• Saturday , 24 October 2020

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

সভায় নিয়ম অনুযায়ী সবাই একসঙ্গে বলল, মারহাবা!মারহাবা!

সম্রাট বললেন, আগ্রার বুলবুল আসহারি, তোমার কি আর কিছু বলার আছে ?

আসহারি বলল, আছে সম্রাটের অভয় পেলেই বলতে পারি ।

বলো ।

আমি হেরেমবাসী । এতগুলি স্বর্ণমুদ্রা লুকিয়ে রাখা হেরেমে সম্ভব না । আমি আমার এই সম্পদ রাজকোষে জমা দিতে চাই । সম্রাট অনেক জনহিতকর কাজে রাজকোষের সম্পদ ব্যবহার করেন । আমার সামান্য অর্থ সেই কাজে ব্যবহৃত হলেই আমি খুশি হব ।

সম্রাট বললেন, তা-ই করা হবে । আমি আগ্রার বুলবুলের কথায় সন্তোষ লাভ করেছি ।

দরবারে আম শেষ হওয়ায় পর সম্রাট একটা ফরমান জারি করলেন । সেই ফরমানে বলা হলো-এখন থেকে সম্রাট যেখানে যাবেন, প্রমোদভ্রমণ হোক বা যুদ্ধযাত্রা , আগ্রার বুলবুল তাঁর সঙ্গে থাকবে । সে তার বাদ্যযন্ত্রীদের নিয়ে আলাদা রাজকীয় তাঁবুতে থাকবে । তার সেবায় দশজন খোজা প্রহরী থাকবে । ‘মিরনসুর’ পরগানা খেলাত হিসেবে আগ্রার বুলবুলকে দেওয়া হলো । এই পরগনার আয় আগ্রার বুলবুল আসহারি পাবে।

দুই মাসব্যাপী উৎসব শুরু হয়েছে ।প্রচণ্ড দাবাদাহ হঠাৎ শীতল হয়ে গেল।আগ্রার উপর ভারী বর্ষণ, এই সঙ্গে শিলাবৃষ্টি । দুই সের ওজনের একটি শিলা এক প্রজা নিয়ে এল বাদশাহকে দেখাতে । সম্রাট খুশি হয়ে তাকে একটা আশরাফি দিলেন । এতবড় শিলা তিনি আগে কখনো দেখেন নি । তিনি তাঁর দিনলিপিতে লিখলেন,আল্লাহপাকের রহমত এবং নিদর্শন চারদিকে ছড়ানো ।আমরা অন্ধ বলেই তা দেখি না । প্রকাণ্ড এক শিলার মাধ্যমে পরম করুণাময় তাঁর নিদর্শন তাঁর দীন সেবককে দেখালেন । সোবাহানাল্লাহ্।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

শিলাখণ্ড গলিয়ে তার পানি সম্রাট পান করলেন । পানিতে বারুদের গন্ধ তাঁকে বিস্মিত করল । এটা কি কোনো যুদ্ধের আলামত? তাঁকে কি যুদ্ধযাত্রা করতে বলা হচ্ছে ?

শাহি ফরমান জারি হয়েছে । সম্রাট হুমায়ূন শের খাঁ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করবেন । শের খাঁকে বন্দি অবস্থায় দিল্লী আনা হবে । সেই উপলক্ষে মাসব্যাপী উৎসব । উৎসবের নাম ঠিক হয়েছে ‘শের খাতেমুন’, যার অর্থ- শেরের শেষ ।

শের খাঁকে বন্দি করতে কতদিন লাগবে এটা বোঝা যাচ্ছে না । সে সরাসরি সম্মুখ সমরে আসে না । চোরাগোপ্তা হামলা করে । তার যুদ্ধ কাপুরুষের যুদ্ধ । মোঘল বাহিনী কাপুরুষ যুদ্ধে অভ্যস্ত না বলেই সমস্যা । সম্রাট বাংলা মুলুক কখনো দেখেন নি । শের খাঁকে পরাস্ত করে তিনি বাংলা মুলুকে কিছুদিন বাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন । বাংলা মুলুকের বর্ষার অনেক গল্প শুনেছেন । সেই বর্ষা দেখবেন । বর্ষায় সেখানকার সব নদী নাকি সমুদ্রের মতো হয়ে যায় । এক কূল থেকে আরেক কূল দেখা যায় না । তাঁর নদী দেখার শখ আছে । বাংলা মুলুকের হিজড়ারা নাকি নৃত্যগীতে বিশেষ পারদর্শী । তাদের নৃত্যগীত সাধারণ নৃত্যগীতের চেয়ে আলাদা । কতটা আলাদা সেটাও সম্রাটের দেখার ইচ্ছা ।*

মোঘল সম্রাটদের যুদ্ধযাত্রা বিশাল ব্যাপার । চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেল । যুদ্ধযাত্রার খরচ হিসেবে আমীররা সঞ্চিত ধনরত্ন জমা দিতে শুরু করলেন । শুধু ধনরত্ন না, তাদেরকে ঘোড়াও দিতে হলো । যে এক হাজারি আমীর সে দেবে এক হাজার ঘোড়া । পাঁচ হাজারি

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

*সম্রাটের ভাই আসকারি মীর্জা বঙ্গ বিজয়ের পর সম্রাটের কাছে উপহার হিসেবে কয়েকজন হিজড়া চেয়েছিলেন ।

 

আমীর দেবে পাঁচ হাজার ঘোড়া । করদ রাজ্যের রাজাদের বাধ্যতামূলকভাবে সৈন্য এবং স্বর্ণমুদ্রা পাঠাতে হলো ।

যুদ্ধযাত্রার জন্যে একটা বরগা তাঁবু রওনা হয়ে গেছে । বরগা তাঁবুতে একসঙ্গে দশ হাজার মানুষ দাঁড়াতে পারে । এই তাঁবু খাটাতে এক হাজার তাঁবুর কারিগরকে সাত দিন খাটতে হয় ।

সম্রাটের জন্যে যাচ্ছে ডুরসানা-মঞ্জেল তাঁবু । এটি দোতলা ।উপরের তলায় সম্রাট নামাজ পড়বেন । নিচতলায় বেগমরা থাকবেন । সম্রাট রাতে ঘুমাবেন চৌবিলরৌতি তাঁবুতে । এই তাঁবুর চালের নিচে খসখসের সিলিং দেওয়া । নিচেও থাকে খসখস । খসখসের উপর কিংখাব ও মলমল । তাঁবু খাটাবার দড়ি রেশমের ।

সম্রাট হুমায়ূন আনন্দের সঙ্গে যুদ্ধপ্রস্ততি লক্ষ করতে লাগলেন । তাঁর আনন্দ কিছু বাধাগ্রস্ত হলো বৈরাম খাঁ’র কারণে । বৈরাম খাঁ বললেন, দিল্লী ত্যাগ করা মোটেই ঠিক হবে না । সম্রাট বললেন, সমস্যা কী ?

বৈরাম খাঁ বললেন, সমস্যা আপনার তিন ভাই । আপনার অনুপস্থিতিতে তারা দিল্লীর সিংহাসন দখলের চেষ্ঠা চালাবে ।

হুমায়ূন বললেন, আমি আমার ভাইদের নিজের প্রাণের মতোই ভালোবাসি । তারা তিনজনই আমার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করবে ।

তারা আপনার সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করবে না ।

তুমি আমার সঙ্গে বাজি রাখতে চাও ?

সম্রাটের সঙ্গে বাজি রাখার স্পর্ধা এই নফরের নেই ।

আমার এই তিন ভাইয়ের কারণেই কি তুমি যুদ্ধযাত্রা করতে চাচ্ছ

না, নাকি আরও কারণ আছে ?

বাংলা মুলুকে বর্ষা এসে যাবে । মোঘল সেনাবাহিনী বর্ষার সঙ্গে পরিচিত না ।

এখন পরিচয় হবে । আমিও পরিচিত হব । কলমচিকে খবর দাও, আমি তিনভাইকে পত্র লিখব । এখনই লিখব ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

সম্রাট পত্র লিখলেন । তিনজনকে আলাদা আলাদা চিঠি । মীর্জা কামরানকে লেখা চিঠির নমুনা-

আমার প্রাণপ্রিয় ভ্রাতা কামরান মীর্জা ।

আমার হৃদয়ের পাখি। বাগিচার সৌরভময় গোলাপ ।

প্রিয় ভ্রাতা,

বাংলা মুলুকের শের খাঁ নামের দুষ্টকে শায়েস্তা

করতে বিশাল মোঘল বাহিনী অতি শীঘ্র যাত্রা শুরু

করবে ।তুমি তোমার সৈন্যবাহিনী নিয়ে লাহোর

থেকে চলে এসো । বড়ভাইয়ের দক্ষিণ বাহু হও ।

আমার তিন ভাই পাশে থাকলে আমি বিশ্ব জয়

করতে পারি । যেমন করেছিলেন জুলকারলাইন ।*

আমার বহরের সঙ্গে তোমার অতি আদরের

ভগ্নি গুলবদন থাকবে । সে তোমার সাক্ষাতের জন্যে

আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছে । প্রিয় ভ্রাতা, তোমার

প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসাবে আমি একটি নীলা

এবং একটি পোখরাজ পাঠালাম । তুমি রত্ন দু’টিকে

প্রতিদিন দুগ্ধস্নান করাবে । এর অন্যথা হলে রত্নের

ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হবে । এখন তাৎক্ষণিকভাবে তোমার

উদ্দেশে রচিত পঞ্চপদী-

কামরান

চন্দ্র প্রস্ফুটিত তার দু’নয়ন ।

*আলেকজান্ডার দি গ্রেট

হৃদয় আর্দ্র আবেগে

যার কেন্দ্রে তার ভাই

মীর্জা হুমায়ূন ।

কামরান মীর্জা পত্রের জবাব দিলেন না । তাঁর দরবারের এক আমীরকে সম্রাটের কাছে পাঠালেন । আমীর সম্রাট হুমায়ূনকে জানালেন, পাঁচটি কারণে কামরান মীর্জা তাঁর সঙ্গে যেতে পারছেন না ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৮

১. তিনি অসুস্থ । পেটের পীড়ায় ভুগছেন ।

২. তাঁর প্রধান গণক গণনা করে পেয়েছে, যুদ্ধযাত্রায় তাঁর প্রাণনাশের সম্ভাবনা ।

৩. লাহোর অরক্ষিত রেখে রওনা হওয়ার অর্থ শত্রুর হাতে লাহোর তুলে দেওয়া ।

৪. স্বপ্নে তিনি তাঁর পিতা সম্রাট বাবরকে দেখেছেন । সম্রাট বাবর তাঁকে লাহোর ছেড়ে যেতে নিষেধ

করেছেন।

৫. তাঁর প্রিয় ঘোড়া লালী মারা গিয়েছে । তিনি ভালো ঘোড়ার সন্ধানে আছেন । শিক্ষিত এবং

ঘোড়া ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত হওয়া যায় না ।

সম্রাট হুমায়ূন আমীরকে বললেন, আমার ভাই কামরান মীর্জা আমার সঙ্গে না যাওয়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করেছে । একটি কারণই যথেষ্ট ছিল । পাঁচটি কারণের একটিতে সে আমার মহান পিতাকে টেনে এনেছে । তার প্রয়োজন ছিল না । আপনি আমার ভাইকে বলবেন, যা ঘটবে আল্লাহপাকের হুকুমেই ঘটবে । আমি কামরান মীর্জার জন্যে একটি শিক্ষিত আরবি ঘোড়া আপনার সঙ্গে দিয়ে দিচ্ছি । পেটের পীড়া একটি নোংরা ব্যাধি । আমি দ্রুত তার আরোগ্য কামনা করছি ।

সম্রাটের নির্দেশে আমীরকে একপ্রস্থ পোশাক, একটি রত্নখচিত তরবারি, দশটা আশরাফি দেওয়া হলো । ভাইয়ের পাঠানো দূতের প্রতি সম্মান দেখানো হলো । এই আমীরের নাম মীর হামজা ।

মীর হামজা লাহোরে ফিরছেন । তাঁর সঙ্গে বিশজন অশ্বারোহীর একটি ক্ষুদ্র দল । রসদ বহনকারী একটা ঘোড়ার গাড়ি । এই গাড়ির সঙ্গেই কামরান মীর্জাকে দেওয়া সম্রাট হুমায়ূনের আরবি ঘোড়া বাঁধা । ঘোড়ার রঙ সাদা । তার নাম ফাতিন । ফাতিন শব্দের অর্থ সুন্দর ।

বিশ ক্রোশ অতিক্রম করার পর মীর হামজাকে থামতে হলো । অশ্বারোহী বিশাল বাহিনী নিয়ে বৈরাম খাঁ দাঁড়িয়ে আছেন । বৈরাম খাঁ বললেন, সম্মানিত আমীর মীর হামজা! আপনার সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলার জন্যে দাঁড়িয়ে আছি ।

 

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৯

Related Posts

Leave A Comment