মৃন্ময়ী-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

এখনাে যায় নি, মানে কী ? ছয়টার সময় এসেছে, এখন বাজে আটটা। বাড়িতে গিয়ে এশার নামাজ পড়বে না? মানুষ এমন বেআক্কেল হয় কীভাবে? আর কতক্ষণ থাকবে? আরাে ঘন্টা দুই থাকবেন। তুমি দেখা করে এসাে না। আমি কেন দেখা করব? 

দেখা করলেই উপহার পাবে । উনি সবার জন্যে উপহার নিয়ে এসেছেন। আমার জন্যে এনেছেন আকিক পাথরের তসবি । আরবের মিষ্টি তেতুল। তাের বাবার জন্যে কী এনেছে ? 

বাবার জন্যে খুব ইন্টারেস্টিং জিনিস এনেছেন। তুমি কল্পনাও করতে পারবে না এমন জিনিস। বাবা যা খুশি হয়েছেন! আনন্দে ঝলমল করছেন। উপহার কোলে নিয়ে বসে আছেন। আর দাঁত বের করে হাসছেন।  

মা উত্তেজিত গলায় বললেন, কার্পেট না-কি ? ওখানে খুব ভালাে পারশিয়ান কার্পেট পাওয়া যায়। আমার বান্ধবী রীতা হজ করতে গিয়ে একটা বেড সাইড কার্পেট এনেছিল। কী যে সুন্দর । (উপহার, গিফট এই জাতীয় শব্দগুলি শুনলেই মা কেমন যেন উত্তেজিত হয়ে পড়েন।) আমি বললাম, কার্পেট না। অন্য কিছু। সেটা কী ? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

পাঁচটা প্রশ্ন করে বের করে নাও— হিন্টস দিচ্ছি। এটি একটি পরিধেয় বস্ত্র তবে যে পরিধান করে সে এই বস্ত্র চোখে দেখতে পারে না। ……………………….এত কথা পেঁচাচ্ছিস কেন? জিনিসটা কী বল ? 

জিনিসটা দেখে তােমার চোখ যদি কপালে না উঠে যায় তাহলে আমি ফাস্ট ক্লাস মেজিস্ট্রেটের কাছে এফিডেভিট করিয়ে আমার নাম বদলে ফেলব। মৃন্ময়ীর বদলে নাম হবে ঘৃন্ময়ী। আমার ডাক নাম তখন মৃ থাকবে না, ডাকনাম হবে ঘৃ। 

এত কথা বলিস না তাে। ……………..মা কৌতুহল সামলাতে পারছেন না – বসার ঘরের দিকে রওনা হলেন। আমি বললাম, সদ্য হজফেরত মানুষের কাছে যাচ্ছ— স্লীভলেস ব্লাউজ পরে যাওয়া কি ঠিক হবে ? 

মা রাগী গলায় বললেন, পাগলের মতাে কথা বলছিস কেন? এটা স্লীভলেস ব্লাউজ ? …………হাতা বেশি ছােট তাে, এইজন্যেই বললাম। ………………….তাের বাবার সঙ্গে তাে তুই এত ফাজলামি করিস না। আমার সঙ্গে কেন করিস? আমি তাের বান্ধবীও না, বয়ফ্রেন্ডও না । 

আমি মিষ্টি করে হাসলাম। কেউ যখন হাসে সে বুঝতে পারে না তার হাসি কেমন হচ্ছে। আমি বুঝতে পারি। কারণ আমি আমার সব হাসি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দিনের পর দিন দেখেছি। এখনাে সময় পেলে দেখি। কোন হাসিতে আমাকে কেমন দেখায়, তা আমি জানি। আমি মােটামুটি পাঁচ ক্যাটাগরীর হাসি রপ্ত করেছি। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

১. Non commital হাসি। এই হাসিতে কিছুই বােঝা যাবে না। ২. দুঃখময় হাসি। মন কষ্টে ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে হাসি। ৩. বিরক্ত হাসি। অন্যের বােকামি দেখে বিরক্তির হাসি।৪. আনন্দের হাসি। এই হাসি খুব সাধারণ। কোনাে বিশেষত্ব নেই। ৫. মােনালিসা হাসি। বিশেষ কারাের জন্যে। মা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তস্তুরী বেগম বলল, আফা কতবেলের ভর্তা খাইবেন ? 

আমি বললাম, না। দিন দশেক আগে একবার কতবেলের ভর্তা খেয়ে বলেছিলাম, বাহ্ খেতে চমৎকার তাে! এরপর থেকে রােজই সে দু’তিনবার জিজ্ঞেস করে, আফা কতবেলের ভর্তা খাইবেন? 

তরী বেগম আজ রাতের খাবার কী ? ………..ইলিশ মাছের ডিমের ভাজি। ইলিশ মাছ আর পটলের তরকারি। ইলিশ মাছের মাথা আর কাটাকুটা দিয়া লাউ। 

ইলিশে ইলিশে দেখি ধূল পরিমাণ। ইলিশের একই অঙ্গে এত রূপ? সজনে। দিয়ে ছােট মাছের কোনাে তরকারি রান্না হয় নি ? …………….জে না। রান্না করা যাবে না ? ফিরিজে ছােট মাছ আছে, কিন্তুক সইজনা নাই। …..সজনে আনিয়ে দেবার ব্যবস্থা করছি। তুমি অতি দ্রুত ছােট মাছের তরকারি রান্নার ব্যবস্থা কর। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

জে আচ্ছা। ……………তােমার জন্যে একটা উপহার আছে। আকিক পাথরের তসবি। মক্কা শরীফের জিনিস— এই নাও। …………এখন নিতে পারব না আফা, অজু নাই। টেবিলের ওপর রেখে দিচ্ছি, অজু করে এসে এক সময় নিয়ে যেও। 

তন্তুরী বেগম আনন্দিত মুখে ঘাড় কাত করল। আমার পরিচিত খুব কম মানুষকেই আমি পছন্দ করি— তন্তুরী বেগম সেই অতি অল্প সংখ্যক মানুষের একজন। তার মধ্যে মাতৃভাব অত্যন্ত প্রবল। সে যখন আমার সঙ্গে কথা বলে তখন মনে হয় মা তার ছােট মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। মেয়ের প্রতিটি আব্দার শুনে মজা পাচ্ছে। আবার কস্তুরী বেগম যখন আমার মার সঙ্গে কথা বলে তখন মনে হয় সে তার রাগী বড় মেয়ের সঙ্গে কথা বলছে। বড় মেয়ে অন্যায়ভাবে কথা বলছে তা সে বুঝতে পারছে। বুঝতে পারলেও কী আর করা— হাজার হলেও মেয়ে। 

সজনে ডাটার কী ব্যবস্থা করা যায় অতি দ্রুত ভাবার চেষ্টা করছি। ভাইয়া বাসায় থাকলে কোনাে সমস্যা নেই— যেখান থেকে হােক সে সজনে ডাটা জোগাড় করবে। কাঁচাবাজার বন্ধ থাকলে কোনাে সজনে গাছের খোজ বের করে, গাছ থেকে পেড়ে আনবে। | মুশকিল হলাে— এই সময়ে ভাইয়ার বাসায় থাকার কোনােই কারণ নেই। রাত বাজে মাত্র আটটা। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৩)-হুমায়ূন আহমেদ

ভাইয়া এখন কী একটা কম্পিউটার কোর্স নিচ্ছে। বাংলাদেশ একেক সময় একেক দিকে ঝুঁকে পড়ে। এখন ঝুঁকেছে ইউনিভার্সিটি এবং কম্পিউটারের দিকে। পাড়ায় পাড়ায় ইউনিভার্সিটি। দুতলা বাড়ি। দু’তলায় ইউনিভার্সিটি ক্লাস, এক তলায় এডমিনস্ট্রেটিভ বিল্ডিং। গ্যারেজে ভাইস চ্যান্সেলার সাহেবের অফিস। সেই ঘরে রং জ্বলে যাওয়া কার্পেট আছে। ঘড়ঘড় শব্দ হয় এমন এসি আছে।

এসিতে গ্যাস নেই। বাতাস ঠাণ্ডা হয় না। একটা এসি চলছে, বিকট শব্দ হচ্ছে— এটাই যথেষ্ট। ভাইস চ্যান্সেলার সাহেবের ইজ্জত তাে রক্ষা হচ্ছে। …………..একইভাবে শুরু হয়েছে কম্পিউটারের দোকান। যে দোকানের নাম আগে ছিল দিলখােশ চটপটি হাউস, এখন তার নাম DIL Dot.com Computer Heaven. 

ভাইয়া যে কম্পিউটার কোম্পানিতে কাজ শিখছে সেই কোম্পানির নাম International Net. কোর্স শেষ হবার পর এই কোম্পানি ইন্টারনেটের মাধ্যমে সব ছাত্রকে বিদেশে চাকরি যােগাড় করে দেবে। এই কোম্পানির ক্লাশ দুই ব্যাচে হয়। সেকেন্ড ব্যাচের ক্লাস শুরু হয় রাত আটটার পর।

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *