিচু করে হাসল। তার হাসি মুখ দেখে আমার আবারাে মনে হলাে— ঢাকা শহরের প্রথম তিনজন রূপবান যুবকের মধ্যে ভাইয়া একজন। শৈশবে যাদের খুব সুন্দর দেখায় যৌবনে তারা কেমন যেন ভােতা টাইপ হয়ে যায়। ভাইয়ার বেলায় ঘটনা অন্যরকম। যত দিন যাচ্ছে, সে ততই সুন্দর হচ্ছে। আমার বুকে ধাক্কার মতাে লাগল। প্রকৃতি রূপবান পুরুষ পছন্দ করে না। তাদের মধ্যে বড় ধরনের কিছু সমস্যা দিয়ে দেয়। ভাইয়ার ভেতর কোনাে সমস্যা দিয়ে দেয় নি তাে ? 

বাবা উদ্বিগ্ন গলায় বললেন, টগরকে বলেছিস ? ……….কিছু বলতে হয় নি বাবা। ভাইয়ার ঘর ফাঁকা। মশা-মাছি পর্যন্ত নেই। দেয়ালে একটা কালাে রঙের টিকটিকি ছাড়া কিছু নেই। ……….ভালাে করে দেখেছিস ? খাটের নিচে বসে নেই তাে? খাটের নিচে বসে থাকবে কেন ? 

এরা ডেনজারাস ছেলে। খাটের নিচে বসে থাকবে। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে। দরজার আড়ালে থাকবে। যা, আবার যা। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

কোনাে দরকার নেই বাবা। দরকার আছে কিনা সেটা আমি বুঝব। তােকে দেখতে বলছি তুই দেখ। ……..আমি আবারাে সিঁড়ির দিকে এগুলাম। ভাইয়ার ঘরে দ্বিতীয়বার যাবার কোনাে অর্থ হয় না। একতলার বারান্দায় কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে চলে আসব। বাবা নিশ্চয়ই দোতলার বারান্দা থেকে টেলিস্কোপ ফিট করে বসে থাকবেন না দেখার জন্যে যে আমি দায়িত্ব পালন করছি কি–না। 

ভাইয়ার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। বাতি নেভানাে। আমি নিঃশব্দে দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম। কান পাতলাম। ভাইয়ার কথা শােনা যাচ্ছে। সে যে একা একা কথা বলছে তাও না। যে জবাব দিচ্ছে তার গলার স্বর ভারি। রেডিও–টিভির এ্যানাউনসারদের মতাে গলা। কথাবার্তা হচ্ছে খুবই হাস্যকর বিষয় নিয়ে। মােটা গলার মানুষটা বলছে— শিউলি ফুলের পাতা দিয়ে এক ধরনের ভাজি হয়। টগর তুই খেয়েছিস কখনাে ? 

ভাইয়া বলল, না। ………..কচি পাতাগুলি কড়া করে তেলে ভাজা হয়, সঙ্গে থাকে প্রচুর পেয়াজ–রসুন আর শুকনা মরিচ। খেতে অসাধারণ হয়। গ্রামে যখন যাই এটাই হয় আমার প্রধান খাদ্য। দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য কি জানিস ? ………………………দ্বিতীয় প্রধান খাদ্য হলাে নাইল্যা পাতা ভাজি। নাইল্যা পাতাটা কী? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

পাট শাককে বলে নাইল্যা পাতা। পাট শাক রান্নার দুটো পদ্ধতি আছে। একটা ঝােল ঝােল, আরেকটা শুকনা শুকনা । আগুন গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের ওপর শুকনা নাইল্যা পাতা ছড়িয়ে দিয়ে যদি ভাত খাস তাহলে তাের মুখে এই জিনিস ছাড়া কিছুই রুচবে না। দেখি একটা সিগারেট দে। 

সিগারেট তাে নাই। সর্বনাশ! সিগারেট ছাড়া এত বড় রাত কাটাবাে কী করে ? দোকান থেকে নিয়ে আসব ? ……….আরে না। তাের বাসার সামনে পুলিশের দুজন ইনফরমার বসে আছে। তাের বাবা তাে সিগারেট খায় তার প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট ম্যানেজ করতে পারবি না ? 

একটা কাগজ দলা পাকিয়ে সিগারেটের মতাে বানিয়ে দে। এটাই টানি। কিছু ধোয়া যাক। এতে দু’টা কাজ হবে সিগারেটের তৃষ্ণা মিটবে। ক্ষুধাটা কমবে। 

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *