বড় ধরনের কোন পুণ্যকর্ম ছাড়া – এমন একজনকে স্বামী হিসেবে, বন্ধু হিসেবে পাওয়া যায় না। লিলিয়ান একা একা কিছুক্ষণ কাঁদল। তারপর চেষ্টা করল তাহেরের ঘুম ভাঙাতে পারল না। তাহেরের ঘুম ভাঙান সত্যি সত্যি অসম্ভব ব্যাপার।

লিলিয়ানের খুব ইচ্ছা করছিল তাহেরের ঘুম ভাঙিয়ে তাকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে যায়। গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় হাত ধরাধরি করে হাঁটতে হাঁটতে সে তাহেরকে বলে – আমি তােমাকে ভালবাসি। তােমার জন্যে আলাদা করে রাখা এই ভালবাসা কখনো নষ্ট হবে না। কখনাে না।।
বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তাহের ফিফথ এভিন্যুতে নতুন বাড়ি নিল। বিশাল ডুপলেক্স। একতলায় খাবার ঘর, বসার ঘর, লাইব্রেরী কাম স্টাডি রুম এবং একটা গেস্ট রুম। দোতলায় চারটা শােবার ঘর। এত বড় বাড়ির তাদের কোনই প্রয়ােজন নেই। কিন্তু তাহের ছােট বাড়ি নেবে না। ছােট বাড়িতে তার নাকি দম বন্ধ হয়ে আসে। ছোট বাড়ি নেবার কথা বলতেই তাহের হাসতে হাসতে বলল – আমার পূর্ব পুরুষরা খুব বড় বড় বাড়িতে থাকতেন, বুঝলেন বিদেশিনী। কাজেই আমিও বড় বাড়িতে থাকব। বেতন যা পাই সেখান থেকে টাকা আলাদা করে রাখব। বছর পনের পর সেই টাকায় দশ একর জায়গা নিয়ে এমন বাড়ি বানাবাে যে তােমার আক্কেলগুড়ুম হয়ে যাবে।
আয়নাঘর-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তার হিসেবে তাহের যা পায় তা তার জন্যে যথেষ্ট — জমানাে দূরে থাকুক মাসের শেষে সে শেষ কোয়ার্টারটিও খরচ করে শুকনাে মুখে লিলিয়ানকে বলে – লিলি ! তােমার কাছে কি গােটা বিশেক ডলার হবে? তখন তাহেরের শুকনাে মুখের দিকে তাকিয়ে লিলিয়ানের চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছা করে I love you, I love you, সে অবশ্যি চেঁচিয়ে বলে না। মনে মনে বলে যেন তাহের কখনাে ধরতে না পারে। যেমন ধরা যাক, তাহের কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে যখন
বলে – বাহ তুমি তাে একসেলেন্ট কাপাচিনাে কফি বানাতে শিখে গেছ? এস আমরা একটা কফি শপ চালু করি। কফি শপের নাম হবে – লিলিয়ান’স কাপাচিনাে। তখন লিলিয়ান মনে মনে বলে “I love you, I love you. ঈশ্বর। মানুষকে প্রচুর ক্ষমতা দিয়েছেন, মনের কথা বুঝবার ক্ষমতা দেন নি। যদি দিতেন তাহলে তাহের বুঝতে পারত কি গাঢ় ভালবাসায় লিলিয়ান এই মানুষটাকে ঘিরে রেখেছে।
তাহের অনেক রাত জেগে পড়াশােনা করে। এই সময়টা লিলিয়ান তাকে বিরক্ত করে না। বারান্দায় রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে ভাবে – ঈশ্বর আমাকে এত সুখী কেন করলেন ? এর একশ’ ভাগের এক ভাগ সুখী হলেও তাে আমার
আয়নাঘর-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
জীবনটা সুন্দর চলে যেত। ভালবাসা ব্যাপারটা কি লিলিয়ান বুঝতে চেষ্টা করে। বুঝতে পারে না। তার ধারণা ভালবাসা নামের ব্যাপারটায় শরীরের স্থান খুব অল্প। নেই বললেই হয়। আবার কখনাে কখনাে সম্পূর্ণ উল্টো কথা মনে হয়। মনে হয় ভালবাসায় শরীর অনেকখানি। অনেকখানি না হলে কেন তার সারাক্ষণ এই মানুষটাকে ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছা করবে? মন ছোঁয়া সম্ভব নয় বলেই কি শরীর ছোঁয়ার এই আকুলতা?
আচ্ছা তার যেমন সারাক্ষণ মানুষটাকে ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করে ঐ মানুষটারও কি তাই করে? সরাসরি জিজ্ঞেস করতে লজ্জা করে, লিলিয়ান ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করেছে – তাহের প্রশ্নটা ধরতে পারে নি। যেমন লিলিয়ান একদিন জিজ্ঞেস করল, শােন তাহের আমরা যখন বাগানে হাঁটি – অর্থাৎ পাশাপাশি আমরা হাঁটছি। তখন তােমার কোন দিকে হাঁটতে ভাল লাগে? অর্থাৎ আমার পাশাপাশি হাঁটতে ভাল লাগে, না আমার আগে আগে, না পেছনে পেছনে ?
তাহের গম্ভীর হয়ে বলেছে – মাই ডিয়ার বিদেশিনী! আমার বাগানে হাঁটতেই ভাল লাগে না। আমার ভেতর বাগান ভীতি আছে। আমাদের গ্রামের বাড়ির চারপাশে বাগান। ঐ বাগানে একবার আমাকে সাপে তাড়া করেছিল। সেই থেকে বাগান ভীতি।
আয়নাঘর-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
‘আচ্ছা ধর, বাগানে না রাস্তায় হাঁটছি তখন?”
‘মাই ডিয়ার বিদেশিনী! রাস্তায় হাঁটতেও আমার ভাল লাগে না। আমেরিকার রাস্তাগুলি হাঁটার জন্যে নয়, গাড়ি নিয়ে চলার জন্যে।
লিলিয়ান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেছে, তুমি সব সময় আমাকে বিদেশিনী বল কেন?
‘তুমি বিদেশী মেয়ে এই জন্যেই বিদেশিনী বলি।
‘বিদেশী মেয়ে বলে কি তােমার মনে কোন ক্ষোভ আছে?” ‘বিন্দুমাত্র ক্ষোভ নেই। ‘খুব অস্পষ্টভাবে হয়ত আছে। এত অস্পষ্ট যে তুমি নিজেও জান না। ‘যদি থাকে তুমি কি করবে?” ‘তােমার সেই ক্ষোভ, সেই হতাশা দূর করার চেষ্টা করব। ‘কিভাবে করবে ? ‘প্রথমে আমি তােমার ভাষা শিখব। ‘বাংলা ভাষা শিখবে?” ‘হ্যা।
‘নিতান্তই অসম্ভব ব্যাপার। বাংলা ভাষা হচ্ছে পৃথিবীর কঠিন ভাষাগুলির চেয়েও কঠিন। হিব্রু বাংলা ভাষার তুলনায় শিশু।
“কেন বাজে কথা বলছ ?
‘মােটেও বাজে কথা বলছি না। ইংরেজী ‘s‘ অক্ষরের ধ্বনির কাছাকাছি আমাদের তিনটা অক্ষর আছে শ, স, ষ। আবার ‘z‘ অক্ষরের কাছাকাছি আছে তিনটা অক্ষর – জ, য, ঝ।
‘এ রকম সব ভাষাতেই আছে।
‘আমাদের আরাে অদ্ভুত ব্যাপার – স্যাপার আছে। যেমন ধর – আমার শীত লাগে, এর এক রকম মানে, আবার আমার শীত শীত লাগে – এর অন্য রকম মানে। শীত শব্দ দু‘বার ব্যবহার করা মাত্র অর্থ বদলে গেল। সে দারুণ কঠিন ব্যাপার।
‘কঠিন ব্যাপার হলে তুমি আমাকে সাহায্য কর।
আয়নাঘর-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
‘পাগল হয়েছ ? আমি নিজেই বাংলা জানি না তােমাকে সাহায্য করব কি? মেট্রিকে বাংলা ফার্স্ট পেপারে ৩৬ পেয়েছিলাম। কানের পাশ দিয়ে গুলি গিয়েছে।
‘তার মানে তুমি আমাকে সাহায্য করবে না?
‘না।‘ “না কেন?” ‘আমি তার প্রয়ােজন দেখছি না।
‘আমি দেখছি। তুমি যে ভাষায় কথা বল, আমি সেই ভাষা জানব না তা হতেই পারে না। আমি তােমাকে ভালবাসি, কাজেই আমি তােমার ভাষায় কথা বলতে চাই।
‘আমিও তােমাকে ভালবাসি, তার মানে এই না যে রাত জেগে আমাকে তােমার গ্রীক ভাষায় কথা বলতে হবে।
‘আমার ভাষা কিন্তু গ্রীক না। ‘সব বিদেশী ভাষাই আল্লার কাছে গ্রীক ভাষা।
‘আমি তাে তােমাকে আমার ভাষা শিখতে বলছি না। আমি শুধু বলছি তােমার ভাষা শেখার ব্যাপারে তুমি আমাকে সাহায্য কর।”
‘ফাইন, সাহায্য করব! ভাষা শেখা ছাড়া আর কি কি জিনিস শিখতে চাও? একবারে বলে ফেল।
‘আমি তােমাদের দেশের রান্না শিখতে চাই। ‘আর কি?” | ‘তােমাদের দেশের রীতি–নীতি, আদব–কায়দা। ভাসাভাসা শেখা নয়। খুব ভালমত শেখা যেন তুমি কোনদিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে না বল – কেন যে বিদেশী একটা মেয়ে বিয়ে করলাম।
তাহের হাসতে হাসতে বলল, তুমি চেষ্টা করছ পুরােপুরি একটা বাঙালি মেয়ে হয়ে যেতে?
খুব কি কঠিন?’. ‘ভয়ংকর কঠিন।
‘মােটেই কঠিন না। আমি ঠিক করেছি বাংলাটা পুরােপুরি শেখা হয়ে গেলে আমি তােমাকে নিয়ে তােমার দেশে যাব। বাঙালি মেয়ে হবার মূল ট্রেনিং আমি দেশে গিয়ে নেব।
আয়নাঘর-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ
‘পাগল হয়েছ। দেশে যাবার কথা আমি চিন্তাও করি না। “কেন চিন্তা কর না?” ‘দেশে আমার কেউ নেই।
‘তােমার বাবা–মা মারা গেছেন তা জানি, তাই বলে আর কেউ থাকবে না, তা কি করে হয় ?
‘আমার বাবা–মা নেই, আমার কোন ভাই–বােনও নেই। একটাই বােন ছিল। ছােটবেলায় মেনিনজাইটিসে মারা গেছে।
‘বাড়িঘর তাে আছে, না তাও নেই?”
একটা বাড়ি আছে তাও গ্রামের দিকে। শহরে কোন বাড়িঘর নেই। ‘গ্রামের বাড়িতে কে থাকে?
‘কেউ থাকে না। তালাবন্ধ থাকে। দরজা-জানালা কিছু কিছু চুরি করে নিয়ে গেছে, তবে খুব বেশি নিতে পারে নি। বাড়ির সঙ্গে বিরাট আম কাঁঠালের বাগান আছে। আমার এক দূর সম্পর্কের চাচা সেই বাগান দেখাশােনা করেন। বাগানের আয় তিনিই ভােগ করেন। তাঁকে আমি মাঝে মাঝে কিছু ডলার পাঠাই যাতে তিনি
বাড়িটা দেখেশুনে রাখেন।
Read more
