কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

 মামি : পড়াশােনা করা কি খারাপ? বড় মামা : পুঁথিগত পড়াশােনা করা খুব খারাপপ্রতিভাবান মানুষেরা কখনাে পাঠ্যবই পড়ে নাকিছু শৈশবমামি ; তােমাকে কে বলেছে? বড় মামা : বলাবলির তাে কিছু নেইসবাই জানেপাঠ্যবই থেকে শেখার কিছু নেইমামি খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বললেন, আমাকে তুমি এত অপছন্দ করাে কেন

বড়মামা বললেন, শুধু তােমাকে নয়, সব মেয়েকেই আমি অপছন্দ করিমেয়েরা প্রকৃতিতে নিষ্ঠুরযেমন ধর, একটা কালাে স্ত্রী মাকড়সা দৈনিক ২৫০টা পুরুষ মাকড়সাকে হত্যা করে। 

আমি কি মাকড়সা ? মাকড়সা না হলেও কাছাকাছিএখন যাও, আমি কাজ করব। 

কী কাজ? 

সব তুমি বুঝবে নাএকটা প্রহসন লিখছি। মেয়েরা আশেপাশে থাকলে কোনাে বড় কাজ হয় না। 

আচ্ছা, তাহলে যাচ্ছি, বড় কাজ করাে। 

মামি প্রায় ছুটে বের হয়ে এলেন। খানিকক্ষণ পর শেফু এসে আমাকে কানে কানে বলল, মামি ছাদে দাড়িয়ে খুব কাঁদছে। 

আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলশেফু বলল, কাঁদছে কেন রে, দাদা

মামিকে মাকড়সা বলেছেএই জন্যে কাঁদছেমামিকে মাকড়সা বলা মামার উচিত হয় নিঅন্যায় হয়েছে। 

দাদা শােন, এখন থেকে আমি পুরােপুরি মামির দলেতুই কার দলে

দল ত্যাগ করা নিতান্তই অধর্ম হবে বলে আমি বড় মামার দলেই রইলাম, তবে মন পড়ে রইল মামির দলে

বড়মামার প্রহসন লেখা শেষ হয়েছে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

প্রচণ্ড হাসির একটা ব্যাপার। এমন মজার যে কিছুক্ষণ পরপর হাহা করে হাসতে হয়মামা পুরােটা আমাদের পড়ে শােনালেনআমাদের একবারও হাসি এলাে নাতবে মামা যতবার হাসলেন আমরাও ততবার হাসলামপড়া শেষ হলে খাতা বন্ধ করতে করতে মামা বললেন, প্রচণ্ড হাসির হয়েছে, কী বলিস

জি মামা । 

এই জিনিস মঞ্চে করা যাবে নাহাসির চোটে দর্শক ডায়ালগ বুঝতে পারবে নাএটা আগে খেয়াল করি নিআগে খেয়াল করলে হাসি আরেকটু কমিয়ে দিতামগ্রেট মিসটেক শ্রোতাদের পাঁচ মিনিট গ্যাপ দিয়ে দিয়ে হাসাতে হয়হাসি খুব পরিশ্রমের ব্যাপারতাই একবার হাসির পর খানিকক্ষণ করে বিশ্রাম দিতে হয় । 

প্রহসন শেষ হবার পর মামা গােয়েন্দা উপন্যাস লিখতে বসলেননামভয়ঙ্কর রাতের বিভীষিকারক্ত জমাট করা গােয়েন্দা গল্প দুর্বল হার্টের লােকের পড়া একেবারেই নিষিদ্ধবইয়ের শুরুতেই মামা একথা লিখে দিয়েছেনখুবই ভয়ঙ্কর গল্প ছােটদের পড়া নিষিদ্ধআঠারাে বছরের বেশি না হলে কেউ এই বই পড়তে পারবে নামামিও পারবেন না, কারণ মামির বয়স আঠারাের নিচেআমার ধারণা, মামা এই বই লিখছেন যাতে মামি পড়তে না পারেনমামির খুব খারাপ অভ্যাস মামা কিছুএকটা লিখলেই তিনি গােপনে সেটা পড়ে ফেলবেন এবং চোখ বড় বড় করে বললেন, মানুষটার কি মাথা খারাপ ? এইসব কী লেখে ? মামা তার সব লেখা এখন তালাবন্ধ করে রাখেনসেই তালার চাবি থাকে তার পকেটে

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ 

দেখতে দেখতে দিন কাটতে লাগলমামি বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলেন ভাব করতে, লাভ হলাে না বড়রা তাে ছােটদের মতাে না যে ডাব ডাব ডাব ভাব ভাব ভাববলে বুড়াে আঙুল ছোঁয়ালেই ভাব হবেতাদের ভাব হওয়া খুব কঠিনমামি যতবারই ভাব করতে গেলেন ততবারই নতুন করে ঝগড়া হলােঝগড়ার সময় মামা খুব কঠিন কথা বললেনযেমনবড়মামা : আমার সাহিত্য প্রতিভার যে স্বীকৃতি দেয় না, যে আমার 

রচনা নিয়ে হাসাহাসি করে, তার সাথে আমার বাস করা সম্ভব নাতাছাড়া প্রতিভাবান মানুষদের বিয়ে করা উচিত বিয়ে করা ভুযদি কেউ তা করে তবে তাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয় স্ত্রীর সাথে বাস না করে

মামি : তুমি প্রতিভাবান কে বলল?

বড়মামা : (ভয়ঙ্কর রাগ) আমি প্রতিভাবান না ?

মামি : উঁহুহাতির ছবি আঁকা ছাড়া তুমি আর কিছু পার না

বড়মামা : কী বললে

মামি : যা সত্যি তাই বললামতােমার হাতির ছবিও যে খুব ভালাে হয় তাও নাহাতির মুখটা দেখতে হয় ইঁদুরের মুখের মতাে

বড়মামা : কী বললে ?

মামি ; যে ছবি আঁকতে পারে সে সবকিছুর বি আঁকতে পারে। বাঘ, ভালুক, গাছপালা, নদী... তুমি শুধু হাতি আঁক, আর কিছু না

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৮)-হুমায়ূন আহমেদ

বড়মামা : এতে কী প্রমাণিত হয় ?

মামি : এতে প্রমাণিত হয় তুমি ছবি আঁকতে পার না এবং...বড়মামা : এবং কী ? মামা : এবং আমার ধারণা তুমি খানিকটা বােকাবড়মামা : কী বললে ? আমি বােকা ?

মামি : হঁা বােকা বােকা না হলে পরপর তিনবার কেউ আই. পরীক্ষা দিয়ে ফেল করে ? বড়মামা : (অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর) তুমি ঘর থেকে যাও। 

আমি তােমার মুখ দর্শন করতে চাই নামামি ; তুমি আমার মুখ দেখতে চাও না? বড়মামা : নাএই জীবনে নয়আমার কঠিন প্রতিজ্ঞাকলম হাতে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করছিতােমার মুখ আমি দেখতে চাই না। নানা

মামি : বেশ, মুখ দেখতে হবে নাআমি কাল ভােরে দেশে চলে যাব। শুধু পরীক্ষার সময় এসে পরীক্ষা দিয়ে যাববড়মামা : বাঁচলাম। 

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *