লিলিয়ান আগ্রহ নিয়ে বলল, খুবই ভাল কথা। মনে হচ্ছে তােমাদের পৈতৃক বাড়ি বাসযােগ্য অবস্থায় আছে। এই সামারে চল দু‘মাস থেকে আসি।

পাগল হয়েছ? সামারে আমি থাকব ভিয়েনা। ‘কোনক্রমেই কি যাওয়া সম্ভব না ?
‘না। তাছাড়া লিলিয়ান সামারে বাংলাদেশ তােমার ভালও লাগবে না। ট্রপিক্যাল কান্ট্রি। প্রচণ্ড গরম। টেম্পারেচার চৌত্রিশ ডিগ্রী পঁয়ত্রিশ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে। হাই হিউমিডিটি। গা থেকে আলকাতরার মত ঘাম বের হয়।
‘আমার কোনই অসুবিধা হবে না।
‘হবে। আমার পৈতৃক বাড়িতে কোন ইলেকট্রিসিটি নেই। হাতপাখা হচ্ছে। একমাত্র পাখা। প্রচণ্ড মশা। বাড়ির চারদিকে বাগানটা সুন্দর, কিন্তু সুন্দর হলেও বাগানে হাঁটতে পারবে না। বর্ষায় প্যাচপ্যাচে কাদা হয়ে থাকে। সেই সঙ্গে আছে। সাপের উপদ্রব। .
‘তুমি আমাকে ভয় দেখানাের চেষ্টা করছ।
‘ভয় দেখানাের চেষ্টা করছি না। সত্যি কথা বলছি। ভয় দেখাতে চাইলে বলতাম, আমাদের বাড়ির চারপাশে ঘনজঙ্গল। সেই জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, এবং বুনােহাতী ঘুরে বেড়ায়। আমি মশার কথা বলেছি, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের কথা বলি নি।
আয়নাঘর-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ
লিলিয়ান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমার খুব আশা ছিল আমি এই সামারেই তােমার পৈতৃক বাড়ি দেখতে যাব।
তােমার আশা আপাতত পূর্ণ হচ্ছে না। কোন একদিন নিশ্চয়ই হবে। বাংলাদেশের মশা তােমাকে দেখিয়ে আনব। সব মশা এক্সপাের্ট কোয়ালিটির ইয়া সাইজ। একেক জন এক ছটাক দেড় ছটাক করে রক্ত খায়। রক্ত খেয়ে বমি করে ফেলে দেয়, আবার খায়। হ| হা হা।
তাহেরের ভিয়েনায় এক মাসের জন্যে যাবার কথা ছিল। সেটা বেড়ে হয়েছে দুমাস। সেমিনারের শেষে একটা শর্টকোর্স শেষ করে সে ফিরবে। তাহের খুব খুশি। লিলিয়ানের খারাপ লাগছে। বেশ খারাপ লাগছে। খারাপ লাগছে এই ভেবে যে, তাহের বুঝতে পারছে না তাহেরকে ছেড়ে একা একা বাস করা তার জন্যে কত কষ্টের। সে তাে অনায়াসে বলতে পারত – লিলি, তুমিও আমার সঙ্গে চল। ঘরদুয়ার তালাবন্ধ থাকুক। এই কথা একবারও বলছে না।
তাহেরের ফ্লাইট বুধবারে। সে মঙ্গলবার নাশতার টেবিলে কফি খেতে খেতে
বলল, লিলি তুমিও চল। আমি সেমিনার করব, কোর্স করব – তুমি শহরে শহরে ঘুরবে। শুধু রাতে আমরা এক সঙ্গে ঘুমুব। এখানে একা একা এত বড় বাড়িতে থাকার তােমার দরকার কি? শেষে ভয়টয় পাবে।
আয়নাঘর-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ
‘না আমি ভয় পাব না। ‘ভয় না পেলে থাক। বাড়ি খালি রেখে যাওয়া ঠিক না।
লিলিয়ানের কান্না পাচ্ছে – কেন সে বলতে গেল না আমি ভয় পাব না। তাহের বলামাত্র সে রাজি হল না কেন? এখন কি সে বলবে – “আমি একা একা এখানে থাকতে চাচ্ছি না। আমি তােমার সঙ্গে যাব। তুমি আমার জন্যেও একটা টিকিট কর।” না, তা বলা সম্ভব না। এমন ছেলেমানুষি কিছু সে করতে পারবে না।
‘লিলিয়ান।
‘তুমি স্বীকার না করলেও আমি বুঝতে পারছি দুমাস একা একা থাকা তোমার জন্যে কষ্টকর হবে। তােমাকে আমি একটা সাজেশান দেই। তুমি তােমার বাবা–মা‘র কাছ থেকে ঘুরে আস। ওদের রাগ ভাঙিয়ে আস। | ‘ওদের রাগ সম্পর্কে তােমার কোন ধারণা নেই বলেই তুমি এমন কথা বললে। এই রাগ ভাঙবার নয়।
‘আমার ধারণা তাঁদের সামনে গিয়ে তুমি কান্নাকাটি শুরু করলেই – রাগ গলে জল হয়ে যাবে। চেষ্টা করে দেখ।
‘চেষ্টা করে লাভ হবে না। আমার পজার চাচা মারা গেছেন, কেউ আমাকে এই খবরটাও দেয় নি। আমি জেনেছি অন্য একজনের কাছে।
এরা কোনদিনই তােমাকে গ্রহণ করবে না? ‘তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেলে, কিংবা মারা গেলে হয়ত বা করবে।
‘তােমাকে ছেড়ে যাবার প্রশ্ন উঠে না। মৃত্যু বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। যে প্লেনে উঠছি সেই প্লেনটাই ক্র্যাশ করতে পারে। তবে তােমাকে পৈতৃক বাড়ি না দেখিয়ে আমি মরব না। এ বিষয়ে নিশ্চিত থাক।
লিলিয়ানের খুব খারাপ লাগছে। হঠাৎ মৃত্যু প্রসঙ্গ চলে এল কেন? এই প্রসঙ্গ তাে আসার কথা ছিল না।
আয়নাঘর-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ
‘লিলিয়ান।
‘আমি প্রতিদিন একবার টেলিফোন করব। “আচ্ছা। ‘তােমার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ারে একটা খাম রেখে যাচ্ছি। আমি বাসা থেকে
বেরুবার পর খাম খুলবে। তার আগে নয়।
‘কি আছে খামে ? | ‘কিছু না। আরেকটা কথা, তুমি যদি একা থাকতে ভয় পাও তাহলে ঘরে তালা দিয়ে পরিচিত কারাের বাড়িতে উঠে পড়বে। কিংবা কোন হােটেলে।
‘আমি ভয় পাব না।”
‘তােমার চোখ দেখে মনে হচ্ছে এখনি ভয় পাচ্ছ। আমি চোখের ডাক্তার। চোখ বিশেষজ্ঞ। চোখ দেখে অনেক কিছু বলে দিতে পারি। হা হা হা।
লিলিয়ান তাহেরের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, I love you.
লিলি !
‘এই দু’মাসে তুমি কি দয়া করে একটা কাজ করবে, গাড়ি চালানােটা শিখে নেবে? এটা কোন কঠিন ব্যাপার না। ড্রাইভিং–এর যে কোন স্কুলে ভর্তি হলেই হবে। গাড়ি চালনি জানলে তুমি আমাকে এয়ারপাের্টে নামিয়ে দিয়ে আসতে পারতে। দুজন গল্প করতে করতে যেতাম। এখন যাব ক্যাবে করে। বিশ্রী ব্যাপার!
আয়নাঘর-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ
তাহের ঘর থেকে বের হওয়া মাত্র লিলিয়ান ডুয়ার খুলল। সেখানে একটা চিঠি। চিঠিতে লেখা – প্রিয় লিলি, খামের ভেতর একটা ভিয়েনা যাবার ওপেন টিকিট আছে। টিকিটটা তােমার জন্যে। যখন ইচ্ছে করবে তুমি চলে আসবে। আমি জোর করেই তােমাকে নিয়ে যেতাম। যাই নি। কারণ আমি সারাদিন থাকব ব্যস্ত, তুমি একা একা হােটেলে বসে থাকবে। নিজের স্বার্থে তােমাকে কষ্ট দিতে ইচ্ছা করল না। এরচে ওপেন টিকিট ভাল। এখানে একা একা থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়লে চলে আসবে। তখন ভিয়েনার হােটেলে বসে বিরক্ত হলেও আমাকে দোষ দিতে পারবে না। কারণ তুমি এসেছ নিজের আগ্রহে। হা হা হা।
লিলিয়ান সঙ্গে সঙ্গেই ট্রাভেল এজেন্টকে টেলিফোন করল। যদি বুকিং পাওয়া যায়। সম্ভব হলে আজ।
Read more
