কিছু শৈশব-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

তার জন্যে সাগু কিনে আনতে হবেকিন্তু ছেলের বাবা কবিতার খাতা নিয়ে বসেছেনগভীর ভাবাবেগে তাঁর চোখে জললিখছেন একদা জ্যোৎস্নায় নামের দীর্ঘ কোনাে রচনা

কিছু শৈশব

কেন কিছু কিছু মানুষ এমন নিশিপাওয়া হয় ? দুঃখ কষ্ট, হতাশাবঞ্চনা কিছুই তাদের স্পর্শ করে নাস্বর্গীয় কোনাে একটি হিংস্র পশু তাদের তাড়া করে ফিরে কেন করে ? আমার উত্তর জানা নেইজানতে ইচ্ছে হয়। 

এইসব নিশিপাওয়া মানুষদের বেশিরভাগই নিজের ক্ষুদ্র পরিবার এবং কয়েকজন ভালােমানুষ বন্ধুবান্ধব ছাড়া আর কারাে কাছে তাদের আবেগের কথা পৌছাতে পারেন নাকৃপণ ঈশ্বর এদেরকে আবেগে উদ্বেলিত হবার মতাে অপূর্ব একটি হৃদয় দিয়ে পাঠান, কিন্তু সেই আবেগকে প্রবাহিত করবার মতাে ক্ষমতা দেন নাএরা বড় দুঃখী মানুষ। 

রিক্তশ্রী পৃথিবীপাতা উল্টাতে উল্টাতে আমার এমন কষ্ট হলােকবি কত বিচিত্র বিষয় নিয়ে কত আজেবাজে জিনিসই না লিখেছেনইরানের শাহকে নিয়ে পর্যন্ত একটা কবিতা আছেকী আছে এই স্বৈরাচারী রাজার মধ্যে যে তাকে নিয়ে পর্যন্ত একটা কবিতা লিখতে হলাে? তিনটি কবিতা আছে মহাসাগর নিয়েকবি কিন্তু সাগরমহাসাগর কিছুই দেখেন নি(সমুদ্র দেখিবার সৌভাগ্য আমার হয় নাইতবে বহুবার আমি মনশ্চক্ষে সমুদ্র দেখিয়াছিফুটনােট, হে মহাসিন্ধু

কিছু শৈশব-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

কবিতা আমি পড়ি নাকিন্তু ‘রিক্তশ্রী পৃথিবীর প্রতিটি কবিতা আগ্রহ নিয়ে পড়লামকিছুই নেইকষ্টে সঞ্চিত শেষ মুদ্রাটিও নিশ্চয়ই চলে গেছে এই বইয়েবাকি জীবন এই পরিবারটি অবিক্রিত গ্রন্থটির প্রতিটি কপি গভীর আগ্রহে আগলে রাখবেপ্রাণে ধরে সের দরে বিক্রি করতে পারবে নাবইয়ের স্কুপের দিকে তাকিয়ে স্ত্রী মাঝে মাঝে গােপনে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলবেন। কিন্তু তাতে কী আছে ? অন্তত একটি দিনের জন্যে হলেও তাে এই পরিবারটিতে আনন্দ এসেছিলকবিস্ত্রী মুগ্ধচোখে স্বামীর দিকে তাকিয়ে ভেবেছিলেন, আমার স্বামী তাহলে সত্যি সত্যি একটি বই লিখে ফেলেছেন ? ছেলেমেয়েরা বাবার বই নিয়ে ছুটে গেছে বন্ধুবান্ধবদের দেখাতে। 

বাবা প্রথমবারের মতাে বুক উঁচু করে তাঁর বড় সাহেবের ঘরে ঢুকে বলেছেন, স্যার, আপনার জন্যে একটা বই আনলামবড় সাহেব অবাক হয়ে বললেন, আরে আপনি আবার বই লিখলেন কবে

স্যার, প্রচ্ছদটা আমার মেয়ের আঁকাতাই নাকি? বাহ্ চমৎকার

রিক্তশ্রী পৃথিবীর শেষ কবিতাটি সম্পর্কে বলিশেষ কবিতাটির নাম মাগােকবিতাটি নূরুন্নাহার খানমকে নিয়ে লেখা। ফুটনােট থেকে জানতে পারি, মৃত্যুর আগের রাতে সে যখন রােগযন্ত্রণায় ছটফট করছিল তখন তার অসহায় বাবা এই কবিতাটি লিখে এনেছিলেন মেয়েকে কিঞ্চিৎ উপশমদেবার জন্যে কবিতাটি ক্ষুদ্র এবং রচনাভঙ্গি অন্য কবিতার মতােই কাঁচা কিন্তু প্রতিটি শব্দ চোখের গহীন জলে লেখা বলেই বােধকরি কবিতাটি দুঃখী বাবার মতােই হাহাকার করে উঠেসেই হাহাকার বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ছাড়িয়ে চলে যায় অদেখা সবভুবনের দিকে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

একটিমাত্র কবিতা লিখেও কেউ কেউ কবি হতে পারেনঅল্প কিছু পর্ভূক্তিমালাতেও ধরা দিতে পারে কোনাে এক মহান বােধ, মহান আনন্দ, জগতের গভীরতম ক্রন্দনসেই অর্থে আমাদের রিক্তশ্রীকবি একজন কবি। 

আমার বাবা বড় মাপের শিক্ষক ছিলেনকাউকে কিছুই বুঝতে না দিয়ে তিনি আমাদের জীবনের গভীরতম বােধের শিক্ষা দিতে পেরেছিলেনজীবনের জটিলতা আমরা তাঁর কাছে শিখি নিশিখেছি জীবনের সারল্যএই শিক্ষা কঠিন শিক্ষা। 

বাবার মৃত্যুর পর তাঁর এক কলিগ আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাবর রােডের বাসায় এলেনআগমনের উদ্দেশ্য সমবেদনা জানানােতিনি আমাকে তার পাশে বসিয়ে বললেন, বাবা ফুল তাে চেনচেন না ? ফুল, পুষ্পযে কোনাে ফুল। 

আমি চুপ করে রইলাম। 

তিনি বললেন, তােমার বাবা ছিলেন খুব সুন্দর একটা ফুলএই কথাটা সারাজীবন মনে রাখবেআর কিছু মনে রাখার প্রয়ােজন নাই। 

মা আবেগে অভিভূত হয়ে বললেন, আপনি উনার জন্যে দোয়া করবেন । 

দ্রলােক বললেন, ফয়জুর রহমানের জন্যে কারাে দোয়ারই প্রয়ােজন নাই। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

শুরুতে একবার লিখেছিলাম, পরম করুণাময় আমার বাবার প্রতি তেমন করুণা করেন নিএখন মনে হচ্ছে ভুল লিখেছি, পরম করুণাময় বিশেষ করুণা করেছেন বলেই না তাকে ফুলের সঙ্গে তুলনা করা হয়কেউ একজন বলতে পারেফয়জুর রহমানের জন্যে কারাে দোয়ার প্রয়ােজন নাই। 

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 

সনতারিখ বলতে পারব না, শৈশবে বড় ধরনের একটি নির্বাচনের স্মৃতি মনে আছেমনে হয় যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনমিছিল স্লোগানে উত্তেজিত মীরাবাজার আমি বিশেষভাবে উত্তেজিত সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণেনির্বাচন উপলক্ষে মীরাবাজারের দোকানঘরগুলির একটি যুক্তফ্রন্টের অফিসঅফিস ভর্তি নির্বাচনী কার্টুনযিনি কার্টুন আঁকেন তার চেহারা অবিকল রবীন্দ্রনাথের মতােআমার প্রধান কাজ অফিসের আশেপাশে ঘােরাঘুরি করালােকজন কম থাকলে অফিসে ঢুকে পড়ানতুন কী কার্টুন আঁকা হলাে সেসব দেখাএবং কার্টুন শিল্পী রবীন্দ্রনাথের ধমক খাওয়াউনি আমাকে দেখলেই রেগে গিয়ে বলতেন, যা বললাম, থাপ্পড় খাবি। 

কার্টুন শিল্পী আমাকে ধমকাতে ধমকাতে একসময় বিরক্ত হয়েই ধমক দেয়া বন্ধ করলেনআমি অফিসে ঘুরঘুর করলেও কিছু বলেন নাতাঁর ঘাড়ের উপর উঁকি দিয়ে ছবি আঁকা দেখলেও কিছু বলেন নাবড়ই আশ্চর্যের কথা, ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে দুএকটা কথাও বলেন। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(৯)-হুমায়ূন আহমেদ

খােকা, বড় হলে কী হবে

ব্যারিস্টার(ব্যারিস্টার হবার কোনাে ইচ্ছা কখনােই আমার ছিল নাব্যারিস্টার জিনিসটা কী তাও জানতাম নাবড় হয়ে আমার আইসক্রিমওয়ালা হবার ইচ্ছাসবাইকে তাই বলতামব্যারিস্টারের বিষয়টা বড়মামা আমার মাথায় ঢুকিয়েছেনবলে দিয়েছেন বড় হয়ে কী হবে ? কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে ব্যারিস্টার হব কিংবা এরােপ্লেন পাইলট হব কখনাে বলবে নাআইসক্রিমওয়ালা হব আমি বড়মামার কথা মতাে কখনাে বলি ব্যারিস্টার কখনাে বা এরােপ্লেন পাইলট

ছবি আঁকতে পার

শিখবে ? 

আচ্ছা ঠিক আছেব্যবস্থা হবে। 

একদিন ব্যবস্থা হলােতিনি নীল একটা পেন্সিল আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ছবি আঁকআমাদের সময় লাল নীল পেন্সিল বলে একটা জিনিস ছিলমােটা পেন্সিল, অর্ধেকটার গাঢ় লাল শিষ বাকি অর্ধেক গাঢ় নীল । 

বড় একটা গােল্লা আঁক। 

আমি আঁকলামগােল্লার ভেতর দুটা ছােট গােল্লা আঁকছােট গােল্লা আঁকলাম। 

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *