আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

ট্রাভেল এজেন্টের রােবট গলার মেয়েটি বলল, আগামী পনের দিন বুকিং পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেইসামারে ইউরােপ যাবার টিকিট কনফার্ম করা কঠিনদলবেঁধে টুরিস্টরা যাচ্ছেতবে তােমাকে আমি ওয়েটিং লিস্টে রেখে দিচ্ছিকিছু পাওয়া গেলে জানাব। 

আয়নাঘর

অনেকদিন পর লিলিয়ান একা একা ঘুমুতে গেলএবং আশ্চর্য অনেকদিন পর ভয়ংকর স্বপ্নটা সে আবার দেখলএবারের স্বপ্ন আরাে স্পষ্টযেন স্বপ্ন না পুরাে ব্যাপারটা বাস্তবে ঘটে যাচ্ছেসে দেখল বিশাল প্রাচীন শ্যাওলা পরা এক 

অট্টালিকাসে সিড়ি বেয়ে উঠছেলােহার প্যাচানাে সিড়িসে উঠেই যাচ্ছে উঠেই যাচ্ছেসিড়ি শেষ হচ্ছে নাহঠাৎ সিঁড়ি শেষ নিচে নামতে চেষ্টা করল। কি আশ্চর্য নিচে নামারও ব্যবস্থা নেইসে এখন কি করবে? তাহেরের কথা শােনা যাচ্ছেসে অনেক দূর থেকে ডাকছেতার গলার স্বর ক্ষীণপ্রায় অস্পষ্ট। 

লিলিয়ান ! লিলিয়ানতুমি কোথায় ? আমি এখানে। 

তুমি আমাকে বাঁচাওআমি ভয়ংকর বিপদে পড়েছিওরা আমাকে মেরে ফেলতে চাইছেতুমি বাঁচাও আমাকে। 

আমি নামতে পারছি নাআমি আটকা পড়ে গেছি। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

আমাকে বাঁচাওলিলিয়ান আমাকে বাঁচাওআমি আটকা পড়ে গেছি

সিড়ি দুলছেপ্রচণ্ড শব্দে দুলছেদুলুনিতে লােহার রেলিং খুলে আসছেঅনেক দূর থেকে তাহেরের অস্পষ্ট স্বর কানে আসছেখুব বাতাস দিচ্ছেবাতাসেরকারণে কিছু শােনা যাচ্ছে না| লিলিয়ান জেগে উঠলঘড়িতে একটা দশ বাজেলিলিয়ান বাকি রাতটা বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে কাটাল। 

ডঃ ভারমান চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছেনলিলিয়ানের মনে হল তিনি হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করছেনযে কোন মুহূর্তে হেসে ফেলবেনহাসবেন তাহেরের মত শব্দ করেলিলিয়ান খুব লজ্জায় পড়বেসে রকম কিছু হল নাডঃ ভারগান হাসলেন নাচোখ থেকে চশমা খুলে ফেলে কাচ পরিষ্কার করতে করতে বললেন

তুমি আবার দুঃস্বপ্ন দেখেছ

মাঝে মাঝে দুঃস্বপ্ন দেখা তাে খুব স্বাভাবিক লিলিয়ানআমরা সুন্দর স্বপ্ন যেমন দেখি দুঃস্বপ্নও দেখি। 

ডঃ ভারমান, আমি তা জানিকিন্তু আমার স্বপ্ন অন্য রকমঅন্য রকম বলতে কি বােঝাচ্ছ?” 

আপনাকে ব্যাখ্যা করতে পারব নাতবে আমার মনে হয় স্বপ্নে কেউ আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে। 

তুমি ঠিকই ধরেছস্বপ্নে কেউ তােমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে এটা ঠিকঅবশ্যই বলার চেষ্টা করছেসেই কেউ টা হচ্ছে তুমি নিজেতােমার নিজের সাবকনশাস মাইন্ড তােমার কনশাস মাইন্ডকে তথ্য দিতে চাইছে। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

ডক্টর! তা কিন্তু নাতাহেরের মহা বিপদ সম্পর্কে আমাকে কেউ একজন সাবধান করছে। 

ডঃ ভারমান এবার হাসলেন, তবে শব্দ করে নানিঃশব্দেশিশুদের প্রবােধ দেয়ার জন্যে বড়রা যেমন হাসে তেমন হাসি। 

শােন লিলিয়ান, ছেলেটা সম্পর্কে তােমার নিজের মধ্যেই এক ধরনের ভয় আছেসেই ভয় হচ্ছে ছেলেটিকে হারানাের ভয়এই ভয়ের উৎপত্তি হল ভালবাসায়কাউকে গভীরভাবে ভালবাসলেই এই ভয় তৈরি হয়মনে হয় এক সময় ভালবাসার মানুষ আমাকে ছেড়ে চলে যাবেতখন আমার কি হবে? অবচেতন মনে ধীরে ধীরে ভয় জমা হতে থাকে ... তােমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে

আপনাকে আমি বােঝাতে পারছি না আমি স্বপ্নে তাহেরদের প্রাচীন বসতবাড়ি স্পষ্ট দেখেছিআমি সে বাড়ির লােহার সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলাম‘ 

তুমি তােমার কল্পনার একটি বাড়ির লােহার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলে। 

ডঃ ভারমান আমি কিন্তু নিশ্চিত জানি একদিন বাড়িতে আমরা যাব – 

তাহের ভয়ংকর বিপদে পড়বে। 

যদি জান তাহলে বাড়িতে যেও নাআমাদের যেতেই হবেএটা হচ্ছে নিয়তিযা ঘটবার তা ঘটবেই। 

লিলিয়ান তুমি তােমার নিজের যুক্তিতে আটকা পড়ে যাচ্ছ যা ঘটবার তা যদি ঘটে তাহলে তােমাকে স্বপ্নে সাবধান করার প্রয়ােজন কি ?” 

আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

লিলিয়ান চুপ করে রইলডঃ ভারমান শান্ত গলায় বললেন, তুচ্ছ জিনিস নিয়ে এত ভেব নাতুচ্ছ জিনিসকে তুচ্ছ করতে শেখ। 

লিলিয়ান উঠে দাঁড়ালক্লান্ত গলায় বলল, আমি ওদের বাড়ি স্বপ্নে সত্যি দেখেছিদেখামাত্র চিনতে পারবলােহার প্যাচানাে সিঁড়ি ..

লিলিয়ান আমি তােমাকে ঘুমের অষুধ দিচ্ছিরাতে ঘুমুতে যাবার এক ঘন্টা আগে দুটা ট্যাবলেট খাবেমনে থাকবে

থাকবে। 

ডক্টর ভারমান নিশ্চয় খুব কড়া ঘুমের অষুধ দিয়েছেনঅষুধ খাবার পরপর লিলিয়ানের মনে হল সে তলিয়ে যেতে শুরু করেছেকোন গভীর খাদে পড়ে গেছে নিচে নেমে যাচ্ছেঅতি দ্রুত নেমে যাচ্ছেখাদটা অন্ধকার এবং শীতললিলিয়ানের ভয় ভয় করতে লাগলমনে হয় এই ঘুম তার আর ভাঙবে নাকেউ ভাঙতে পারবে নাসে বিরাট এই বাড়িতে মরে পড়ে থাকবেকেউ জানবেও না। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

ক্রিং ক্রিং ক্রিং

কিসের শব্দ? টেলিফোন না কেউ এসে কলিং বেল টিপছে

নাকি গীর্জার ঘন্টার শব্দতাদের বাড়ির কাছেই ক্যাথােলিক চার্চওরা মাঝে মাঝে ঘন্টা বাজায় ! কেউ মারা গেলে ঘন্টা বাজায়কে মারা গেছে ? তাহের ? তাহেরের কি কিছু হয়েছে? প্লেন দুর্ঘটনার খবর তাে কেউ দেয় নিটিভি খােলা আছেপ্রেন দুর্ঘটনা হলে বলতপ্লেন দুর্ঘটনার খবর টিভি খুব ফলাও করে প্রচার করেট্রেন বা বাস দুর্ঘটনার খবর কোন পাত্তা পায় নাএর কারণ কি

ক্রিং ক্রিং ক্রিংলিলিয়ান টেলিফোন তুলে ক্লান্ত গলায় বলল, হ্যালো! ওপাশ থেকে তাহেরের গলা পাওয়া গেলহ্যালাে লিলিয়ান আমি

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *