আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

এরপর থেকে তার অভ্যাস হয়ে গেল গভীর রাতে আয়নাঘরের দরজা খুলে সেখানে ঢুকতেনঅনেকক্ষণ থাকতেনআয়নাঘরের মেঝেতে পাটি পেতে দুপুরে ঘুমুতেন

আয়নাঘর

আমার বাবা জানতে পেরে খুব রাগ করেনবাবার ধারণা, এই বাড়িটা অভিশপ্তবাড়িতে থাকলে অকল্যাণ ছাড়া কল্যাণ হবে নাতিনি মাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। 

কোথায় যান

প্রথম ময়মনসিংহ শহরে যানসেখান থেকে যান ঢাকায়ঢাকায় যাবার পর থেকে মামাথায় পাগলামি ভর করেতিনি রাতে একেবারেই ঘুমুতেন নাছটফট করতেনআর বলতেন বাড়ি ফেলে এসেছি উনি খুব রাগ করছেনখুব মন খারাপ করছেনউনার কত শখ বাড়ি ভর্তি থাকবে ছেলেমেয়েতেতারা হৈচৈ করবে, চেঁচামেচি করবে। 

উনি মানে কে? তিতলী বেগম?” 

মা খুব কান্নাকাটি শুরু করেন বাড়ি যাবার জন্যেবাবা পাত্তাই দেন নিবাবা বলতেন বাড়িতে থাকার জন্যেই তোমার মাথার দোষ হয়েছেআমি ওখানে তােমাকে নিয়ে যাব নাবাবা নিয়ে যান নিমামৃত্যু হয় ঢাকায়। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

তােমার কি মনে হয় না তােমার বাবা ভুল করেছিলেন?‘ 

না মনে হয় নাবাবা যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেনমামনের ভ্রান্তিকে তিনি আমল দেন নিতুমি নিশ্চয়ই মনে কর না আয়নাঘরে একজন মৃত মানুষ বাস করে। 

জৎ বড়ই রহস্যময় তাহের। 

জগৎ মােটেই রহস্যময় নয়জগৎ কঠিন নিয়মশৃঙ্খলায় বাধাপ্রকৃতি কখনাে কোন নিয়মের ব্যতিক্রম হতে দেয় নারহস্যের বাস মানুষের মনেমানুষই রহস্য লালন করেযেমন তুমি করকত আয়ােজন করে জোছনা দেখলেজোছনার যে সৌন্দর্য তার সবটাই তুমি আরােপ করেছজোছনা কি ? সূর্যের প্রতিফলিত আলো একে নিয়ে মাতামাতি করার কিছু নেইকিন্তু তুমি মাতামাতি করছতােমার মত অনেকেই করছেকবিতা লেখা হচ্ছেগান লেখা হচ্ছে আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে ...‘ 

লিলিয়ান বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেছালামসব কাজ ফেলে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লিলিয়ানের দিকেলিলিয়ান বাংলায় বলল, আপনাদের পাঠানো খাবার উত্তম হয়েছেপান খুবই উত্তম হয়েছেছালাম কিছু বলছে নাতাকিয়ে আছেমনে হচ্ছে লিলিয়ানের কোন কথা তার কান দিয়ে ঢুকছে নালিলিয়ান বলল, আমি আমাদের এই বাগান প্রাতকালে পরিচ্ছন্ন করবআমি কিছু লেবারার নিয়ােগ করবদয়া করে আমাকে সাহায্য করবেনআপনি কি আমার বাংলা ভাষা বুঝতে পারছেন ?

আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

ছালাম কিছু বলল নাসিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলতাহের বলল, বিদেশী উচ্চারণে তােমার অদ্ভুত বাংলা সে কিছুই বুঝে নিবােঝার চেষ্টাও করে নিআমিই বুঝতে পারি না, আর বুঝবে ছালাম আলিসে হা করে তাকিয়ে ছিল তােমার দিকেযাই হােক এসে বস এখানেজোছনা দেখ। 

লিলিয়ান বসলতাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, কাপাচিনাে কফি খেতে পারলে ভাল হতযা ঘুম পাচ্ছে বলার না! চাদটাকে ঘুমের ট্যাবলেটের মত লাগছেযতই দেখছি ততই ঘুম পাচ্ছেভাল কথা, জঙ্গল পরিষ্কারের কথা কি বলছ? এইসব মাথা থেকে দূর করনা দূর করব নাআমি বাগান পরিষ্কার করববাড়ি ঠিকঠাক করবআমাদের এত সুন্দর বাড়ি এভাবে পড়ে থাকবে ?” 

সুন্দর দেখলে কোথায় ? আমার কাছে খুব সুন্দর লাগছেআচ্ছা ধরে নিলাম সুন্দরকে থাকবে তােমার এই সুন্দর বাড়িতে? আমরা দুজন থাকবআমাদের ছেলেমেয়েরা থাকবেএর বাগানে খেলবেআমি এদের জন্যে দোলনা বানিয়ে দেবজোছনা রাতে বাচ্চাদের হাত ধরে আমরা নদীর পারে হঁটবআর একটা বড় নৌকা কিনবনদীর ঘাটে নৌকা বাধা থাকবে

আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

তাহের হাসতে হাসতে বলল, কি বলছ পাগলের মত? আমার মনের ইচ্ছার কথা তােমাকে বলছিলােকালয় ছেড়ে আমরা বনে পড়ে থাকব?হ্যাতােমার কি হয়েছে বল তাে লিলিয়ান?বুঝতে পারছি না। 

আমার মনে হয় ঘুমের অভাবে তােমার চিন্তাশক্তি এলােমেলাে হয়ে গেছেভাল করে ঘুমাও দেখবে মাথা থেকে ভূত নেমে গেছেচল শুয়ে পড়ি। 

তুমি শুয়ে পড়আমি খানিকক্ষণ বসি। 

আচ্ছা বস, আমি তাহলে এখানেই শুয়ে থাকিতােমার যখন জ্যোত্না দেখা শেষ হবে, আমাকে ডেকে দিও। 

একটুক্ষণ জেগে থাক না। আমার খুব গল্প করতে ইচ্ছা করছে। 

তাহের হাই তুলতে তুলতে বলল, আমি জেগে থাকার চেষ্টা করছিতুমি গল্প শুরু করআমার পক্ষে গল্প করা সম্ভব নাআমার পক্ষে যা সম্ভব তা হচ্ছে হাই তােলাকাজটা আমি দায়িত্বের সঙ্গে করে যাচ্ছিতাহের দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলমনে হচ্ছে সে ঘুমিয়ে পড়েছেলিলিয়ান গলার স্বর হঠাৎ অনেকখানি নিচে নামিয়ে বলল, আমি তােমাকে কতখানি ভালবাসি তা কি তুমি জান

অহের চোখ না মেলেই বলল, জানিকিভাবে জান ?বলতে চাচ্ছি নাবললে তুমি লজ্জা পাবেআমি লজ্জা পাব না। তুমি বলআমার শুনতে ইচ্ছে করছে তােমার শুনতে ইচ্ছা করলেও, আমার বলতে ইচ্ছা করছে নাআমার ঘুমুতে ইচ্ছা করছেআমি কি তােমার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে পারি ?

আয়নাঘর-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

পারআমি সারারাত কিন্তু এখানেই বসে থাকবতুমি এইভাবেই ঘুমুবে। 

তােমার মধ্যে পাগলামির বীজ আছে লিলিয়ানআমার ধারণা বেশ ভালমত আছেলিলিয়ান হালকা গলায় বলল, হয়ত আছেএই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে কি জান? আমার মনে হচ্ছে এই যে তুমি আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছ একজন কেউ তা দেখছে। খুব আনন্দ নিয়ে দেখছে। 

সেই একজন কেউটা কে ? ভূতপ্রেত

বুঝতে পারছি না, তবে তার উপস্থিতি অনুভব করছিবাড়িতে তােমাকে বেশিদিন রাখা ঠিক হবে নাতােমার ব্রেইন পুরােপুরি নষ্ট হবার আগেই আমাদের চলে যেতে হবে

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *